কালকূট ॥ নাহিদা নাহিদ | চিন্তাসূত্র
১ শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৬ জুলাই, ২০১৮ | রাত ১০:৪৮

কালকূট ॥ নাহিদা নাহিদ

মোল্লাবাড়ির হাডুলটঙ্গের মাথায় মরচে পড়া গাঢ় কালো ছোপ, শরীর ছেয়ে আছে তার অর্ধগলিত ফেনা ওঠা নুনের দানার মতো বিক্ষিপ্ত ছত্রাকে! আরও নিবিড় করে দেখলে চোখে পড়বে দেয়াল ঘষে খোদাই করে লেখা কোনো এক প্রাগৈতিহাসিক কালের অস্পষ্ট প্রেম। এখানে জড়িয়ে আছে কালকেউটে লুকিয়ে থাকার স্মৃতি, ধানগোলার ঘর, বল্লারটোক, ডাক্তারবাড়ি আর দুলাল কাকার উঠোন! কোথাও একপাশে ছিল কুমারী নদী, চেয়ারম্যান বাড়ির মোরগফুল ডাঁটাগাছের মাথায় লাল লাল ঝুটি; কোথায় যেন সব!

আমি দাঁড়িয়ে আছি ফড়িংয়ের ঘরটাকে পেছনে রেখে। ভেবেছি ওর গলায় স্বর পেলেই ডাকব, এর মাঝেই রুক্ষ চেহারার পেটমোটা একটা মেয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায়, মেয়েটার চোখ চঞ্চল। ব্লাউজের মাঝ বরাবর একটা ধাতব সেফটিপিন হাঁ হয়ে আছে তার। আমার মনে হলো সুমিত ওকে দেখলেই দাঁত চিবিয়ে বলতো—অ্যা পারফেক্ট নেস্টি উম্যান! অ্যা আগলি গার্ল!

মেয়েটা আমায় প্রশ্ন করে, কে আপনে?
আমি? আমি বহ্নি!
বহ্নি! মানে বুনো! আপনে বুনো আপা?

মেয়েটার চোখে বিস্ময়, আমি দেখতে পাই আমার পরিচয় ঘটিত প্রশ্ন সমাধানে তার মুখ লাল হয়ে উঠছে। কাঁপছে সে একটু একটু। কী যেন করতে চাইছে সে আমায়। এসব দেখে আমি উদাস হই, তার গাঢ় ময়লা ঠোঁট তড়বড় করে বলে যায় অনেক কিছু—আপা সত্য কথা, আপনে একটা জানোয়ার! আপনে একটা ছেনাল! আপনে কেমন করে পারলেন এমন বদমায়েশি কাম কইরা গ্রাম ছাড়তে? আপনের আম্মা লজ্জা শরমে কত কানছে, আপনে জানেন?

অস্থির মেয়েটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলতে থাকে, আপনে তো আপা ভালা মানুষ না, একটা হিন্দু লোকের সাথে ঘটনা ঘটায়া পলাইলেন; একবারও ভাবলেন না হেই লোকটার একটা বিয়াইত্তা বউ ছিল! লোকজন সকাল বিকাল আপনেরে গালমন্দ দিতো জানেন? আরও শোনবেন কী হইছিল? আপনের ফড়িং আপনেরে হারানোর শোকে বিষ খাইছিল সেই সমায়? বাঁইচ্যা উঠলে গায়ের মানুষ তারে বিয়া করায়া দেয়। হ্যায় কি আইজও আপনেরে ভুলছে? আপা সত্য কন তো আপনে এমন ক্যান? দুনিয়ায় এত মোসলমান! এত ব্যাটা ছেলে! ভাইগ্যা যাওয়ার আর মানুষ পাইলেন না আপনে?

কথা বলতে বলতে মেয়েটার ঘাড়ের রগ ফুলে যায়! আমার মনে হয়, তার অনেকদিনের ফুঁসে ওঠা রাগ গলে গলে পড়ছে ঠোঁট গড়িয়ে। মেয়েটা বলছে তো বলছেই মিছিলের মতো ধেয়ে আসছে তার শব্দরাশি, এই মেয়েটা কোন গাঁ থেকে এসেছে! কোথায় তার বাড়ি? তার ব্যবহৃত অনেক শব্দই আমার কাছে অপরিচিত, মনে হচ্ছে আপ্তবাক্য। কথার ফাঁকে ফাঁকে আমি তার বেরিয়ে আসা হলুদ দাঁত দেখি। সেই দাঁতে গতরাতে কামড়ে খাওয়া বাসী আমের আঁশটে ছোল দেখি, মুখের দুর্গন্ধজাত বাতাসে আমার গলিত শবের ভাগাড়ের কথা মনে হয়। আমি ভাবতে থাকি, মেয়েটার রাগ কখন থামবে! তাকে আমার বলা উচিত, বুকের সেফটিপিনটা খুলে পড়েছে একটু। আমি আবার খেয়াল করে দেখি, আসলে যাকে আমি মেয়ে মনে করছি, সে আসলে মেয়ে নয় এক মধ্যবয়স্ক নারী! তার অস্থির বচনে হুট করে আমার ফুলমাসীকে মনে পড়ে। ফুলমাসীও মেয়েটার মতো চেঁচায়! যদিও তার চেঁচানোর কারণ আলদা। তবু কোথায় যেন এই মেয়েটার সঙ্গে তার মিল আছে। তিন তলার বারান্দা থেকে রোজ আমি মনোযোগ দিয়ে ফুলমাসীর চিৎকার শুনি—রে হারামি মুসলমান খানকির পোলা, কত আর আমার গতর দেখবি, আমার ঘরের ফুঁটায় কত আর আঙুল দিবি! আয় কাছে আয়, তগোরে আমার লাঙ্গের ধন দেখাই? ভগবান তগোরে কুষ্ঠ দিয়া পচায়া মারবো দেখিস কইলাম! আমার সোহাগ দেখলে তগোর পাছা চুলকায়! চুলকাক! সব ওই ভগবান দেখবো। এরপর ফুলমাসী পায়ের গোড়ালির ওপরে বিঘত খানেক শাড়ি তুলে, নরোম হলুদ মাংস ডলে ডলে কল তলায় অশ্লীল শব্দে রঙ্গমঞ্চ জমিয়ে রাখেন। আমি মুগ্ধ নয়নে শুনি। হাসি পায় একটা কথা ভেবে, সত্যিই কি ফুলমাসির ভগবান কখনো আসেন কারও পাছা খুঁজে দেখতে? আমি হাসতে থাকি একা একা। একফাঁকে সুমিত এসে দেখে যায় সব। আমাকে বা ফুলমাসীকে দেখে দাঁতে দাঁত কিড়মিড় করে বলে যায়, হাউ নেস্টি উম্যান, হাউ আগলি!

প্রাথমিক ঝড় শেষে মেয়েটা এখন বিব্রত। তার রাগের উৎস হয়তো আমার ছেনালিপনা নয়, অথবা অন্যধর্মের অন্য নারীর একান্ত পুরুষকে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যও নয়, তার রাগ হয়তো তারই বিবাহপূর্বে ফড়িংয়ের এই অন্য নারীতে প্রণয়াসক্তিই। মেয়েটা তবু সহজ হয়, একটু লজ্জাও পায়। তার কোমরে গুঁজে রাখা আঁচল মাথায় তুলে দেয়। মাথা ঢাকা পড়ার কারণে উদোম হয়ে বেরিয়ে আসে তার গর্ভকালীন পরিপুষ্ট পেট।
ফড়িং আছে বাসায়?
ফড়িং নামটা শুনে মেয়েটা এবার মুখে আঁচলচাপা দিয়ে হাসে! বলে, আপা আপনে ওনারে এখনো ফড়িং কন! ওনার নামতো ফরিদুল। জানেন আমাগো বাচ্চা স্কুলে পড়ে?

মেয়েটার চোখে গর্ব, মুখে সফল হাসি, মেয়েটা এবার অযাচিতভাবে একটু গা দুলিয়ে হাসে, একটু হাসে একটু থামে। তার সে হাসির মধ্য-বিরতিতে তার তলপেটের মাংসপিণ্ড উঁচু-নিচু হয়, তারপর মেয়েটা হাসি থামিয়ে হাত রাখে তার মাংসল পেটে।

দেখছেন আপা, পেটেরটা কেমন নড়ে! মনে হয় পোলা হইবো, পোলার বাপের নাম ফড়িং! হিহিহি ফড়িং!

মেয়েটা হাসতে হাসতেই আমার হাত ধরে মোল্লাবাড়ি উঠোনে টেনে নেয়। উঠোনে পৌঁছাতেই সুপারিগাছের খোলের ওপাশে শুনতে পাই শোরগোল! একটা ছাল ওঠা কুকুর এ বাড়ির উঠোন থেকে একটা ছোট্ট মুরগীর বাচ্চা কামড়ে নিয়ে পালাচ্ছে, এসব দৃশ্য আমার পূর্ব পরিচিত। এ বাড়ির শক্ত সমর্থ কর্তা পুরুষটি এখন নিশ্চয়ই কাঠের পিঁড়ি নিয়ে তাড়া করবে কুকুরের পিছু।  আমি আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছি, কে এসে ভেঙে দেবে কুকুরের কোমর, কুকুরটা নিশ্চয় কুঁইকুঁই করে কাঁদবে এখন, আমি অপেক্ষায় আছি দেখার। ফড়িংকে দেখতে পাই ঘেমো শরীরে উঠোনের একপাশে মরা একটা শিমুলগাছ কেটে লাকড়ি করছে। কত বছর পর ফড়িং! ওর হাতে কুড়োল। কুকুরের কামড়া কামড়িজনিত কোনো উত্তেজনা নেই ফড়িংয়ের ভেতর। আমাকে দেখে সে বিস্মিত, হাঁটুর নিচে লুঙ্গি নামায়।

বুনো কখন আসলি? সুমিত দা এসেছেন? সুমিত দা নামটা বলতে বলতে ফড়িং লজ্জায় চোখ নামায়, এতদিন পরেও সুমিতের সঙ্গে আমাকে ভেবে কিছুটা অপ্রস্তুত সে!

কাল রাতে এসেছি, আমি একটু ঘুমোব, তোদের ঘরে জায়গা হবে ফড়িং, সকাল থেকে তোর ঘরের পেছনে দাঁড়িয়ে আছি।

আরে পাগলি কী বলছিস এসব! আয় আয় ঘরে আয়। কত দিন পর তুই?

আমি কথা বলতে চাই অনেক। সামনে দাঁড়ানো খলবল করে কথা বলা মেয়েটিকে খুঁজি। আমার মুখে জড়তা। দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে আমার মুখ দিয়ে আগের সেই সহজ ভাষাটি আর আসে না। ফড়িংয়ের ওসবে খেয়াল নেই, সে উত্তেজনা সামলাতেই ব্যস্ত!—তুই আসবি আগে একটু বললে কী হতো?

আজ আমাদের বাড়ি বিক্রির দলিল রেজিস্ট্রি হবে তাই আসা।

ফড়িং চুপ! আমার মনে পড়ে আমাদের বাড়ির সঙ্গে একসময় ফড়িংয়ের সম্পর্ক সাপে-নেউলে ছিল। আহা এই বুনোর জন্য কী না করতো ফড়িং!

মা জননী আসছিস? ভালো আছিস মা—বলতে বলতে ফড়িংয়ের আব্বা হাত বাড়িয়ে ছুটে আসেন, তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরেন, কাঁদেন, তার কণ্ঠে বিলাপ! দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার জন্য অভিযোগ, নাকি ফড়িং-সংক্রান্ত সম্পর্কে স্নেহের আতিশয্য বুঝতে একটু কষ্ট হয়।

ফড়িংয়ের বউ ভালো করিৎকর্মা। এর মধ্যেই সে এপাড়ার ছেলেবুড়োর দলকে ডেকে নিয়ে হাজির! সবার মিলিত হাউকাউয়ের মধ্যে এখন আমি দিশেহারা। একটু ঘুমুতে এসেছিলাম এ বাড়ি। তা আর হবে না। কতগুলো কমন প্রশ্ন ঘ্যানঘ্যানে রেডিও বাজার মতো ঘুরপাক দিয়ে ধেয়ে আসছে আমার দিকে। প্রশ্নের ধরন অনেকটা এরকম—সুমিতকে নিয়ে ভালো আছি তো? তার আগের বউটা কোথায়? সুমিত কি মুসলমান হয়েছিল? আমি হিন্দু হয়ে গিয়েছিলাম? আমার মাথায় সিঁদুর নেই কেন?

ফড়িংয়ের বড়জ্যাঠা বুড়ো আসলাম শেখ আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়! গ্রামের মানুষগুলো এমনই, যৌনতা ছাড়াও এরা স্পর্শ চায়, আমি জানি। সেই সেবার যেদিন গ্রাম ছেড়েছিলাম আমার মনে আছে আসলাম শেখ আমাকে আর সুমিতকে বাবলা গাছের ডাল দিয়ে মারতে মারতে প্রায় হাড় ভেঙে দিয়েছিলেন।

আমি কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই আজ সেই আসলাম শেখ বলতে লাগলেন, আম্মা তোমার মতো মাইয়া এই গাঁয়ে আর জন্মে নাই। আমাগোর এইগায়ের একটাই গর্ব, সেইটা তুমি। আমরা সবসময় সবখানে গলা উঁচু কইরা কই, আমাগো মাইয়া বুনো বাঘিনী একটা, কত যুদ্ধ কইরা সংগ্রাম কইরা এমবিবিএস পাস দিছে, কয়জন পারে এমন! বলতে বলতে আসলাম শেখ ফড়িংয়ের দিকে তাকায়,  দ্যাখ, মা দেখ, ফইড়ার অবস্থা দ্যাখ, সেই যে বলদটা পড়ালেখা বাদ দিল, এখন হাওলাদারগো দোকানের সমিলে কামলা খাটে!

আসলাম শেখের কথায় আমি ঘুম তাড়িত চোখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এবার ফড়িংকে দেখি; ওকে দেখলে যে কেউ আমার চেয়ে দশ-পনেরো বছরের বুড়ো মনে করবে, ওর চুল প্রায় অর্ধেক পাকা, দাঁত পান খেয়ে কালো করে রেখেছে, আমাকে দেখে একটু ভদ্রস্থ হওয়ার চেষ্টা করছে তখন থেকে! তাতে করে ওকে আরও আউলাঝাউলা লাগছে বেশি। একটা প্রশ্ন মনের ভেতর ঘুরপাক খায় খুব করে।

আচ্ছা ফড়িং কি ভালো আছে? এখনো কি সে রাত বিরাতে মানুষের গাছের ফলফলাদি চুরি করে বেড়ায়? এখনো কি তার নদার পুকুরের মাছ চুরির আশায় ঘুম হারাম হয়? সুমিতের ঘরের মতো শত্রুপক্ষের কারও ঘরে এখনো কি সে ছেড়ে দিয়ে আসে লাল পিঁপড়ার বাসা?

কী জানি, কেমন আছে ফড়িং!
একলা আইছো আম্মা? সাথে কেউ আসে নাই!

না আসেনি।

বুঝতে পারছি সুমিত নামটা নিতে বড় জ্যাঠা ইতস্তত করছেন, আমিও আর কথা খুঁজে পাই না,  সুমিতকে মনে করে কথা খুঁজি। কাল একটা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফাইনালের মর্ডারেশন বোর্ড আছে ওর, সঙ্গে আরেক কমিটির কারিকুলাম প্রণয়ন। সুমিতকে সেখানে ছুটেতে হবে! সম্ভবত সেখানে রেনুকা বালাও থাকবেন! সুমিতের ভাষায় হাউ গর্জিয়াস উম্যান, ডেলিসিয়াস লুক!

ফড়িংয়ের বউ সাদা কলপ করা টিনের থালায় কতগুলো মুড়ির মোয়া নিয়ে আসে। ফড়িং এগিয়ে যায় বউয়ের হাত থেকে মোয়া তুলে নিতে। উঠোনে এখন অনেক মানুষ, হোগলা পাতার বিছানায় পা মুড়ে বসেছে সবাই, মাঝে আমি। বউটা নিচে বসতে পারছে না, ওর জন্য ফড়িং একটা মোড়া নিয়ে আসে টেনে। গামছা দিয়ে বাতাস করে বউয়ের গায়ে, ওর তৎপরতায় আমার ক্লান্তি লাগে। ঝিমুনি লাগে খুব। হাঁসফাঁস লাগে! সুমিতের হাতে কখনো গামছা দেখিনি আমি। গোলাপ বা নীলপদ্ম দেখেছি কিনা, তাও মনে পড়ে না। আমার মনে পড়ে, গতকালকের ব্যাগ গোছানোর সময়টা। সুমিত কথা বলছিল ফোনে। গাল চুলকে কোনো এক অধ্যাপকের পিণ্ডি চটকাচ্ছিল ঘণ্টাদুয়েক ধরে। আমার শরীর খারাপ ছিল; পিরিয়ডের দুটো সাইকেল মিস করেছি, গতরাত থেকে তলপেটে ব্যথা, সে ব্যথা নিয়েই এগিয়ে যাই—সুমিত একটু শুনবে?

সুমিত হাতে মাছি তাড়ানোর মতো তাচ্ছিল্যে একটু পরে আসার ইঙ্গিত করে। বোঝা যাচ্ছিল তার রিসিভারে তখন বেশ উত্তেজনা—আরে আর বলো না বুড়োটার শিং নেই, তবু গুঁতোতে চায় গাভীন গাই! রেনুকার কাছে সব প্রমাণ আছে। স্টুপিড একটা, নেহায়েতই তার সাথে ইউজিসির এক প্রজেক্টে কাজ করছি, আরে না না কারিকুলাম বোর্ডে আমি বুড়োটার নাম প্রস্তাব করিনি, ঘাগুমাল একটা। ঐ ক্যাম্পাসে সে একপিস ছাগল রেখে এসেছে। প্রগতিশীল নয়া বুদ্ধিজীবীদের মাঝে সে সবচেয়ে শক্তিশালী বদল প্রমাণ করে সবসময়। ওই যে সানাউল জাহিদ সেই ই তো তুললো বুড়োটার নাম। ধড়িবাজ দাদা ধড়িবাজ। খেয়াল করে দেখেছেন, হাত কচলাতে কচলাতে ওর হাতে রেখাই নেই। তাকে গুনবো আমি? এই সুমিত মিত্র! হাউ অ্যাবসার্ড! হাউ ইজ ইট পসিবল?

এ পর্যায়ে আমি সুমিতের ভুলভাল ইংরেজি বয়ানের মাঝেই ঢুকে পড়ি—সুমিত কাল আমি গ্রামে যাব, গাড়িটা লাগবে!
গাড়ি? গাড়ি কেন? তুমি গেলে যাও, গাড়ি আমার লাগবে, কাল আমার এক্সটারনাল বোর্ড আছে। অনেকটা পথ।

রেনুকার গাড়িতে গেলে হবে না তোমার?
সুমিত সশব্দে রিসিভার নামিয়ে রাখে। এরপর কিছুক্ষণ দাঁতমুখ খিচিয়ে কুৎসিত গালিগালাজ দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। আমার মনে হলো সুমিতের মুখে ন্যাস্টি, আগলি শব্দগুলো শোনা ছাড়াও দুই/একটা খাঁটিবাংলা শব্দ শুনি আমি! সুমিত বলে বেশ ভালো! বোঝা যায় এককালে খুব শক্ত আবৃত্তিকার ছিল। তার ভরাট কণ্ঠ, উঁচু করা ঘাড় দেখে আমার রোমকূপ দাঁড়িয়ে যেতো যখন-তখন, সুমিতের স্বর আমার প্রথম যৌবনের প্রেম! সুমিত চলে গেলে আমি নিজে নিজেই আওড়ে যাই—

একটি কথার দ্বিধা থরথর চূড়ে
ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী;
একটি নিমেষ দাঁড়াল সরণী জুড়ে
থামিল কালের চিরচঞ্চল গতি;

আজ আর ভেবে পাই না আমাদের সেগুনবাগিচার এই ফ্ল্যাটে আসার সরণীজুড়ে কী আছে এখন? জলকাদা, সাপ ব্যাঙ, নাকি জোঁক! নাকি হাঙর!

দীর্ঘ সতের বছরের জমে থাকা প্রশ্নে আমি বিদ্ধ হই, ক্ষত হই। গ্রামে আসিনি কতকাল। বাবা মারা যাওয়ার পর পরই আমি হুট করে বিয়ে করে ফেলেছিলাম সুমিতকে, তখন সবে মেডিক্যাল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী, ভেকেশানে বাড়ি এসেছিলাম। কী থেকে কী হলো। অনেক কোলাহল, অনেক গুঞ্জন অনেক ঘৃণা মাথায় নিয়ে ছেড়ে গিয়েছিলাম হাডুলটং, বল্লারটোক আর কুমারীনদী। আজ হয়তো সেসব মনে করার দায় নেই আমার। সেদিনের স্মৃতি রোমন্থন করতে গেলে ক্লান্ত হওয়া ছাড়া কোথাও নেই কিছু। অদ্ভুত ব্যাপার। এত এত মানুষের কোলাহলে আমার মাথায় আরাম ছড়িয়ে পড়ছে। ঘুমে জড়িয়ে আসছে চোখ! আমার শরীর থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে গত কালের জার্নি, চোখের সামনে উসখুস করতে থাকা মুখগুলো দেখতে দেখতে ছোট হয়ে যাচ্ছে। আমি শূন্যে ভেসে যাই একটু একটু করে।
বুনো অ বুনো ওঠ ওঠ। আমার জানালায় একের পর এক আস্তে আস্তে টোকা পড়ে যাচ্ছে।

আমি ঘুম ঘুম চোখে জানালা খুলি। ফড়িং সামনে দাঁড়ানো। সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি আর মালকোচা মারা লুঙ্গির গিট ঠিক করে সাদা চকচকা দাঁত বের করে হাসছে ফড়িং।

আমি চালুনি আর টেঁটা নিয়ে বাধ্যগত অনুচরের মতো ফড়িংয়ের পিছু পিছু যাই, আশৈশব ফড়িংয়ের বিশ্বস্ত সহযোগী আমি দিন ভুলে যাই, রাত ভুলে যাই। ওর সঙ্গে রাস্তায় ঘুরি, পুকুরে মাছ ধরি।

আমরা হাঁটছি। তবু পথ আর ফুরোয় না, দিন যায় রাত যায়, আমরা হাঁটি, হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে যাই এমন এক নগরে, যে নগরে মানুষগুলো আর মানুষ নাই, অর্ধেক পুরুষ অর্ধেক নারী। আমাদের সামনে একটা বিশাল প্রাসাদ, ঝালর ঝুলছে। রঙিন ফিতাগুলো উড়ে যাচ্ছে চূড়োয়। আমি আর ফড়িং চেয়ে চেয়ে দেখি সব। দেখতে দেখতে আমার তলপেটে ব্যথা হয়। ভারী হয় পা। দেখতে দেখতে তরল রঙিন স্রোত নেমে যায় মাটি ছুঁয়ে, ফড়িং  আমার হাত ধরে, আমি ওর হাতের নির্ভরতায় খুঁজে পাই উষ্ণতা। আমাদের পথ ফুরায় না।

সেই যে ফ্রক পরে হাঁটতে শুরু করলাম, তারপর থেকেই হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে আমার ফ্রক খুলে পড়ে, আমি দেখতে পাই আমার জরায়ুমুখে শক্ত ইটের মতো ঝুলে আছে একটা মানবশিশু। তার দুটো পা দুটো হাত আমার পেট ফুঁড়ে বের হয়ে কিলবিল করছে শরীরে, আমি হাতড়ে দেখি শিশুটির যৌনাঙ্গ অপুষ্ট। ভয়ে আমার গা ছমছম করে। আমি ফড়িংয়ের হাত আঁকড়ে ধরি, ফড়িংয়ের চোখ সাদা। ফড়িং আমায় নিষ্পাপ আলোয় ফিসফিস করে বলে, ভয় পাসনে বুনো। বাচ্চাটা আমরা লুকিয়ে রাখব সভ্য মানবসমাজ থেকে। সুমিত কখনো খোঁজ পাবে না এর। একে তুই আর আমি বাঁচিয়ে রাখব দেখিস তুই! আমার ভয় কমে। আমি চোখ তুলে দেখি ফড়িংয়ের ঝলমলে মুখ। সেই কিশোর বালক তখন আমায় ধল প্রহরের আকাশ দেখায়।

দেখতে দেখতে আমি পথে পথে বড় হই, যুবতী হই  প্রৌঢ়া হই, নিচে তাকিয়ে দেখি সেই অপুষ্ট শিশু! অনতিদূরে অদ্ভুত নগরী, আমায় যেতে হবে, অথচ নগরের গেটে দাঁড়িয়ে সুমিত, ওর হাতে সুনীলের কবিতার বই, সত্যবদ্ধ অভিমানে সুমিত ঘোরগ্রস্ত—এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ। আমি কি এ হাতে কোনো পাপ করতে পারি? নগরটা দেখতে ঠিক আমার মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেল গেটের মতো হয়ে যায়। তারপর দেখি কোলাব্যাঙের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে সুমিত আসে, তলপেটে ঝুলে থাকা বাচ্চাটাকে ছোঁ মেরে নিয়ে ছুটতে থাকে সে। ছুটে যায় সুমিত খুব দ্রুত! আমি পেছনে দৌঁড়াই। আমার হাত খুলে পড়ে, পা খুলে পড়ে। রাশি রাশি বর্জ্যে তলিয়ে যেতে যেতে আমি অনুভব করি শরীরের শীতল পানির স্পর্শ।

আমার ঘোর ভাঙে। ফড়িং, ফড়িংয়ের বউ, ঘরের আর আর সবাই আমার মুখের ওপর দাঁড়িয়ে। মাথার পাশে দীপু কাকা বসে আছেন, এই গ্রামের একমাত্র এলএফএম ডাক্তার দীপঙ্কর বোস। ছোটবেলায় কাকাকে রাজপুত্তুরের মতো লাগতো দেখতে, এখন বুড়ো হয়ে গেছেন। মাথার বেশিরভাগ চুল পাকা।

কাকা আমার মাথায় হাত রাখেন, আতঙ্কে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ!

বুনো কত সপ্তাহের ছিলো রে মা, এ অবস্থায় কেন এলি এখানে? মরতে এসেছিস! আছে কোনো ভালো ডাক্তার এ গাঁয়ে? নিজে ডাক্তার হয়েও নিজেকে মারতে চাইছিস, কার ওপর অভিমান তোর?

দীপু কাকাকে দেখে আমি ধড়মড় করে উঠে বসার চেষ্টা করি, বুঝতে পারি কিছু একটা ঘটে গেছে আমার। বাইরে অন্ধকার দেখে অনুমান করি, এখন সন্ধ্যা। উঠতে চাই, ক্লান্ত লাগে খুব আবার শুয়ে পড়ি। আমার পরনে একটা পুরনো রঙচঙা শাড়ি। চারপাশ দেখে সহজেই অনুমেয় এটা ফড়িংয়ের শোবার ঘরের বিছানা!

দীপু কাকার মুখ চুপসে আছে, অন্ধকারে সে মুখ আরও বিষণ্ন।

আমার গলায় কিছু একটা হয়েছে। স্বর বের হতে চায় না। তবু বলি, কাকা আমার কিছু হয়নি, অনেকটা পথ ড্রাইভ করে এসেছি, কাল সারারাত জেগে ছিলাম, ধকল নিতে পারিনি, পড়ে গেলাম!

দীপু কাকা গাঢ় চোখে আমার দিকে তাকান, আমি কুচকে যাই, আমার মনে হলো কাকা তার অন্তর্দৃষ্টিতে আমার ভেতরটা পড়ে নিচ্ছেন। আমার নিজেকে অপরাধী লাগে খুব। ছোটবেলায় কোনো ছোটখাটো অন্যায় করলে দৌড়ে ছুটে যেতাম দীপু কাকার কাছে। কাকার কোলে বসে থাকতাম চুপচাপ, কাকা পিঠে হাত বোলাতেন আর বলতেন সব ঠিক আছে বুনো, সব ঠিক আছে, তুই যা করেছিস বেশ করেছিস। আচ্ছা আজ যদি আমি দীপু কাকার কোলে তেমনি করে মুখ লুকাই দীপু কাকা কি বলবেন, বেশ করেছিস, বুনো বেশ করেছিস! আমার আর সুমিতের দেড়যুগের অসার সংসারটাকে দীপু কাকার কাছে কি এখনো বেশ লাগবে?

ফড়িংয়ের বউ ঘাবড়ে গেছে খুব, অস্থিরতায় কেমন করছে। কোথা থেকে একগ্লাস দুধ নিয়ে এসেছে মেয়েটা, আমার পাশে বসে মাথা হাতড়ায়, তার চোখ অপরাধী, তার ভাবে মনে হচ্ছে, সেই যেন আমার পেটের বাচ্চাটা টেনে হিঁচড়ে এনে জ্যান্ত মেরে ফেলেছে!

আপা কষ্ট হইতাছে খুব! একটু সবুর করেন, বড় জ্যাঠা ভ্যানের খোঁজে গেছে আপনেরে জেলাসদরে নিয়া যামু আমরা। দুধটা খায়া লন আপা। শইলে একটু বল পাইবেন।

মেয়েটার কাতরতায় আমার কেমন লাগে। মেয়েটা দেখতে একদম ভালো না, গালের হনু উচু, দাঁতগুলোও কেমন! চামড়া ময়লা। তবু মেয়েটাকে দেখে আমার প্রথম বাচ্চাটার কথা মনে পড়ে। বড় হলে কেমন হতো সে? এর মতো শুষ্ক রুক্ষ, ফুলমাসীর মতো বেহায়া, সুমিতের মতো স্বার্থপর অথবা ফড়িংয়ের মতো মূর্খ! কেমন হতো। আচ্ছা বাচ্চাটার যৌনাঙ্গ ঠিক থাকলে সে কি সুমিতের হাতে বেঁচে থাকার ছাড়পত্র পেতো? কী জানি কী হতো। একটা কথা ভেবে আমার হঠাৎ খুব হাসি পায়, ভালোই হলো এবারের বাচ্চাটা পেটেই মরেছে, সুমিত জানতোই না এর খোঁজ! আমার কেমন লাগে। আচ্ছা এখনো কী আমার সেই অপুষ্ট লিঙ্গের বাচ্চাটা মর্গে পড়ে আছে? ওর কি ঠাণ্ডা লাগছে না একটুও? আহা আমার অবুঝ বাচ্চা!

আমি দুধের গ্লাস মেয়েটার হাত থেকে কেড়ে নেই, ছুড়ে মারি কোথাও। ঝনঝন করে শব্দ হয়, দীপুকাকা মেয়েটা বা ঘরের আর আর সবাই সরে আসে আমার কাছে। আমার অস্থির লাগে, এই মুহূর্তে আমার ফড়িংকে বড্ড প্রয়োজন। আমি চেঁচাই—
ফড়িং
ফড়িং
ফড়িং।

ফড়িং এগিয়ে আসে। চেপে ধরে আমার হাত, আমার ঠাণ্ডা লাগে খুব, মর্গের সেই বাচ্চাটার মতো, আমি খামচাই।

ফড়িং মনে আছে তুই একবার একটা কালকেউটে পিটিয়েছিলি, মনে আছে তোর?
হুঁ। মনে আছে।
মনে আছে মার খেয়ে সাপটা পালিয়েছিল, আমরা আর খুঁজে পাইনি। মনে আছে?

হুঁ। সব মনে আছে আমার, তুই একটু চুপ থাক বুনো, পুরনো কথা মনে করে অসুস্থ শরীরে তোর অস্থির হওয়ার দরকার নাই।
না না। আজ না করিস না ফড়িং। তুই যাবি আমার সাথে, তুই জানিস সে সাপটা কোথায় আছে? আমি জানি। চল আমার সাথে, দেখাই।

বুনো, চুপ করবি?

কেন চুপ করব আমি? কোলো কালে কি বলেছি কিছু? চুপচাপ থাকিনি এতকাল! ভুল না হয় ছিল কিছু, এবার তুই একবার চল আমার সাথে, দেখবি সাপটা কেমন দুলে দুলে চলে, ফটফট করে ইংরেজি বলে, চল না ফড়িং চল আমার সাথে। দেখবি সেই সাপটার বিষে কেমন ঘোর, আমি নীল হয়ে গেছি সেই কবে, এখন আবার রেনুকা! আমার সারাগায়ে সাপের ছোবল দেখবি ফড়িং! দেখ দেখ দেখ।

ফড়িং দেখে না, চোখ সরিয়ে নেয়, আমার ভাল্লাগে না আমি জোর করি, অসীম আগ্রহে ফড়িংয়ের মুখ টেনে আনি আমার দিকে, ফড়িংয়ের বউয়ের রঙ-ওঠা শাড়ি ব্লাউজ খুলে ফেলি টেনে, ফড়িং চোখ বন্ধ করে ফেলে। তবু আমি আমার বুক পিঠ ঘাড় খুঁজে খুঁজে দেখাই সাপের ছোবল, দেখাতে দেখাতে আমি অনাবৃত হতে থাকি একটু একটু করে। তখন কাপড়ের অভাবে আমার শীত হয় খুব, ঘরভরা মানুষ ছটফট করে আমার জন্য। তারপর কী হলো। এত এত মানুষের মাঝে হঠাৎ ফড়িং আমায় জাপটে ধরে, শক্ত করে। আমার জিভে তখন ফড়িংয়ের চোখের নোনতা পানির স্বাদ, ফড়িং, ফড়িংয়ের বউ আর দীপু কাকার ভেজা মুখ দেখতে দেখতে আমার ক্লান্তিতে দুচোখ জুড়ে আসে ঘুম। কতকাল আমি ঘুমাই না। ঝাপসা চোখে আমি ফড়িংয়ের মুখচ্ছবি দেখি। ঘুমিয়ে পড়ার আগে ভুলে যাই একশো সাত বি সেগুনবাগিচার তৃতীয় তলায় কবে যেন আমার ফেরার কথা ছিল!

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


One Response to “কালকূট ॥ নাহিদা নাহিদ”

  1. আনোয়ার রশীদ সাগর
    মার্চ ২০, ২০১৮ at ১১:২৯ পূর্বাহ্ণ #

    নাহিদা নাহিদ

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন