লাত্থি ॥ মোহাম্মদ মনশা ইয়াদ | চিন্তাসূত্র
১ শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৬ জুলাই, ২০১৮ | রাত ১০:৩১

লাত্থি ॥ মোহাম্মদ মনশা ইয়াদ

অনুবাদ: কাজী মহম্মদ আশরাফ
মোহাম্মদ মনশা ইয়াদ, জন্ম ১৯৩৭ শেখপেরা, পশ্চিম পাঞ্জাব (বর্তমানে পাকিস্তান)। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। উর্দু ও পাঞ্জাবি সাহিত্যে এমএ। বর্তমান বসবাস: ইসলামাবাদ। সাহিত্যকর্ম: বন্দ মুট্টিও কি জুগনু, মাংস আওর মিট্টি, খলা অন্দর (উপন্যাস)। খলা (গল্পগ্রন্থ)। কবিতা, চিত্রনাট্যও রচনা করেন। বর্তমান গল্পটি অজিত কৌর সম্পাদিত সার্ক সাহিত্য সংকলন বিয়ন্ড বর্ডারস- ভলিউম-২, নং-১ , এপ্রিল-২০০৬ থেকে নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানে বছরের পর বছর ধরে সামরিক শাসন চলার কারণে কিভাবে সমাজ নষ্ট হয়ে যায়, সামন্তবাদ কিভাবে সমাজে স্থায়ীভাবে শেকড় গেড়ে থাকে প্রবীণ লেখক মনশা ইয়াদ বর্তমান গল্পে তার নান্দনিক রূপ দিয়েছেন।

পরদিন আমাদের ফিরতে হয়েছে। বিকল্প হিসেবে সে আমাদের গ্রামটি ঘুরে দেখতে চেয়েছে। বুঝতে পারছি না কোথায় নিয়ে কী দেখাব। সে আমার রোমান্টিক গল্পগুলো পড়েছে। তার চোখ এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই কল্পিত দৃশ্যপট। ব্যাপারটা আমাকে বেশ লজ্জায় ফেলে দিয়েছে। এখন সে যা কিছু দেখছে, সব অর্ধনগ্ন। রাস্তা-ঘাট অপরিচ্ছন্ন। নোংরা ছেলেরা খেলছে।ব্রিজের নিচে নোংরা পানিতে লাফাচ্ছে। দুশ্চিন্তায় আমার কণ্ঠ শুকিয়ে আসছে।
আমাদের গ্রামটি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। নোনা পানি ঢুকে সম্পূর্ণ এলাকা নিষ্ফলা করে দিয়েছে। যেসব বাগানে কৈশোরে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতাম, গাছে দোলনা ঝুলিয়ে ঝুলতাম সেসব কিছুই এখন আর নেই। একন সেখানে পথের কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দের সঙ্গে ভাসছে আটার মিলের ক্রুদ্ধ গর্জন, নোংরা বিড়ালের ডাক, মোষের ঢেঁকুর। যা আগে কিছুই ছিল না। এখন পুরো হইচই।

শাকিলা উচ্চ সংস্কৃতিমান এবং রুচিশীল। সারা জীবন কাটিয়েছে পরিচ্ছন্ন পরিবেশে। আমিই তাকে গ্রাম দেখানোর আমন্ত্রণ জানিয়েছি। জানতাম না যে তা এমনিভাবে বদলে গেছে সময়ের উল্টোদিকে। মনেই হয় না যে একসময় এখানে থেকেছি। মানুষগুলোও বদলে গেছে। সেসব দিনের সেই পারস্পরিক সহযোগিতা, ভালোবাসার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। সবাই এখন বাস্তববাদী। টাকাই এদের এমন বানিয়েছে।

শাকিলা সম্ভবত আমার অস্বস্তি বুঝতে পারছে। সে বললো, আমার কাছে লাগছে গ্রামটি খুব সুন্দর। এখানকার মানুষ দেখছি বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন। এই ক্রান্তিকাল একটি নতুন যুগের জন্ম দেবে। বিরক্তির সঙ্গে বললাম, নরকের নতুন যুগ। সবার রক্ত যেন ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। তারা সবাই যেন একটা মেলায় এসেছে। সবাই কথা বলে নৈমিত্তিক। এ যেন রোম পুড়ছে আর ওরা বাঁশি বাজাচ্ছে। দেখছোনা সবাই যার যার পথে চলছে? কেউ কারও ব্যাপারে মাথা ঘামায় না। নগরজীবনের নোংরা দিকগুলোই শুধু এখানে ভালোভাবে দেখা দিয়েছে। সে হেসে বললো, তা হতে পারে। আমি এখানে পাচ্ছি স্বাধীনতা ও বিস্তৃতির অনুভূতি। বিগত কয়েক মাস ধরে নিজেকে ঘৃণা করতে শুরু করেছি। জীবিত রয়েছি কি না, জানি না। কিন্তু এখানে নতুন একটা দৃশ্যপথ খোলা দেখছি চোখের সামনে। আমি দেখছি পৃথিবী ও স্বর্গের মাঝে এক নতুন সম্পর্ক। তার কথা আমার লজ্জা দূর করতে সাহায্য করছে। তবে তার বাড়াবাড়ি আছে। আমি এখনো অস্বস্তিতে আছি।

যখন আমরা বাড়িতে ফিরলাম পিরানদিত্তা গরিতে এসে দেখা করলো। সে গ্রামের একমাত্র ভাড়ার গাড়ি চালক। তার মানে গ্রামে একটাই গাড়ি। সেটা তার। আমরা তাকে আগেই আমাদের প্রোগ্রামের কথা জানিয়েছি যে, শনিবার সকালে সে আমাদের তুলে নেবে। বড় রাস্তায় বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে দেবে। এখানে তাকে দেখে ভাবলাম, সে আয়োজন নিশ্চিত করতেই এসেছে। কিন্তু সে যা বললো তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার কণ্ঠে অনুনয়, আপনারা অন্য কোনও গাড়ির ব্যবস্থা করুন।
কেন আপনার কী হয়েছে? ঘোড়া অসুস্থ?
না স্যার, তার দ্বিধাগ্রস্ত উত্তর। এরপর বলে, এইমাত্র খবর পেলাম চৌধুরী হক নেওয়াজ সাহেবকে কাল সকালে শহরে নিয়ে যেতে হবে।
বললাম, নো প্রবলেম। তিনিও আমাদের সঙ্গে চড়বেন।
না না। বড়লোকরা অন্যদের সঙ্গে গাড়ি চড়েন না।
শাকিলা কিছুটা বিস্মিত হয়ে খোঁচা দিয়ে বলে, তিনি কি অনেক লম্বা? নাকি তার সামনে আমাদের বামন দেখাবে?
পিরানদিত্তা ভয়ার্ত চোখে চারদিকে তাকালো, তিনি সব সময় গাড়ি ভাড়া করে একা চড়েন।
ঠিক আছে, এটাই যদি সমস্যা হয় তাহলে তোমার উচিত আমাদের নেওয়া। কারণ আমরা আগে তোমাকে বলে রেখেছি, কর্তৃত্বের সুর শাকিলার কণ্ঠে।
শাকিলাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, এটা বড় শহর না। এ গ্রামে অগ্রিম বুকিং কিংবা রিজার্ভ করার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। তাছাড়া চৌধুরী হক নওয়াজ সাহেব এই এলাকার দুই-তৃতীয়াংশ জমির মালিক। পিরানদিত্তা কখনো তার আদেশ অমান্য করতে সাহস পাবে না।
তবু সে বলে চলেছে। আমাকে বলছে, তুমি চৌধুরীর কাছে যাও। গিয়ে বলো, আগামীকাল আমরা যাব। আমরা আগে বুকিং করে রেখেছি।
তিনি খুব উদ্ধত ও বদমেজাজী। তিনি এটাকে অপমান হিসেবে দেখবেন।
তুমি কি তাকে ভয় পাও? শাকিলার ধারালো দৃষ্টি, বলে, আমাকে যেতে দাও, আমিই তার সঙ্গে কথা বলব।
এটা ঠিক হবে না।
পিরানদিত্তা বললো, ম্যাডাম। যার মানইজ্জত আছে সে তার সঙ্গে কথা বলতে ভয় পাবেই।
শাকিলা বলে, কী অদ্ভুত! একজন মানুষকে অন্য মানুষ ভয় পায়। এটা অবিশ্বাস্য!
সব মানুষ যথাযথ মানুষ নয়, পরিষ্কারভাবে তাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম। বললাম, সে হতে পারে একজন ভালো ড্রাকুলা। সময়ে ড্রাগনও মানুষের রূপ ধরে। কিন্তু এটা যাই হোক। প্লিজ, তুমি সিনেমার নায়িকা হতে যেও না। সব ভুলে যাও। আমরা অন্য ব্যবস্থা করব।
কিন্তু শাকিলা কিছুইতে আমার কথা মানতে চায় না, বলে, আমি অন্যায় দেখলে বলবোই। এটা প্রচলিত রীতিনীতির বাইরে।
হ্যাঁ, ঠিক আছে। মেনে নিলাম। আমরা প্রতিদিন কি নীতিভঙ্গের ঘটনা দেখি না? কিছু করতে পারি আমরা? ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পারি না। প্লিজ, এ সামান্য ব্যাপারে মন খারাপ করো না।
তবু শাকিলার যুক্ত, কিন্তু এটা কি আশ্চর্যের নয়, একজন লোক প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জমির মালিক হওয়ার কারণে গাড়িতে অন্যের পাশে বসতে চাইবে না। সে কি জানে না কোন যুগে বাস করছে?

আবারও তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি, তিনি এই এলাকার নিয়ন্ত্রণভার নিয়েছেন। তিনি বাস করেন তার নিজের সময়ে। আর এটা ভুলে যেও না আমরা আছি তার রাজ্যে, তার সময়ে।
বেশ ভালোই জানি, তার নির্বিকার উত্তর। বলে, আর এটাও জানি, এসব লোকের কারণে রুরাল এরিয়ার মানুষ পেছনে পড়ে থাকছে। তারা স্কুল চায় না, রাস্তা-ঘাট চায় না, পাছে মানুষ সচেতন হয়ে যায়, তাদের আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
সে যা বলেছে ধৈর্য ধরে শুনেছি। আমি জানি সে কয়েকদিন ধরে নিজের শ্রেণীতে অবস্থান করছে না।
পিরানদিত্তা চলে গেলে আমরা বাড়ি ফিরে এলাম। তাকে শান্ত রাখতে চেষ্টা করলাম। যেন সারারাত ধরে বাড়িতে বক্তৃতা দিতে না থাকে।
যেই আমরা বসেছি, পিরানদিত্তা ফিরে এলো। তাকে দেখে বললাম, এখন কী হলো?
স্যার অনুমতি পেয়েছি।
কিভাবে?
চৌধুরী সাহেবকে বললাম, রাস্তা ভেঙেচুরে গেছে। আর ধূলার ঢেউ উঠছে। তার জামা-কাপড় নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
তারপর?
তিনি কারুকে ডেকে ঘোড়া জুততে বললেন।
কোন ঘোড়া? শাকিলা জানতে চাইলো।
পিরানদিত্তা বলে, কেন তার নিজের ঘোড়া। তাদের পারিবারিক ঘোড়া একটা আছে তো!
পিপরানদিত্তাকে ধন্যবাদ দিয়ে পরদিন সকালে যথাসময়ে আসতে বলে দিলাম। সে চলে গেল। কিন্তু শাকিলা এখনো উত্তেজিত, তিনি ভাড়া গাড়িতে অন্যের সঙ্গে শেয়ার করে ওঠেন না। সে ঘৃণার সঙ্গে বললো, এটা নোংরা জমিদারি মনোভাব। ফুঃ।
হেসে বললাম, এখন রাগ কমাও। সমস্যা হলো, কখনো চৌধুরী সাহেব তোমাকে দেখেননি।
সে অবাক চোখে আমার দিকে তাকালো। তাকে ফিস ফিস করে বললাম, তিনি যদি তোমাকে দেখতেন, তাহলে মনে করতেন তোমার পাশে বসা তার সৌভাগ্য। কথা শুনে তার রাগ কমে যেতে লাগলো। ঠোঁটের কোণে হাসি দেখা গেলো। তার মুখের কথা সরে গেলো। শুধু অস্পষ্টস্বরে বললো, লাত্থি!

পরদিন সকালে যখন ভাড়া গাড়িটিতে চড়ে কিছুদূর গেলাম তখন দেখতে পেলাম আমাদের সামনে ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছেন চৌধুরী হক নওয়াজ সাহেব। তার মাথায় মাড় দেওয়া রঙিন পাগড়ি। পেছনে তার চাকর কালু হেঁটে যাচ্ছে। তার শরীর ঘোড়ার খুরের ধুলোয় মাখামাখি অবস্থা। রাস্তার অন্যপাশের জমিতে যারা কাজ করছিল, চৌধুরী সাহেবকে চিনতে পেরে কাজ থামিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সালাম জানাচ্ছে।
সকাল থেকেই রোদের তাপমাত্রা বাড়ছে। কড়া গরম পড়ার আগেই আমরা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে যেতে চাইছি। কিন্তু পিরানদিত্তা তার টাট্টুঘোড়াকে টেনে রাখছে। চৌধুরী সাহেবকে ওভারটেক করার সাহস পাচ্ছেনা।
কালুর জন্য দুঃখ হচ্ছে। সে ধুলোয় সাদা হয়ে গেছে মনিবের পিছু হাঁটতে হাঁটতে। স্বাভাবিকভাবেই আমরা কেউ এ ব্যাপারে নাক গলাতে পারি না। তবে শাকিলার পীড়াপীড়িতে পিরানদিত্তা কালুকে বললো, আমাদের গাড়ির জন্য জায়গা করে দিতে। চৌধুরী সাহেব এ কথা শুনে ঘাড় ফিরিয়ে আমাদের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকালেন। একবার আমাদের গাড়িটি দেখে কালুকে অনুমতি দিলেন আমাদের এগিয়ে যাবার সুযোগ করে দিতে।
শেষ সেতুটি পার হওয়ার সময় দেখি চৌধুরী সাহেব গাড়ি থামিয়ে একজনের সঙ্গে কথা বলছেন। আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না। তবু কোনোরকমে আমরা পার হয়ে যাওয়ার সময় সালাম বিনিময় করলাম।
শাকিলাল মন্তব্য, দেখতে তো বেশ স্মার্ট আর মর্যাদাবান বলেই মনে হলো।
কালুর উপস্থিতির ব্যাপারে ইঙ্গিতে তাকে সচেতন করে দিলাম। এর পরে সে আর কথা বলেনি। যা ভেবেছি তাই, এখনো সে ভাবছে সে বুঝি এখানে তার শ্রেণীতেই আছে।

বাসস্ট্যান্ডে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ভিড়। বাস চলাচল করছে প্রচুর কিন্তু থামছে না। আবহওয়া উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সবাই যার যার গন্তব্যে দ্রুত যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে। এরমধ্যে চৌধুরী সাহেবও বাসস্ট্যান্ডে এসে পৌঁছেছেন। লাগামটি কালুর হাতে দিয়ে তিনি অপেক্ষমাণ যাত্রীদের মধ্যে মিশে গেলেন। অনেকক্ষণ পরে একটা বাস এলো। সবাই দৌড়াদৌড়ি শুরু করলো। কিন্তু বাসের কন্ডাকটার দরজা বন্ধ করে রেখেছে। সে যাত্রীদের দু’হাতে ঠেলে রাখছে। শুধু যারা দূরে যাবে তাদের উঠতে দিচ্ছে। ভাগ্য ভালো আমরা চান্স পেলাম। চৌধুরী সাহেবসহ অন্যেরা পাচ্ছেন না। চাপ দিচ্ছে সবাই, পাল্টা ধাক্কাও খাচ্ছে।
ধাক্কাধাক্কিতে চৌধুরী সাহেবের পাগড়ি মাটিতে পড়ে গেলো। তিনি দ্রুত তুলে নিয়ে আবার বাসের দিকে দৌড়ে এলেন।
দূরের যাত্রীরা যখন নিশ্চিন্তে বসতে পেরেছে, তখন কন্ডাকটার অন্যদের ডেকে ডেকে ভেতরে দাঁড় করালো। বাস চলতে শুরু করল। ঘুরে চেয়ে দেখি চৌধুরী সাহেব দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। পাগড়ি হাতে দাঁড়িয়ে তিনি। ঠেলে ঠেলে পেছনের দিকে চলে গেলেন। শাকিলার দিকে তাকালাম। সে মুচকি হাসছে। তার হাসি হাজার কথার চেয়েও বেশি অর্থবহ।

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন