ওয়েবম্যাগের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে ॥ ঝর্না রহমান | চিন্তাসূত্র
১১ বৈশাখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২৪ এপ্রিল, ২০১৮ | রাত ৮:২৪

ওয়েবম্যাগের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে ॥ ঝর্না রহমান

ঝর্না রহমানকবি-কথাশিল্পী। গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ-নিবন্ধ-নাটক-কবিতা-ভ্রমণ-শিশুসাহিত্য-সম্পাদনাসহ তার গ্রন্থসংখ্যা-৪৪। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে গল্প: কালঠুঁটি চিল, অন্য এক অন্ধকার, ঘুম-মাছ ও এক টুকরো নারী, স্বর্ণতরবারি, অগ্নিতা, কৃষ্ণপক্ষের ঊষা, শঙ্খমালার হাড়, নাগরিক পাখপাখালি ও অন্যান্য গল্প, পে‌রেক, বিপ্রতীপ মানু‌ষের গল্প, সবুজ ডানার দেবদূত, বিষ‌পিঁপ‌ড়ে; উপন্যাস: আদৃতার পতাকা, পিতলের চাঁদ, কাক‌জোছনা; কবিতা: নষ্ট জোছনা নষ্ট রৌদ্র, নীলের ভেতর থেকে লাল, চন্দ্রদহন ; ভ্রমণ: আমরা যখন নেপালে। সম্প্রতি সাহিত্যের ওয়েবম্যাগ নিয়ে চিন্তাসূত্রের সঙ্গে কথা বলেছেন এই কবি-কথাশিল্পী।

চিন্তাসূত্র: একসময় যারা দৈনিকের সাহিত্য পাতায় ঠাঁই পেতেন না অথবা যারা দৈনিকে লিখতে স্বস্তি বোধ করতেন না, তারা লিটলম্যাগ বের করতেন। সম্প্রতি লিটলম্যাগের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। বিপরীতে বেড়েছে অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা বা ওয়েবম্যাগ। আপনি কি মনে করেন লিটল ম্যাগের জায়গাই ওয়েব ম্যাগগুলো দখল করেছে?
ঝর্না রহমান: না, ঠিক তা মনে করি না। লিটল ম্যাগাজিন তার জায়গামতোই আছে।  আর প্রযুক্তি যুগের ফসল হিসেবে ওয়েবম্যাগ ধীরে ধীরে নিজের জায়গা করে নিচ্ছে। যুগের হাওয়া বলে একটা কথা আছে। কথাটা যদিও একটু নেতিবাচক মানে কটাক্ষ করে প্রয়োগ করা হয়, তবে এ ক্ষেত্রে আমি ইতিবাচকতায় প্রয়োগ করতে চাই। প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছে বিশ্ব। প্রবেশ করেছে বাংলাদেশও। আমাদের জীবন নানা দিকে প্রযুক্তির ডানা মেলতে শুরু করেছে। দৈনন্দিন জীবনের হাজারো কাজের সঙ্গে প্রযুক্তি যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। স্কুলে বাচ্চা ভর্তি থেকে শুরু করে কোরবানির গরুকেনা পর্যন্ত এখন অনলাইনে হচ্ছে।  শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সবই এখন প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়ছে।  কাজেই অনলাইন ম্যাগাজিন বা ওয়েব ম্যাগাজিন, ওয়েব পোর্টাল–যাই বলি না কেন, তা আপন নিয়মেই জায়গা করে নেবে।

আর লিটল ম্যাগাজিনের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে নাকি? আমার তো মনে হয় বেড়েছে বা বাড়ছে! দেখুন, বাংলা একাডেমিতে একুশে বইমেলায় বহেড়া তলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে প্রতি বছর লিটল ম্যাগাজিনের স্টলের সংখ্যা বাড়ছে। আগে বহেড়ার একপাশে বইয়ের প্রকাশনী থাকতো। এখন চারপাশজুড়েই লিটল ম্যাগাজিন! আগামী বছরে জায়গা আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। কিছু লিটলম্যাগ হয়তো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ওয়েবম্যাগ ওদের নক আউট করেছে! ওয়েব যুগ বা অনলাইন যুগ আসার আগেও অনেক লিটলম্যাগ দুই/চার সংখ্যা বেরিয়ে বন্ধ হয়ে যেতো। কারণ লিটল ম্যাগাজিন যারা বের করেন, তারা হলেন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। চোখভরা যত স্বপ্ন থাকে, পকেটে তত টাকা থাকে না। ম্যাগাজিন নিয়মিত প্রকাশ করতে যে টাকার দরকার, সে টাকা পয়সার জোগাড় তাদের থাকে না। ফলে একসময় প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। সেভাবেই কোনো কোনোটা বন্ধ হয়ে যায়। আবার নতুন নামে নতুন ম্যাগাজিনের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে তো আমার বরং উল্টোটাই মনে হয়। প্রযুক্তিগত সুবিধা থাকায় এখন লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করাও আগের চেয়ে সহজতর হয়েছে।

 ‘একসময় যারা দৈনিকের সাহিত্য পাতায় ঠাঁই পেতেন না বা স্বস্তি বোধ করতেন না, তারা লিটল ম্যাগাজিন বের করতেন’, এ কথাটাও আমি সমর্থন করি না, দৈনিকের পাতায় স্পেস লিমিটেশন আছে। নানারকম দৃষ্টিভঙ্গির অদৃশ্য কাঁচি আছে। পক্ষ-দল-বৃত্ত-গণ্ডির সীমানা আছে। এসব কারণে দৈনিকের পাতায় অনেকের অনেক লেখাই প্রকাশ পাওয়ার সুযোগ থাকে না। লিটল ম্যাগাজিন প্রকৃতপক্ষে সাহিত্যের ওয়াইড স্পেস তৈরির জন্যই সৃষ্টি হয়েছে।  আর তার চারিত্র্য দাঁড়িয়েছে মুক্তমঞ্চের।

চিন্তাসূত্র: একসময় লেখাপ্রাপ্তির ওপর নির্ভর করে পাঁচ থেকে দশ বা তারও বেশি ফর্মার লিটলম্যাগ বের হতো। এতে খরচও হতো বেশ। কিন্তু বর্তমানে ওয়েবম্যাগে সে খরচটি নেই।  আপনি কি মনে করেন, অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের কারণ না থাকায় ওয়েবম্যাগের দিকে ঝুঁকছেন সাহিত্যকর্মীরা?
চিন্তাসূত্র: খরচের তুলনা যদি করা যায়, তবে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করা অবশ্যই ব্যয়সাপেক্ষ। সেখানে কাগজ লাগে, কভার ডিজাইন, প্রিন্ট, বাঁধাই এসব খরচা আছে। আর ওয়েব মাগাজিন ডিজিটাল কাগজ কলমে নিখরচায় লেখা হয়। প্রকাশের জন্য কিছু টাকাপয়সার ব্যাপার আছে বোধ হয়। আমার অতটা জানা নেই। তারপরও ওয়েব ম্যাগজিনে লিটল ম্যাগাজিনের মতো খরচ নেই, একথা সর্বাংশে ঠিক। কিন্তু অর্থ ব্যয়ের কারণ না থাকায় সাহিত্যকর্মীরা ওয়েব ম্যাগাজিনের দিকে ঝুঁকছেন, তা ঠিক বলে মনে করি না। আপনি একটা লিটল ম্যাগাজিন খুলে তার লেখক তালিকা দেখুন, তারা কিন্তু ওয়েব ম্যাগাজিনেও লিখছেন! সাহিত্যিক চাইবেন তার লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছাক, সেটা কাগজের পাতায় বা ডিজিটাল পেজ যেখানেই হোক না কেন!

তবে সাহিত্যকর্মীরা ওয়েব ম্যাগাজিনের দিকে ঝুঁকছেন, এ কথা ঠিক। নইলে অনলাইন ম্যাগাজিনের সংখ্যা বাড়ছে কিভাবে বা ওয়েব ম্যাগাজিনগুলোয় প্রকাশের জন্য লেখা পাচ্ছে কেমন করে? কিন্তু এর কারণ ‘অর্থব্যয় নেই’, তা নয়। এর কারণ সময়ের সঙ্গে তাল মিলানো, যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়া, প্রযুক্তিগত সুবিধার সারাৎসার উপভোগ করা ইত্যাদি।

চিন্তাসূত্র: কারও কারও মতে, বেশিরভাগ ওয়েবম্যাগেই সম্পাদনা ছাড়া লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। এমনকী, বানানও দেখা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঝর্না রহমান: এই প্রশ্নের উত্তরটিতে আমি এককথায় হ্যাঁ বলব। অনলাইন ম্যাগাজিনে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে, লেখা পাওয়ামাত্রই প্রকাশ করে ফেলা সম্ভব। আবার অনেকেই পত্রিকা-সম্পাদনার ন্যূনতম জ্ঞান ছাড়াই পত্রিকা প্রকাশ করেন। ফলে অনেক অনলাইন ম্যাগাজিনেই অত্যন্ত দুর্বল মানহীন যাচ্ছে-তা-ই লেখা ছাপা হচ্ছে। বানানের ক্ষেত্রে তো এখন একটা কুরুক্ষেত্র চলছে। কত শব্দ যে লাশ হয়ে যাচ্ছে! এতকাল বানানের ক্ষেত্রে দুই ই-কার উ-কার, মূর্ধণ্য না দন্ত্য-ন—এসবের ভুলটাই প্রধান ছিল। আজকাল সহজ স্বতঃসিদ্ধ একক বানানগুলোতেও অরাজকতার ধুম লেগেছে। ধরুন, ‘আমায় ডেকো না ফেরানো যাবে না, ফেরারি পাখিরা কূলায় ফেরে না।’ এটাকে লিখে দেবে, ‌’আমাই ডেকোনা, ফিরানো জাবেনা, ফেরারী পাখিরা কূলাই ফেরেনা।’

উড়ে-র জায়গায় ওড়ে, ওড়ের-র জায়গায় উড়ে, নাম পুরুষের ক্রিয়া উত্তম পুরুষে, উত্তম পরুষের ক্রিয়া নাম পুরুষে—এমন হাজারো ভুলের আকছার প্রকাশ হচ্ছে বর্তমানে। এসব যে ভুল, তা-ও অনেকে বুঝতেই পারে না।

চিন্তাসূত্র: একসময় কারও পকেটে হাজার বারো শ টাকা থাকলেই তিনি একটি লিটল ম্যাগাজিন বের করার সাহস দেখাতেন। এখন পকেটে ১৫/১৬ শ টাকা থাকলেই কেউ কেউ ওয়েব ম্যাগাজিন করছেন।  কেউ কেউ বিনা পয়সায় ব্লগজিন খুলছেন, লেখা সংগ্রহ করছেন। এ ধরনের ওয়েবজিন ব্লগজিন বের করার কারণ কী? নিছক কর্তৃত্ব প্রকাশের উপায়, না কি সাহিত্যপ্রেম?
ঝর্না রহমান:  লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করতে টাকা লাগে আর অনলাইন ম্যাগাজিন প্রায় বিনা খরচায়ই বের করা যায়, এ বিষয়ে আগে কথা হয়েছে। মানুষ প্রযুক্তিগত সুবিধা যেভাবে সম্ভব, সেভাবে নিতে চাইবেই। অনলাইন সাহিত্য করার মানে এই নয় যে, প্রিন্ট সাহিত্য অচল হয়ে যাচ্ছে বা অসুবিধাজনক হয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত আমরা কাগজে প্রকাশিত সাহিত্যকেই অধিক উপযুক্ত ও প্রিয় মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করছি। দেশের সব বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকা প্রিন্ট আকারেই চলছে। তবে প্রযুক্তির কক্ষপথেও নিজেকে ঢুকিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ সেসব পত্রিকার অনলাইন ভার্সনও আছে। বইমেলায় এখনও শত শত প্রিন্টিং প্রকাশনীরই স্টল বসছে! আর পাশাপাশি একটু একটু করে জায়গা করে নিচ্ছে অনলাইন প্রকাশনীর স্টল। প্রকৃতপক্ষে আমরা এখন একটি ট্রানজিশন পিরিয়ড বা রূপান্তরের কাল অতিক্রম করছি। প্রতিষ্ঠিত, প্রচলিত পদ্ধতিগুলো এখনই বাতিল হয়ে যাচ্ছে না, তবে একটু নড়েচড়ে বসেছে। আবার অনলাইন পদ্ধতিও পুরোপুরি বই বা কাগজে প্রকাশিত ম্যাগাজিনগুলোর পুরো বৃত্ত দখল করতে পারছে না। তবে, সাহিত্যচর্চার প্রিন্ট ভুবনের একটা ছোট্ট প্রভিন্স হলেও দখল করে নিয়েছে অনলাইন ভুবন।

প্রযুক্তিগত সুবিধার কারণে ওয়েবম্যাগ বা অনলাইন ম্যাগাজিন করা এখন সহজতর।  কাজেই এই সুবিধার জন্য এখন যার যা খুশি ধারণা বা যোগ্যতা নিয়ে তারা ওয়েব ম্যাগাজিন করতে নেমে পড়ছেন। এগুলো একেকটা সময়ের জোয়ার। দেখুন, একসময় সারা দেশ খুঁজলে পাঁচটা বিউটি পারলার পাওয়া যেত না, বা দশটা ফাস্ট ফুডের দোকান পাওয়া যেতো না। এখন শুধু অলিতে গলিতে না, অনেকের বাড়ির ছাদে বারান্দায় গ্যারেজেও এসব শপ গড়ে উঠছে। মানুষের চাহিদার কারণে এসব যেমন গড়ে ওঠে, তেমনি এসব ব্যবসাও মানুষের চাহিদাকে গড়ে তুলছে বা নিয়ন্ত্রণ করছে। ওয়েব ম্যাগজিনের ব্যাপারটাও সেরকমই। সুযোগ আছে, ডিজিটাল পেপারে ম্যাগাজিনের পাতা খোলা হলো। বলা হলো, এখানে লেখা দাও। প্রকাশিত হবে। লেখা দিলেই বেশিরভাগ ওয়েব ম্যাগাজিনে তা প্রকাশিত হচ্ছে। যেটা লিটলম্যাগ বা সাহিত্য পত্রিকায় হয়তো সম্ভব হতো না। কাজেই ভালো লেখার পাশাপাশি যাদের লেখা মোটেই সাহিত্য পদবাচ্য নয় বা সাহিত্য অঙ্গনে যারা কল্কে পেত না, তারাও সহজেই লেখক কবি বনে যেতে পারছেন। ফলে নিত্য নতুন নামে ওয়েব ম্যাগাজিন বের হচ্ছে। অবশ্য এর মধ্যে মানসম্পন্ন অনলাইন ম্যাগাজিনও অবশ্যই আছে। তবে ‘যেমন ইচ্ছে লেখা’র খাতাই বেশি! আর এসব ওয়েবজিন, ব্লগজিন অনলাইন ম্যাগাজিন খুলতে বসে, হ্যাঁ, কর্তৃত্ব প্রকাশের মানসিকতা কাজ করছে, তা অস্বীকার করার জো নেই। তবে সাহিত্যপ্রেমটাকে আমি ছোট করে দেখি না। সাহিত্যকে ভালো না বাসলে তা নিয়ে লোকে অনলাইনেই বা কাজ করবে কেন? বনের মোষ তাড়াতেও তো শ্রমের দরকার হয়! ওয়েব ম্যাগাজিনের জন্যও পয়সা না লাগলেও শ্রম আর সময়ের দরকার হয় বই কি!

চিন্তাসূত্র: আপনি কি মনে করেন ওয়েবম্যাগ, ওয়েবজিন, ব্লগজিন—এসব মানুষকে বইপাঠবিমুখ করে তুলছে?
ঝর্না রহমান: এই প্রশ্নের উত্তরটা ঠিক ভাবনা আশ্রয় করে দেওয়া উচিত হবে না। জরিপ দরকার। আমার তো মনে হয় মানুষ ওয়েব ম্যাগাজিনও পড়ছে, বইও পড়ছে! একেবারে বই পড়ে না এমন মানুষের সংখ্যাও ব্যাপক। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সে সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বই পড়ুয়া মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। সেটি বইপ্রীতি, সাহিত্যপ্রীতি যা-ই বলি না কেন, তার জন্যই বাড়ছে। এছাড়া এই সময়ের বইপত্র, ম্যাগাজিন, সাহিত্য পত্রিকা, বিনোদন পত্রিকা, সবই ভালো কাগজ, ঝকঝকে ছাপা, চমৎকার ছবি, দুর্দান্ত প্রচ্ছদ নিয়ে প্রকাশিত হয়। বই মেলায় হাজার হাজার বই বিক্রি হচ্ছে। এসব তো পাঠক পয়সা দিয়ে কেনেন পড়ার জন্যই! আবার অনলাইনেও পড়ছেন! ডিজিটাল ম্যাগাজিনগুলোতে প্রকাশিত লেখা পড়ার একটা আলাদা মজা আছে। নিজে পড়ে প্রতিক্রিয়া জানানো যায়। অন্যের প্রতিক্রিয়াও পড়া যায়। প্রতিক্রিয়া পারস্পরিকভাবে আদানপ্রদান করা যায়। এই সব প্রতিক্রিয়া স্থায়ীভাবে থেকে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান থেকে যাচ্ছে। কাজেই একটা লেখা পাঠের পাশাপাশি এগুলো হলো উপরিপাওনা। তাই ওয়েব ম্যাগাজিন পাঠের প্রতিও মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। তবে তা বই পড়ার আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে তা বলব না। বরং যেভাবেই পড়ুক, মানুষের মধ্যে পাঠস্পৃহা তৈরি হচ্ছে। বইয়ের সংজ্ঞা বা ধারণাও প্রযুক্তি যুগে এসে পাল্টে যাচ্ছে। দুই মলাটে আবদ্ধ কাগজে ছাপা বইকেই এখন আর বই বলা যাবে না। স্মার্ট ফোন, ট্যাব বা কম্পিউটারের মনিটরে ফুটে ওঠা পেজে লেখা বইও এখন ‘বই’। বিশ্বের সব বড় বড় লাইব্রেরিই তাদের বইয়ের ই-ভার্সন করে ফেলেছে। নতুন নতুন ই-লাইব্রেরিও গড়ে উঠছে। আছে ই-শপিং। অনলাইনে বই পছন্দ করো, ই-ক্যাশ করে বই কিনে নাও। ডাউনলোড করে পড়ো। কিছু বই ফ্রিও পড়া যায়। এখন পকেটে একটা স্মার্ট ফোন থাকলেই বিশ্বের সব লাইব্রেরিকে পকেটে পুরে ফেলা যায়। যেখানে খুশি, যখন খুশি বই পড়ো। পাতা ওলটানোর কষ্ট নেই! বহন করার ঝামেলা নেই। কেনার ঝামেলা, খোঁজার ঝামেলা কিছুই নেই। তো মানুষ এই বই পড়ার সুবিধা ছাড়বে কেন? কাজেই ডিজিটাল ভার্সন বইকে ‘বই’ বলে গণ্য করলে, বরং বই পাঠমুখিতা বাড়ছে বলেই মনে হয়।

চিন্তাসূত্র: আপনি নিজে দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতা, না লিটল ম্যাগ, না এই ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখতে / পড়তে পছন্দ করেন?
ঝর্না রহমান: সবটাতেই লিখতে পছন্দ করি। তবে সাহিত্যপাতা পড়তে একটু বেশি পছন্দ করি। রকমারি লেখা দিয়ে পুরো পাতা সাজানো থাকে—পড়তে ভালো লাগে। বাধ্যও থাকে খুব। যা ছাপা হলো, তার নড়ন চড়ন নেই। আর অনলাইন বা ওয়েব ম্যাগাজিনে আঙুল বড় চঞ্চল থাকে। এই এখানে তো ওই ওখানে! ওই যে একটা গান আছে না, চঞ্চল মন আনমনা হয় যেই তার ছোঁয়া লাগে! সেরকম!

চিন্তাসূত্র: একটি লিটল ম্যাগাজিন দুই/তিন শ কপি প্রকাশিত হয়।  দৈনিকের সাহিত্যপাতাও সীমিত পাঠকের কাছে যায়। অনলাইন পত্রিকা লাখ লাখ ইউজারের কাছে যায়। সাহিত্যচর্চার প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে এই বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন?
ঝর্না রহমান: আমি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখি। অনলাইন  সাহিত্যচর্চার সুযোগ পরিসর আগ্রহ সবই বাড়িয়ে তুলছে। কত পত্রিকা, কত রকম লেখা, কত বই এখন হাতের মুঠোয়। ওই যে কবি নজরুল বলেছিলেন, বিশ্বজগৎ দেখবো আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে, সেটা প্রতীকী অর্থে বলেছিলেন। এখন তা শাব্দিক অর্থেই সত্য। মানসম্পন্ন লেখা, মানসম্পন্ন সম্পাদনা, মানসম্পন্ন প্রকাশনার ভেতর দিয়ে গেলে অনলাইন সাহিত্য, সাহিত্য চর্চার প্রচার প্রসারের ক্ষেত্রে এক বিস্ময়কর যুগসৃষ্টি করবে।

চিন্তাসূত্র: ওয়েবম্যাগের পরিমাণ বাড়তে থাকলে একসময় কি দৈনিকের সাহিত্য পাতা গুরুত্ব হারাবে?
ঝর্না রহমান: নিঃসন্দেহে! সুবিধাজনক অথবা লাভজনক জিনিস এসে সমাজ থেকে অপেক্ষাকৃত কম সুবিধা আর কম লাভজনক জিনিসকে হটিয়ে দেয়। অডিও ক্যাসেটের কথা ধরুন। কলের গানের যুগ পার হলে বহুদিন লোকে অডিও ক্যাসেট বাজিয়ে গান শুনলো। এরপর সে জায়গা দখল করে নিলো অডিও সিডি। কিন্তু ইউটিউব এসে বেচারা সিডি কালচারকে নক আউট করে দিল। এখন সিডির দোকানগুলো হয় কসমেটিকস নয় বেবিজ ওয়্যারের দোকানে পরিণত হচ্ছে। ইমইেল এসে চিঠিকে হটিয়ে দিল। আবার নব প্রযুক্তি এসএমএসকে আরও সহজতর প্রযুক্তি মেসেঞ্জার ভাইবার হোয়াটসঅ্যাপস-এর দল তাড়িয়ে দিচ্ছে। সুতরাং সাহিত্যপাতাও একদিন বিজ্ঞপ্তি পাতা, বা শিক্ষা পাতায় পরিণত হবে। অথবা থাকবেই না!

চিন্তাসূত্র: ওয়েবম্যাগকে আপনি কিভাবে দেখতে চান? অর্থাৎ একটি ওয়েবম্যাগে আপনি কী ধরনের লেখা পড়তে চান?
ঝর্না রহমান: দেখতে চাই প্রকৃত সৃজনশীলপত্র হিসেবে। শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারক-বাহক হিসেবে। সৃজনশীলতা মননশীলতা চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে। সুস্থ সংস্কৃতি চেতনা, শুদ্ধ ভাষাচর্চা, নান্দনিক পরিশীলিত রুচি ও মানসিকতা গঠনের প্ল্যাটফরম হিসেবে। সব ধরনের লেখাই পড়তে চাই। গল্প উপন্যাস নাটক প্রবন্ধ কবিতা ছড়া শিশুসাহিত্য ভ্রমণকাহিনী জীবনী সাক্ষাৎকার অনুবাদ রান্নাবান্না সেলাই চিত্রকলা সঙ্গীত সব! সব!

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন