কারখানার বাঁশি: পর্ব-২৬॥ হামিম কামাল | চিন্তাসূত্র
১১ বৈশাখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২৪ এপ্রিল, ২০১৮ | রাত ৮:১২

কারখানার বাঁশি: পর্ব-২৬॥ হামিম কামাল

॥পর্ব-২৬॥
রাতের শেষ বাস ছেড়ে যাওয়ার কিছু আগে রাত আটটা নাগাদ সদর রাস্তার পূর্ব পাশে ঢাকাগামী বাসের স্টেশনে একা এসে পৌঁছুল সলিল। দেখো, সারি সারি টিকিটঘরের সামনে বিচিত্র পোশাকে, চেহারায় শত শত মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে লটবহরসমেত। আবার শতেক মানুষ টিকিটঘরের কাজ চুকিয়েছে। সুতরাং এবার পালা অপেক্ষার। মানুষের ভিড়ের মধ্যখানে বাতাসের প্রবাহ নেই। জনশূন্যতায় যে হিম জেঁকে ধরে, তাও ভীত হয়ে দূরে। তবু বড় নিঃশ্বাসে সাদা বাষ্প বেরিয়ে আসছে সবার। উপস্থিত বড়দের কোনো বিকার না থাকলেও পশ্চিম কোণের এক বড় পরিবারের পিঠেপিঠি ছোট্ট ভাইবোনদের ভেতর এ নিয়ে আহ্লাদের শেষ নেই। একুটুখানি ফাঁকা পেলেই আলো পেছন করে দাঁড়িয়ে মুখ হাঁ করে শ্বাস ফেলছে, হাসতে হাসতে ঢলে পড়ছে এ তার গায়ে। শাসালো কণ্ঠে আচমকা থেমে যাচ্ছে। কেউ কেউ ক্ষণিকের থমকানো শেষে হাসছে আবার।

চারপাশে ভিড় বাড়িয়ে চলা পুরুষেরা কেউ সপরিবার, সবান্ধব; কেউ সলিলের মতো একা। দক্ষিণ পাশের লোকটির চোখে পরিবারের জন্য কাতরতা। মেয়েশিশুটিকে বুকে চেপে রেখেছে। বাবার ওমে চুপটি করে সেঁটে আছে লাল ফিতের মেয়েটি; হয়তো শ্যালকের সঙ্গে এসেছে সহধর্মিনী। অবগুণ্ঠিতা। উত্তরের তরুণের চোখে কৌতূহলের সুস্থ আলো। নবীণ তরুণ তার প্রৌঢ় বাবার হাত ধরে শহুরের বন্ধু আর তাদের ক্ষমতাবান সমাজপতি বাবার গল্প করছে। বলছে তার প্রভাতী শ্রেণীকক্ষ, শিক্ষক, গোবেচারা বন্ধুদের কথা। স্টেশনের পূর্ব কোণে খাটো এক বটগাছ, গোড়াটা সূঁচাল ধাতব বেড়ায় ঘেরা।  ভেতরে বিবর্ণ ভাঙা এক দেবপ্রতিমূর্তি কাত হয়ে পড়ে আছে। তার পাশে লাল কৌপিন পরিহিত জটাকেশ সাধু ছানি পড়া শান্ত চোখে উপস্থিতির মুখ পরীক্ষায় রত, ষাটের কোঠায় বয়েস। তার নাকের ডগায় খেলছে ক্রমশ সাহসী হয়ে ওঠা অবাধ্য ছোট ছোট ছেলে মেয়ে। ক্ষণে ক্ষণে দৌড়ে যাচ্ছে আর চিমটি কেটে সাধুর ভাঁজপড়া পেট দেখাচ্ছে আড়চোখে, দেখাচ্ছে খয়েরি জটা। এক সাধুর দেহেই ওদের শতেক হাসির উপকরণ; আর সাধুও যেন উপভোগ করছে বেশ।

পুরু গোঁফের আড়ালে হেসে ওপরনিচ দোলাচ্ছে মাথা, ডাকছে কাছে, ভুরুজোড়াও গোঁফপ্রমাণ। এবার সভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে শিশুকূল। পূর্বের বটের পেছনে সমাজতান্ত্রিক স্লোগান লেখা অন্ধকার দেয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে এক ভীরু তরুণী, গৌরকান্তি, আয়তলোচনা। কাঁধে বাঁধা পড়ে দুলছে পুরনো ঝিকমিকে ব্যাগ। সস্তা পরিধেয়তে আলোর রিনরিনে স্বর। কাছে এসে তাকে পরখ করে যাওয়া বয়েসী পুরুষের চোখ পরখ করছে মেয়েটি। খিস্তি শুনেও নির্বিকার, মনপছন্দ ছাড়া কাউকে সঙ্গ দিতে সম্মত নয়। বটের ওই কালো থেকে দূরে অপরাপর নারীরা সবান্ধব, সপরিবার; তার মতো একা কেউ নয়। দেশীয় পোশাকের ওপর মধ্যপ্রাচ্যীয় কালো আচ্ছাদন, রাতের ওপর আরেক পরতের রাত। সঙ্গী পুরুষপ্রভুর পেছন পেছন এরা ভেতর বাহির করছে। কারো হাত ধরে রেখেছে কোনো ডাগর চোখের শ্যামল ছেলে, কোলে ভেজা আঙুলের মেয়ে, কারো হাতে ধরা বিবর্ণ বিপুলা বহর সব। কারো মলিন আচ্ছাদনের নিচে চওড়া ফিতার মতো বেরিয়ে আছে রঙিন শাড়ির পাড়, কারো সাদা কালো। কারো অপুষ্ট হাত পায়ের ওপর শিরা উপশিরার নকশা, কারো ত্বক কোমল, ছোট লোমে আবৃত, চর্চিত। সলিলের বয়েসী এক তরুণ স্টেশনের উত্তরপশ্চিম কোণে দাঁড়িয়ে সিগারেট টেনে চলেছে দ্রুত, ক্ষণে ক্ষণে দেখছে হাতঘড়ি। তার পাশে এক পথশিশু চাকার ভরে দেবে যাওয়া মাটিকে খাল জ্ঞান করে লম্পে ঝম্পে কেবল এপার ওপার করছে নিজেকে। বাঁশের তৈরি নকশি ধারক কাঁধে স্টেশনে কেবল উত্তর দক্ষিণ করছে রঙিন চানাচুরওয়ালা। ধমকের দমকে নিভে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো উৎসুক শিশুকে প্ররোচিত করেই চলেছে।

অবশেষে আচ্ছাদিত কোনো সুকণ্ঠীর স্বর শুনে অনুমানে দাঁড়িয়ে কাঁধ থেকে নামালো নকশি ধারক, চানাচুরের রুপালি বোল। চারদিকে হলুদ সরু আঁকাবাঁকা লোভনীয়র ঠিক মধ্যখানে অনড় দাঁড়িয়ে এক রূপালি পেটমোটা ছোট্ট কলস, তার ভেতর জ¦লন্ত কয়লা, স্ফীত ধারায় চলছে ধোঁয়ার উদগীরন। সুকণ্ঠী তার মুখের ওপর চাপানো কালো কাপড়ের তলদেশ ফাঁপিয়ে ঠোঁটে তুলে নিচ্ছে খাবার; কিছু যাচ্ছে মুখে, কিছু পড়ছে মাটিতে। মানুষের পায়ের ফাঁক গলে ক্রমে দোকানের কাছে আসতে থাকা এক পথকুকুর সলিলের কাছে এসে লেজ নাড়তে থাকল যেন তার হারানো প্রভুকে খুঁজে পেয়েছে। তখনই পুরনো আরেক প্রভুর গন্ধে অধীর। ঘাড় ফেরাতেই তাকে খুঁজে পেয়ে আহ্লাদিত ভীষণ। ঝাপসা চোখের বয়েসী এক বৃদ্ধা শীর্ণ হাতে রুপালি থালা ধরে তার মনপছন্দ মানুষদের দিকে এড়িয়ে চলেছে। কখনো লটে কিছু মিলছে, কখনো নয়। বৃদ্ধা সলিলের কাছে আসতে গিয়ে এলো না। কাছে দাঁড়িয়ে তাকে খানিক নিরীক্ষণ করে লম্বা লম্বা পা ফেলে এক টিকিটঘরের দিকে এগিয়ে গেল জাকারিয়া। এই রাতে তাকেও বুঝি পালাতে হচ্ছে কোথাও।

রঙচঙে এক দূরপাল্লার বাস এসে থামলেই শুরু হলো হল্লা। পশ্চিম কামরূপগামী এ বাস গন্তব্যে পৌঁছুবে সকালে। ঠাসা পণ্যের ঝাঁকাগুলো উঠে গেল ছাদে ঝটাঝট, চালক সহকারী দুটি বানর গোত্রের নাম রাখল। পলকহারা ওঠানামায় লোফালুফি করে ত্বরিৎ হাত চালিয়ে সব সাজিয়ে গুছিয়ে দিলো। বাসের যাত্রীরা চড়ে বসল ধীরে সুস্থে। বয়েসী নারীপুরুষদের কোলে চড়িয়ে তুলে দেওয়া হলো হাত দেড়ের উঁচু পা দানির ওপর। শিশুরা এ সেবা পেল দাবি না তুলতেই। অন্ধকার বাসটা আগেই ছিল আধভরা, দেখতে দেখতে এবার পূর্ণ হয়ে উঠল মানুষে। স্টেশনের ভিড় কমল না এরপরও। যাত্রীদের অনেকে কাছেপিঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, অনেকেই ছিল সময়ব্যবধান কমিয়ে বাড়ি ছাড়ার সুযোগে। খানিক সময় যেতেই আবার আগের গমগমে ভাবটা ফিরে এলো। বাসটা ছাড়তে না ছাড়তেই আরেক বাস এসে থেমে কাঁপতে থাকল থরথরিয়ে, গন্তব্য আসাম। একমাথা লটবহর আর জোগাড়ে নিয়ে রাতবিহারী যাত্রীকূলে গর্ভবতী হয়ে সেটাও ছেড়ে গেল, তবে সময় নিয়ে। এবার ভিড় কমার পর আর আগের মতো ভরে উঠল না ফের। স্টেশনবর্তী এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা যাত্রীর সংখ্যা কমে এসেছে। এলো ঢাকার গাড়ি। এটা শূন্য।

বাহারি রোদচশমার মতো তার সামনের কাচ। যাত্রীর ধারণ ক্ষমতা আগের দুটির অর্ধেক। রাজধানীগামী শেষ শকটের যাত্রী অপ্রতুল, কেননা পথ ফুরোয় গভীর রাতে। ‘অব্যক্ত’ হাতে নিয়ে ধীরে সুস্থে তাতে চড়ে বসল সলিল। ভেতরে আলো না থাকায় বইটা চলে গেল থলের ভেতর, সেখানে তার আরো সঙ্গীসাথী ছিল, আসা আর যাওয়াই যাদের সার। ছোট বাসটা দেখতে দেখতে পূর্ণ হয়ে উঠলে একবার জ¦লে উঠল ভেতরের বাতি। সে আলোয় সলিল দেখতে পেল, স্টেশনের উত্তর পশ্চিম কোণের ঘন ঘন হাতঘড়ি দেখতে থাকা সেই সমবয়েসী তরুণ তার পাশে এসে বসেছে। আসনে কোনো মতেই স্থির হতে পারছিল না। যেন সারা শরীরময় মার্চ করে বেড়াচ্ছে এক পল্টন আক্ষেপ। বাসের চলন কিছুটা অবিরত হয়ে উঠলে ছেলেটা ঘুমিয়ে নিথর হলো। সলিলের চোখে ঘুম ছিল না। জানালার বাইরে অরণ্য পেরিয়ে যাচ্ছিল। শীতল, রহস্যময়। পরিত্যক্ত কারখানাগুলো প্রেতের চোখ হয়ে তাকিয়ে থাকল দীর্ঘ পথ। যন্ত্রের মন্দ্র স্বরে ক্লান্ত মস্তিষ্ক যখন তন্দ্রা তৈরি করল, শোনা গেল ওদের জোটবদ্ধ স্বর, কত শতবার কথা দিলে, কই এলে না তো তুমি এলে তো না!

আগামী পর্বে শেষ

কারখানার বাঁশি: পর্ব-২৫॥ হামিম কামাল

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন