কারখানার বাঁশি: পর্ব-১৯॥ হামিম কামাল | চিন্তাসূত্র
১ পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ | রাত ১২:৪২

কারখানার বাঁশি: পর্ব-১৯॥ হামিম কামাল

॥পর্ব-১৯॥
সেরা পোশাকটি পরে সকাল সকাল পথে নেমে পড়ল সমীর। সুন্দর দিন, কী আনন্দ! কিছুটা পথ হাঁটতেই পোশাকের কৌলিন্য গেলো ঘুচে। সেরা পোশাক পরিণত হলো ঘামে ভিজে গায়ের সঙ্গে সেঁটে থাকা আধময়লা, বৈশিষ্ট্যবিভুল সামান্য এক পোশাকে। প্যান্টের কোমরগোঁজা অবস্থা থেকে শার্টটিকে মুক্তি দিয়ে পথচলতি অবস্থাতেই খানিকটা হাওয়া খেলানো হলো। সারি সারি কারখানা কাছিয়ে আসার আগে নিচে তাকিয়ে একবারও দেখার কথা মনে আসেনি জুতোর হাল। কালো চকচকে রূপটা ধুলোয়, ঘন কাদাজল শুকিয়ে গেছে ঢেকে, আর ইট সুড়কির ধারালো কোণের আঁচড়ে জুতোর সামনের ছুঁচালো অংশটা দাগে ভরে গেছে। এর আগে মনময়পুর সদর বাজার থেকে শখ করে কেনা এই জুতো পরে কারখানা গিয়ে হাসিঠাট্টার পাত্র হওয়ার পর সমীর দ্বিতীয়বার সপাদুকা মুখ দেখায়নি কাউকে। আজ ভালো মনে পরে এখন পণ কাটালো, এবং এর ফল হলো এই। চলতি পথেই কোনো দেয়াল ঘেঁষে একটা চারপেয়ে টেবিলের ওপর নাপিতের আয়না আর সামনে চেয়ার পেতে রাখা। কাটিয়ে বা খদ্দের কারও দেখা নেই। জায়গাটা পেরোনোর সময় আয়নার দিকে তাকিয়ে সমীর দেখতে পেল, এলোঝেলো বাতাসে যত্নলব্ধ সিঁথির কবর রচিত হয়েছে বহু আগেই। মুখের ওপর ঘামের পুরু অর্ধগলিত স্তর। সঙ্গে নেই কক্ষাল, তাই শার্টের ভেজা বাহুটা ভিজল আরো খানিকটা। ঊর্ধ্বাঙ্গের তুলনায় নিম্নাঙ্গের পোশাকের অবস্থা তুলনামূলক ভালো। কালো হওয়ায় প্যান্টের রঙের বদল বোঝার কোনো উপায় নেই।

দেখতে দেখতে রানার সামনে চলে এলো সমীর। সশব্দ সচল কারখানা, ভেতরে বহু দানবের গুঞ্জন, বাইরে কেউ নেই। পথের পাশে পড়ে থাকা এক টুকরো নীল কাপড় দিয়ে জুতোটা মুছে নিলো সমীর। প্রথমে শার্টের সামনের অংশ গুঁজে নিলো কোমরে, এরপর পেছনের অংশ, যদি কেউ আসে! চুলে আঙুল চালাতে গিয়ে টের পেল, ঘামে ভিজে আর ধুলো বাতাসে শুকিয়ে ওগুলো হয়েছে যেন জমাট পাটের আঁশ। এরপরও কপালের ওপর এসে পড়া চুলগুলো জোরক্রমে একপাশে সরিয়ে এগিয়ে গেল, সামনে ফটক। পকেট দরজার সঙ্গে ঝালাই করে লাগানো চিঠির খোল বোধয় আছে ওপাশে; এপাশে দেখা যাচ্ছে মাটির ব্যাঙ্কের মতো চ্যাপ্টা সরু একটা ফাঁক মাত্র। ওই ফাঁক গলে আবেদনপত্রটা ভেতরে ঢুকে পড়ল।

রানার পর গেল তাজরিন গার্মেন্টসের সামনে। সেখান থেকে এলো বিন্দুর কাছে। বিন্দুর দিকে ক্রমশ এগোতে এগোতে তার চোখে মুখে আগ্রহ ফুটে উঠল। সমীরের মনে আশা, যেন এই কারখানাতেই তার কাজটা জোটে। কেন জানে না, এই কারখানাটাই তার সবচেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে; যদিও ভেতরে কী চলছে জানে না তার কিছুই। সেটা কোনো বাধা নয়, জেনে নেওয়া যাবে! এক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে বড় ভাইয়ের শিখিয়ে দেওয়া পন্থাটা।

বিন্দুর কাছে আসতেই দেখা গেল, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে এক সশস্ত্র প্রহরী, নীল পোশাক তার পরনে। বুকের ওপর সেফটিপিটে আটকে রাখা পাতে তার বিশেষত্বহীন নাম।  আবেদনপত্রটা দিতে হলো তারই হাতে।

খামটা নিয়ে দু হাতের দু আঙুলে ধরে লোকটা বলল, দাঁড়ান, যাবেন না।

পরে নিজে একবার ভেতরে গিয়ে মুহূর্ত ব্যবধানে ফিরে এসে বলল, ভেতরে যেতে হবে।

ফটকটা পেরিয়ে ভেতরের ইট বিছানোর বিরাট উঠোনে পা রাখল সমীর। এ সময় অদূরের কালো কাচ ঘেরা একটা ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল এক তরুণকে, বয়েসে এবং মাথায় সমীরের সমানই বলা চলে তাকে। তার পোশাকও অনেকটা সমীরের পোশাকে মতো; রঙচঙে ফ্লানেলের শার্ট আর ভয়েলের পিচ্ছিল, ইস্ত্রি করা প্যান্ট। কোমরে সেও গুঁজে নিয়েছে শার্ট। তবে পায়ে কালো জুতোর বদলে শব্দ করে শোভা ছড়াচ্ছে খয়েরি রঙা একজোড়া স্যান্ডেলস্যু। পেরিয়ে যাওয়ার সময় ছোট ছোট চোখে চাপা ঈর্ষাকাতর চাহনি মেলে তাকিয়ে থাকল ছেলেটা। প্রহরীর পেছন থেকে জিজ্ঞেস করল সমীর, এই ঘরটায়? একবার পেছনে তাকিয়ে দেখল ছেলেটা পকেট দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতেও ঘুরে তাকে দেখছে। প্রহরী লোকটা মুখে তার প্রশ্নের কোনো জবাব দিলো না। কেবল মাথাটা নাড়াল ওপরনিচ। কিন্তু সমীর তখন পেছনে গেটের দিকে তাকিয়ে ছিল বলে প্রহরীর ভঙ্গিটুকু চোখ এড়িয়ে গেল। তবে চোখ এড়ালো না আরেকটা দৃশ্য। দেখল, ছেলেটা মুহূর্তে চোরাচোখে নিজেকে একবার দেখে নিচ্ছে।

কালো কাচ ঘেরা ওই ঘরে ঢোকার মুখে আরো একবার ফটের দিকে একটা নড়াচড়া দেখতে পেয়ে তাকাল সমীর, তাকাল নিরাপত্তারক্ষীও। সুশ্রী একটা মেয়ে হাতে সাদা খাম নিয়ে ভেতরে ঢুকেছে। এই মেয়েটিই বাস স্টেশন ফটোকপি দোকানের সেই মেয়েটি কিনা, মনে ভেবে তার মুখ দেখতে উতলা হলো সমীর। খয়েরি নারকেল ছোবড়ার পাপোশের ওপর দাঁড়িয়ে জুতো খোলার ভঙ্গি করে খানিকটা সময় ক্ষেপন করতে চাইলো। মেয়েটি আরো খানিকটা এগিয়ে আসতেই বুঝতে পারল, না, সেই মেয়ে নয়। কাছে কাছে আসতে আসতে মেয়েটির হাঁটার গতি এলো কমে।

নিরাপত্তারক্ষীকে একরকম সঙ্কুচিত হয়ে সে জিজ্ঞেস করল, ভাই, চাকরির আবেদন জমা কি এখানে?

নিরাপত্তারক্ষী এবারও শান্ত চোখে মাথা ওপরনিচ নেড়ে নির্বাকে হাত বাড়িয়ে থামটা চাইলো। এরপর দুজনের খাম হাতে করে দরজা ঠেলে আগে আগে ভেতরে চলল। কালো কাচের ওপর সাদা বাগনবিলাসের বিলাসী সরু ডালপালা ঝুলে আছে। সেসবে বাতাস দিচ্ছে দোল। মেয়েটি সমীরকে একবার দেখে নিয়ে একহাতের তালুতে আরেক হাতের মুঠি চেপ ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। তেলচাপা চুল ঠিক মধ্যখানে সাদা সিঁথিতে দ্বিভাগ, পেছনে ঘোড়ার লেজের মতো করে বাঁধা পড়ে একটা উল্টো প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি করে আছে। ফর্সা মুখে ছোট ছোট অসংখ্য তিল। চোখের মনির লালচে আভা চেহারায় আলাদা মাধুর্য নিয়ে এসেছে। দু পায়ের পাতা এক করে দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে এমন একটা বশংবদ বিনয়। ফিনফিনে ওড়নাটা দুপাশে সমান নয়, একদিকে তার খানিকটা পক্ষপাত। বাতাস সে দিকটা নিয়ে খেলছে।

ভেতর থেকে ডাক এলো। দরজা ঠেলে বেরিয়ে দুজনকে ভেতরে যেতে বলে প্রহরী ফটকের দিকে এগোল। দরজা ঠেলে সমীরই প্রবেশ করল আগে।

ভেতরে চশমা পরা একজন শুকনোমতোন লোক একটা টালি খাতায় কিছু টুকে রাখছে। তার ডান হাতের কাছে রিসিভার ওল্টানো সাদা টেলিফোন। টেবিলময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা আরো অনেক সাদা হলুদ নীল কাগজপত্র। মুখ তুলে একবার সমীরের দিকে, এরপর তাকে ছাড়িয়ে পেছনে মেয়েটির দিকে তাকালো লোকটা। তার চোখের ভাষায় চাপা উদ্বেগ দেখতে পেল সমীর। হাতের ইশারা সামনের দুটো চেয়ারে বসতে ইশারা করা হলো ওদের। দুজনের দিকে দুটো দলিলের মতো কাগজ এগিয়ে দিয়ে মুখ তুলল প্রথমবারের মতো।

পড়তে পারো তো? পড়ে দেখ, কোথায় কাজ করতে এসেছ।

লোকটার কথায় প্রমিত টান।

এখানে সব লেখা আছে পরের নিয়মকানুন, তারিখ, সব। বুঝতে পেরেছ?

কাগজের লেখাগুলোয় চোখ বুলিয়ে সমীরের অদ্ভুত ঠেকল সব। কাজের পরিবেশ নিয়ে প্রতিষ্ঠানের নীতিবহির্ভূত কোনো ওজর আপত্তি তোলা যাবে না, ঊর্ধ্বতনের অনুমোদন ছাড়া কোনো শ্রমিক ইউনিয়নে যোগ দেওয়া যাবে না, একই পরিবারের দুই ব্যক্তি চাকরির আবেদন করতে পারবে না, চাকরিরত অবস্থায় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কারও সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া যাবে না, ব্যক্তিগত কোনো অপারগতায় প্রতিষ্ঠানের বিভাগীয় প্রধানকে অবগত করতে হবে এবং সর্ববিষয়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত বলে মান্য করতে হবে। যোগ দেওয়ার পর এক বছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান কোনো প্রকার জবাবদিহিতা কিংবা পূর্বঘোষণা ছাড়াই ছাঁটাই বা পদ পরিবর্তন করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করে, কারও বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রকার ক্ষতিসাধনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে এবং কাজ চলাকালীন কোনো দুর্ঘটনা সংঘটিত হলে প্রতিষ্ঠান বিবেচনাসাপেক্ষে আংশিক কিংবা সম্পূর্ণ চিকিৎসাব্যয় বহন করবে, কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিশৃঙ্খলাকাজে সহায়তার প্রমাণ মিললে প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্মীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবে।

এমন অনেক না এবং শর্তযুক্ত হাঁ এ ভরা দলিলের শেষাংশে লেখা, এ সমস্ত নিয়মকানুনের সঙ্গে একমত হলে দলিলে স্বাক্ষর ও টিপসই দিতে হবে এবং আবেদনপত্রের ক্রম অনুযায়ী পরবর্তী সাক্ষাৎকারের তারিখ মুঠোফোনে যোগাযোগ করে জানিয়ে দেওয়া হবে।

পড়া শেষ হতেই সমীর চোখ তুলে লোকটির দিকে তাকালো। এতোক্ষণে টেবিলের ওপাশে তার চোখ অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।

কী, একমত? হলে স্বাক্ষর কর, টিপসই দাও। আর না হলে পথ খোলা।

সমীর পাশের মেয়েটির দিকে তাকালো। মেয়েটি তখনো দলিল থেকে চোখ তোলেনি, মুখের ভাবেও কিছু বোঝার উপায় নেই। আবারো দলিলের ওপর চোখ রাখল সমীর, উদ্দেশ্য, আরো খানিকটা সময়ক্ষেপণ। মেয়েটি কী করে সে দেখতে চায়।

অবশেষে দলিল থেকে চোখ তুলে রিনরিনে কণ্ঠে মেয়েটি কলম চাইল। চেয়ার সরিয়ে উঠে দাঁড়ালো টিপসই দিয়ে স্বাক্ষরের পর।

সমীর অসহায় চোখ তুলে আরো একবার তাকাল লোকটার দিকে। ধীরে ধীরে বলল, আমি আসলে আরেকটু ভাবতে চাই।

লোকটি সঙ্গে সঙ্গে দলিলটি যত্নে সরিয়ে নিয়ে মৃদু হেসে তাকে দরজাটা দেখিয়ে দিলো।

চাকরি করতে এসে নিজ অস্থিত বর্তমানের কথা ভেবে হয়ত সমীর লিখিত অনেক নিয়ম কানুন আপনাতেই মানতো। কিন্তু এখানে চোখে আঙুল দিয়ে অনেক কিছু বুঝিয়ে দিতে গিয়ে ব্যথা দেওয়া হয়েছে রীতিমতো। যে ধরনের শর্তশেকল দেখা গেলো, মনে হলো, এর অনেকগুলোই শ্রমিকদের শুষে খাওয়ার মোক্ষম জোঁকে পরিণত হবে। চোখে মুখে চাপা অসন্তোষ আর প্রতারিত ভাব ফুটে উঠল সমীরের। উপরন্তু লোকটা হাসিমুখে দরজা দেখালেও, তার আচরণে কোথাও একটা অমর্যাদাপ্রদ ইশারা যেন আছে তার প্রতি।

সমীর আর কোনো কথা না বলে চেয়ার সরিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দরজা ফাঁক করে আর একবারও পেছনে না তাকিয়ে ফটকের দিকে এগিয়ে গেল। ফটকের বাইরে এসে বেশ খানিকটা সময় দাঁড়িয়ে থাকল ঠোঁটে ঠোঁট চেপে। এতো আগ্রহ ছিল বিন্দুতে কাজ করার, কিন্তু একটা কেমন অশুভ মেঘ যেন এখানে ক্রমে ঘনিয়ে উঠছে। বোধয় পছন্দসই কোথাও তার ঠাঁই হওয়ার নয়।

 কারখানার উল্টো দিকে সাতাশ শতাংশ জায়গা কিনে চারদিকে উঁচে দেয়াল তুলে রেখেছে অপর এক কারখানা কর্তৃপক্ষ। ওখান থেকে নাকি তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপ্রসাদ বিতরিত হবে। সাদা রঙ করা ওই দেয়াল ঘেঁষে একটা চাকাওয়ালা ছাউনি দেওয়া ভ্যানগাড়ি দাঁড় করিয়ে তাতে পাতা হয়েছে চায়ের সরঞ্জামাদি। আর মাথার ওপর বড় নীল তেরপল দিয়ে তৈরি হয়েছে ছাদ। তেরপলের দুটি প্রান্ত দেয়ালের ওপর গজাল ঠুকে তাতে পাটের সুঁতো বেঁধে আটকে নেওয়া, আর অবশিষ্ট দুটি প্রান্ত পাটের সুতো দিয়ে দুটো দেড় মানুষসমান উঁচু বাঁশের সঙ্গে বাঁধা। দিব্যি ছাদ। এরপর নিচে হাওয়াখসা চাকার ভ্যান আর নড়বড়ে দুটো বেঞ্চ। পায়ায় পানরসিকের চুন মোছার চিহ্ন। নড়বড়ে ওই বেঞ্চিতে বসে ছোট কাচের পাত্রে দেওয়া চায়ে চুমুক দিতে দিতে সমীর তাকিয়েছিল ফটকের দিকে।

এসেছিল দুপুরের শুরুতে। এখন বিকেলের মাঝামাঝি সময়। মাঝবয়েসী দোকানি তার ঢুলুঢুলু চোখজোড়া মেলে র্ক্ষণে ক্ষণে দেখছে সমীরকে। আর যারা চা চায় তাদের জন্য ছাঁকনি পাতছে, চামচ নাড়ছে; যারা সিগারেট চায়, হলুদ কলার কাঁদির পাশে ঝোলানো গামছায় হাত মুছে প্যাকেট বের করে তাদের সিগারেট দিচ্ছে।

টাকা মিটিয়ে বেরিয়ে দোকানের সামনের রাস্তায় আগপিছ করে বাকি সময়টাও কাটিয়ে দিলো সমীর। কর্মঘণ্টা শেষ হওয়ার বাঁশিটার বেজে উঠল। ঘটাং শব্দে খুলে গেল ফটক। এর মিনিট খানেত পর সরে গেল ফটকের দুটি পাল্লা। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বানের জলের মতো বেরোতে শুরু করল শ্রমিকরা। দেখা গেল এখানকার বেরোনোর নিয়ম শক্তিমতির মতো নয়। কারণ শ্রমিক সংখ্যা। সমীরের ধারণা হলো, শক্তিমতির চেয়ে অন্তত কুড়ি পঁচিশগুণ বেশি শ্রমিক এখানে কাজ করে; আরো বেশিও হতে পারে সংখ্যা। সুতরাং একজন একজন করে বেরোনোর কোনো অবকাশ নেই।

বেরোনো মানুষগুলোর দিকে চোখ রাখতে শুরু করল সমীর। একজনের মুখও ঠিক এমন ভরসা করার মতো পেল না যাকে ডেকে কারখানার ভেতরের খবর জিজ্ঞেস করা যায়। যার ওপরই চোখ পড়ল তার ভেতরই জিজ্ঞেস করে উত্তর না পাবার একটা না একটা কারণ আবিষ্কার করে ফেলল সমীর। আর যতোই পেতে থাকল কারণনিচয়, ততোই নিজের ভেতর সংকুচিত হয়ে যেতে থাকল আরো।

অবশেষে দেখেশুনে তার বয়েসী এক ছেলেকে পেছন থেকে ডেকে উঠল সমীর, এই যে ভাই, এই যে!

ছেলেটি প্রথমে কান করলো না। তবে কিছুদূর এগিয়ে তার বোধে পশল, কেউ বুঝি ডেকেছে তাকে। কিন্তু এই ভেবে যখন পেছন ফিরল সে, তার চোখ মুখের অভিব্যক্তিতে যে তীব্র বিরক্তি আর হুড়োতাড়ার ভাব দেখা গেল তাতে তার সামনে যাওয়ার, জিজ্ঞেস করার সাহস হারাল সমীর। এমন ভাব করে অন্য দিকে তাকাল যেন তাকে ডেকে ওঠা লোকটি সে নয়। কত রকমের মুখের যে নারী পুরুষ, একসঙ্গে এতো মানুষ শক্তিমতির কর্মী সমীর একসঙ্গে অনেক’দিন দেখেনি। কারখানায় যখন কাজ করতো , এদিকটায় কখনো এমন সময়ে আসা পড়েনি তার। যারা অশান্ত মুখে বেরোচ্ছে, তাদের কাছে যেতে সাহস হচ্ছে সমীরের। আর যারা শান্ত মুখ করে বেরোচ্ছে, তাদের কাছে সত্য খবর মিলবে না বলে প্রতীতি জন্মাচ্ছে। একটা বিশেষ দল চোখে পড়ল, যারা বেরোচ্ছে দল পাকিয়ে, হাসতে হাসতে। ওদের শরীরী ভাষায় এতো বেশি আত্মবিশ্বাস যে তাদের অনুসরণ করতে লোভ হয়। তাদের আশপাশে এমন কিছু দলকে দেখা গেল যারা এতটাই বিমর্ষ আর আড়চোখ দৃষ্টিপ্রবণ, মনে হচ্ছে সন্দেহ এবং শারীরিক সমস্যা একেকজন জর্জরিত হয়ে আছে। বেশিরভাগ নারীর মুখ ভারি প্রশান্ত। দেখে মনে হয়, এঁরা নিজ নিজ কাজের ভুবন নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট। যাবতীয় অসন্তোষকে এরা আরোপিত মনে করে, আর তাদের এড়ানোর মোক্ষম সব উপায়ও আছে জানা। শেষমেষ সমীর এমন চোখের এক পুরুষের দিকে এগোতে গিয়েছিল, কারণ দুটো ভালো কথা শুনতে চাইছিল তার মন। ওই লোকটাও ভিড়ের ভেতর হারিয়ে গেল কোথাও। এরপর পুরোপুরি না চাইতেই আরেকজনের দিকে তার কণ্ঠ ছুটে গেল। সেও একটিবার পেছনে তাকিয়ে আবার মিশে গেল ভিড়ে। এভাবে অসংখ্য মানুষ তাকে পেরিয়ে গেল, কিন্তু একজনকেও পুরো তৈরি করে প্রকৃতি তার সামনে এনে রাখল না। অবশেষে ওই চায়ের দোকানটিতেই আবার এসে দাঁড়াল সমীর। মধ্যবয়েসী দোকানি লোকটি তার বড় বড় সরস চোখ মেলে তাকে দেখল কিছুক্ষণ। এরপর যথাসম্ভব কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ভাই কি কারও খোঁজ করেন?

এ প্রশ্নে সমীর হঠাৎ বিব্রত হয়ে উঠল বটে, কিন্তু তার আচরণের অস্বাভাবিকতাটুকু সম্পর্কে সে নিজেও তো জ্ঞাত। তাই মনকে বুঝিয়ে, ভেতরের প্রশ্নগুলো গুছিয়ে পেছন ফিরে তাকালো দোকানির দিকে। এরপর সবচেয়ে দামি সিগারেট চেয়ে নিয়ে বুকে ধোঁয়া প্রবেশ করাতে গিয়ে ভীষণ কাশলো। উপস্থিত সবার হাসির বিপরীতে হাসি ফিরিয়ে দিয়ে দোকানির কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, একটু কথা বলা যাবে আপনার সঙ্গে?

কী ব্যাপারে ভাই? লোকটার কণ্ঠে এবার চাপা সতর্ক ভাব।

এই ফ্যাক্টরির ব্যাপারে কথা।

আপনি কি খবরের কাগজের লোক? লোকটার কণ্ঠম্বর এবার যেন খানিকটা লঘু হলো। ঠোঁটেও হাসির খানিকটা আভাস, যেন পত্রিকার লোক হলে দুকথা বলাই যায়, মন্দ হয় না। কিন্তু তাকে হতাশ করল সমীর।

না গো ভাই। আমি পত্রিকার লোক না, একদম সাধারণ লোক। আমি আসলে এখানে চাকরির আবেদনপত্র দিতে এসেছিলাম আজকে। এখানে নাকি অনেক লোক নেবে, পরশু দেখে গিয়েছিলাম। এখন, আজকে জমা দিতে এসেছিলাম কাগজ। কিন্তু কিছু ভাবগতিক দেখে কেমন যেন লাগছে। এখানে সুবিধা করতে পারব বলে মনে হচ্ছে না, সত্য কথা। তাই আমি আসলে জিজ্ঞেস করতে চাইছিলাম কাউকে, এখানে কাজ করে এমন কাউকে। এমন কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলাম। তো সত্য বলতে যা, কাউকে ওভাবে ডাকার সাহস পাচ্ছি না। বুঝতে পারছিলাম না কী করব। আপনার দোকান তো কারখানার সামনে একদম। আপনি কি ভাই কোনো সাহায্য করতে পারেন আমাকে?

কী সাহায্য?

মানে এই দুই কথায় বলতে পারেন, এই কারখানায় যারা কাজ করে তারা কেমন আছে? বলতে পারেন এখানকার মালিক কেমন লোক? এই এসব?

লোকটা এক হাতে ধোঁয়া ওঠা চা পাতায় ভরা হলুদ বাঁটের ছাঁকনি ধরে ছিল। সমীরের কথা থামলে ঝুঁকে নোংরা কালো বালতির ওপর ছাঁকনি উপুড় মৃদু ঝাঁকাল। চায়ের পাতার একটা জমাট থোক সশব্দে গিয়ে পড়ল ওই বালতির ভেতর।

একটু অপেক্ষা করতে হবে, বাঁ হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুল এক করে অনুনয়ের ভঙ্গেতে বলল লোকটা। তার সামনে একটা বড় রুপালি ট্রের ওপর তখন সার বেঁধে ছটা কাচের ছোট পাত্র দাঁড়িয়ে। চারটিতে তার এক চা চামচ চিনি দেওয়া হলো, দুটিতে নয়। ছাঁকনিতে নতুন চা পাতা নিয়ে কেতলি উঁচিয়ে ধীরে ধীরে ওই চা পাতার ভেতর দিয়ে চালিয়ে দিতে থাকল জল। চায়ের পাতাকে ফাঁপিয়ে ফেনিয়ে চুঁইয়ে পড়া জল পরিণত হলো পছন্দনীয় লিকারে। এরপর দ্বিতীয় দফায় গরম জল ঢেলে চামচ নেড়ে একককে করা হলো একাকার। এরপর বেঞ্চে বসা লোকদের হাতে হাতে পৌঁছে দিয়ে আগের লাল গামছায় হাত মুছে বয়াম থেকে একটা চৌকো বিস্কিট বের করে মুখে দেওয়ার আগে সমীরকে জিজ্ঞেস করল ইশারায়, সে খাবে কিনা। না করতেই, পুরোটা একসঙ্গে মুখে দিয়ে চিবিয়ে এক গ্লাস জল খেতে খেতে চোখ ঘুরিয়ে তাকাল সমীরের বিব্রত মুখটার দিকে। ঠোঁট মুছে এগিয়ে সমীরের একটা হাত ধরে দোকানের বাইরে রাস্তায় নিয়ে এলো। এবার মুখোমুখি দাঁড়াল দুজন।

তার চোখজোড়া বাক্সময়। খাদে গলার স্বর।

সোজা কথা বলি। এখানে যারা কাজ করে তারা ভালো নাই। আমার এখানে তো তারা চা খায়, তখন আলাপ করে, আমি শুনি। আপনার মতো কাউকে আমি এর  আগে পাই নাই এভাবে জানতে চায়। মনে হলো লোকটা ভালো, তাই বললাম। এ কথা জিজ্ঞেস করতেই বুঝি লোক খুঁজছিলেন? দক্ষিণ পূর্ববঙ্গীয় টানে বলা কথার শেষবাক্যটিতে স্পষ্ট কৌতুক।

কৌতুকের আভাস পেয়ে সমীর কিছুটা সহজ হয়ে এলো। বলল, এটাই তো বললাম ভাই আপনাকে। যাক, আর কাউকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন হলো না, আপনিই আমাকে সব বললেন।

লোকটা বলল, এভাবে জিজ্ঞেস করলে মনে করেছেন কেউ আপনাকে বলতো কিছু? কিছুই বলতো না। সবাই জানে, চারদিকে ছদ্মবেশে মালিকপক্ষের লোক। মনে করতো আপনি মালিকের লোক। জবাব দিয়ে কোন বিপদে পড়ে! বলবে কেন? শুধু তাই না ভাইটা। আপনি নিজেও বিপদে পড়তে পারতেন। এখানে মালিকের ওপর ক্ষ্যাপা লোকের অভাব নাই। তারা আপনাকে ডাকতো। কী হতো ঠিক নাই।

সর্বনাশ, তাহলে তো বড় বাঁচা বাঁচলাম ভাই। কিন্তু একটা কথা। আপনি কেন মনে করলেন না আমি মালিকের লোক?

লোকটা উদার হেসে বলল, আর কেউ তো আপনাকে আগে দেখে নাই। এদিকে আমি আপনাকে দেখছি কতক্ষণ যাবত বলুন তো? ঘণ্টাখানেক তো হবেই। এরমধ্যে আমার এখানে চা খেলেন। চা খাওয়ার ঢং দেখেই আমি মানুষ চিনতে পারি। আর আমার চোখ ভালো, সবাই জানে। আপনি তো জানেন না। মানুষ আমার মুখের কথায় মানুষ চেনে এখানে। বুঝলেন ছোট ভাই?

সমীর লোকটার কথার ঢঙে বেশ আমোদ পেল। হাসতে থাকল তার চোখের দিকে তাকিয়ে। মনে হলো না কোনো চালিয়াতি চলছে কোথাও।

ফটকের বাইরে কিছু লোক বৃত্তাকারে জড়ো হয়েছে। ক্রমে বড় হচ্ছে বৃত্তের পরিধি। মানুষগুলো জোটে গিয়ে ভেড়ার পর চারদিকে তাকাচ্ছে ফিরে ফিরে। তাদের চোখজোড়া আগুন ছড়াচ্ছে যেন। বৃত্তের বাইরের যার সঙ্গেই হচ্ছে চোখাচোখি, সেই পাচ্ছে আগুনের ভাগ। তখন কেউ পথ পেয়ে ওই ভিড়ে এসে জুড়ছে। কেউ ভয় পেয়ে সটকে পড়ছে দূরে। দূরে সরে পড়াদের দলের ভেতর নারীর সংখ্যা বেশি। দাঁতে ঘোমটা কামড়ে দ্রুত সরে পড়ছে। ফিসফিসিয়ে চলেছে নিজেদের ভেতর। পুরুষদের অনেকে যেমন আসে চক্ষু লজ্জাতে বরাবর, যুদ্ধ সফল হলে কৃতিত্ব নেয়, বিফল হলে বিরুদ্ধাচরণ করে; এখানেও বোধয় মঞ্চায়িত হচ্ছে ওই একই নাটক। তবে এই ভিড় মানুষ মানুষী উভয়কেই টেনেছে কম নয়। উভয়ের দলেই কমবয়েসীদের উপস্থিতি বেশি। প্রথম তার ডাক শুনে থেকে গিয়ে বিরক্ত মুখে তাকানো ছেলেটিকে হঠাৎ ভিড়ের মানুষজটার ভেতর দেখতে পেল সমীর।

কারা ওরা? দোকানির দিকে প্রশ্ন ছুড়ল সে। ওই যে, ভিড় করছে যারা।

সমীরের কথা শুনে লোকটিও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তার চোখ ঘুরে বেড়াতে শুরু করল এদিক ওদিক। দেখল, ওই বৃত্ত থেকে কজন বলে কয়ে তার দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। হাঁক দিচ্ছে তার নাম ধরে, কণ্ঠে ক্ষোভ। দেখে লোকটা দোকানের দিকে দ্রুত ছুটে গেল। পেছন পেছন গেল সমীর। কাছে যেতেই ক্ষুব্ধ একজন বলে উঠল,  কী ব্যাপার নুর ভাই, তুমি নাই! জানো না এখন তোমাকে কত দরকার?

দোকানি, অর্থাৎ লোকটির সেই নুর ভাই, হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানাল সবাইকে। তার ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে কর্তব্য বুঝে এটা ওটা নাড়াচাড়া শুরু করে দিলো।

ওদিকে লোকগুলোকে লক্ষ করতে থাকল সমীর। গোলাকার মুখের এক লোক বিশেষভাবে দৃষ্টিকে আকৃষ্ট করলো। চুলগুলো তেলে বসানো, পেছনে আঁচড়ানো টানটান। চুলের ঘনত্ব বেশি নয়। আঁচড়ের ফাঁক দিয়ে মাথার তালু দেখা যাচ্ছে। অথচ বয়স বেশি নয়। থুতনির এক পাশ কালো মাস, পাশাপাশি দুটো। গোঁফটা সাধারণ; ছেঁটে রাখা ভব্য গোছের। নুরের সদ্য ধোয়া কাপগুলোর দিকে আঙুল তুলে বলল, দেখি নুর ভাই, তোমার ওই লাল চা টা বানাও তো! বস কথা বলতে শুরু করার আগে তোমার চায়ে চাঙা হই। আর সিগারেট দিও আগে।

এই শেষ কথা বলার পর আর মুহূর্তের দেরি সহ্য হলো না। ছাঁকনিতে পাতা তুলছিল নুর। লোকটা তাগাদা দিয়ে বলে উঠল, কই কই, দাও!

নুর হাত তুলে বলল, আর বলতে হবে না বস। আমি একটু ব্যস্ত ছিলাম, তাই হঠাৎ ধাত গোছাতে পারি নাই। কিন্তু এই দেখেন না, কেমন দৌড়ে চলে এলাম? এরপর হাত চালাতে চালাতেই আগতদের খানিকটা ব্যস্ত রাখতে বলল, আচ্ছা বস, এই যে ইনাকে একবার দেখুন বস, কথা বলছিলাম আমরা। ফ্যাক্টরিতে চাকরির জন্য আবেদন করেছেন আজকেই। আমার কাছে জানতে চাচ্ছিলেন ভেতরের পরিবেশ কেমন।

খানিক আগের কথোপকথনের ভিত্তিতে আন্দোলনকারীদের মনে মনে সমর্থন করলেও তাদের বিষয়ে খানিকটা ভীত হয়ে ছিল সমীর, না জানি তাকে ওরা কী মনে করে এই প্রশ্নের জন্য। তাই হঠাৎ নুরের এমন কথায় সে ভারি বিব্রত হয়ে উঠল। একটা অপরাধী ভাব ঘনিয়ে উঠল তার চোখেমুখে। লোকগুলোক দেখছিল সমীর, ওই মুহূর্তে নামিয়ে নিলো মুখ। নুরের চামচ নাড়া দেখতে থাকল। কান দিয়ে বেরোতে থাকল গরম হাওয়া।

এসময় টানটান চুলের মানুষটি পাশে যে দাঁড়িয়ে ছিল, সে কাঁধে হাত রাখল সমীরের। হাতটা বেশ ভারি লোকটার; চেহারার মতোই। এর ফোলা ফোলা গাল, গোলাকার মাথার চুলগুলো এক পাশে আঁচড়ানো। নাকের নিচের গোঁফ বড় হয়ে ওপরের ঠোঁট প্রায় ঢেকে ফেলেছে। শখের গোঁফ, ছাঁটা অগ্রভাগ দেখে বোঝা যায়। গালভরা খোঁচা খোঁচা দাড়ি। দেখে বোঝা যায়, দাড়ি বাড়তে দেওয়ার ইচ্ছে তার নেই।

কোথায় থাকো ছোট ভাই? লোকটার কণ্ঠে মমতামাখা কর্তৃত্ব। টান টান চুল ততক্ষণে সিগারেট ধরিয়ে তাদের দিকে ফিরেছে। ওদিকে চায়ের কাপগুলোর তল কালচে ফোমের ওপর রেখে জল মুছে নিচ্ছে নুর।

সমীর আঙুল তুলে পেছনে দেখিয়ে বলল, ওই, কেওয়া।

আবেদন করে এরপর জানতে চাইছ ছোট ভাই? করার আগে জানতে চাইলে একটা কথা ছিল। ভুল করেছ।

সমীর কিছু বলতে চাইল। কিন্তু গলা থেকে কোনো স্বর না বেরোনোয় আর জোরও খাটালো না। ওদিকে সিগারেটে উপর্যুপরি টান দিয়ে ধোঁয়ার পর ধোঁয়া ছেড়ে নিজের চারপাশ রহস্যময় করে তুলেছে মাসওয়ালা। তবে রহস্য স্থায়ী হচ্ছে না। বাতাসে মিশে যাচ্ছে দ্রুতই। বলল, আহা বেচারা, ইঁদুরের ফাঁদে ঢুকতে যাচ্ছ, ইঁদুর ধরার ফাঁদে।

সমীরের কাঁধ থেকে লোকটার হাত নামলো। তাদের কথার ঢঙে, চোখের ভাষায় সমীর আশ^স্ত হলো। কোনোক্রমে জিজ্ঞেস করতে পারলো, কেন, কেন এ কথা বলছেন?

অনেক কথা, বলল গোঁফওয়ালা লোকটা। চলো, আমাদের বস এখন ওখানে কথা বলবেন। যাবে?

মাসওয়ালা বলল, না না, ওকে নিস না। আগের দিন কী হলো মনে নাই? আজো হবে। বাইরের ছেলে। ঠিক হবে না। ছোট ভাই, জেনেছ তো যা জানার। যাও, তুমি চলে যাও।

যেন আগপিছ না ভেবেই আগে বলেছিল এবং তার জন্যে বেশ লজ্জিত এবার, এমন মুখ করে গুঁফো লোকটা বলল, ওহ, আমারই ভুল। যাও ভাই, তুমি যাও। এখানে থেকো না। যত দ্রুত পারো, পালাও।

সমীরের এক মন পালাতে চেয়ে তিন মনের বাধা পেল। ভাবলো, কোনোভাবে যদি থেকে দেখা যেত কী হয়। কিন্তু এদের কী করে তা বোঝানো যায়?

সসঙ্কোচে বলল, ইয়ে, মানে, আমার থাকতে অসুবিধা নাই। মনে হচ্ছে একটা কোনো প্রতিবাদ করবেন আপনারা। আমার এসবে থাকতে ভালো লাগে। যদি আপনারা অনুমতি দেন, তাহলে থাকতে পারি।

মাসওয়ালা বলল, আমাদের অনুমতি নেই। সুতরাং থাকলে তুমি নিজ দায়িত্বে থাকতে পারো।

তার কথার সুরে সমীর মনে আঘাত পেল খানিকটা, কিন্তু দমল না। এদিকে পাল্টা কোনো কথাও খুঁজে পেল না, বলা ঠিক হবে কিনা তাও বুঝতে পারল না। কিন্তু ভেতরে তার বেয়াড়া মরিয়া মনটা তো আর মরে যায় নি। বরং খানিকটা প্রশ্রয় আর খানিকটা শাসনের বিভবপার্থক্যে শক্তির প্রবাহ শুরু হয়ে গেল। ওই মন সুপ্তাবস্থা থেকে ক্রমে আবার জীবন্ত হয়ে উঠতে লাগল ক্রমে। এরই ধারাটা ধরে কখন একটা প্রশ্ন করে বসল ওদের, তা নিজেও টের পেল না।

ভাই, আগের দিন কী হয়েছিল? এই ভাই বলছিলেন। মাসওয়ালাকে দেখিয়ে বলল সমীর। আমি বন্ধুদের কাছে এটার কথাই শুনেছিলাম কিনা তা একটু জানতে চাইছিলাম আরকি। একটু বলবেন?

টান টান চুল করে থাকল চুপ। কথা বলল গোঁফওয়ালা। আজকে তো এখানে কথা হবে। আঙুল দিয়ে ভিড়টা দেখিয়ে বলে গেল লোকটা। আগের দিন আমাদের ইউনিয়ন অফিসে কথা বলেছিলেন বস। তখন পুলিশ এসে পিটিয়েছিল, কাঁদানে গ্যাস ছেড়েছিল। আজ তাই আমরা এখানে জড়ো হয়েছি। যা হবে কারখানার সামনেই হোক। পত্রিকায় কবর দেওয়া হয়েছে, বিদেশি পত্রিকাও নাকি এসেছে। আজ বোঝা যাবে কত ধানে কত চাল। আামদের বস হলেন সালাম ভাই। সালাম ভাইয়ের কথা যদি দুই মিনিটও লোকে শোনে, ঘুরে যাবে। কিন্তু ওদিকে তো ক্ষেপবে। ক্ষেপে একটা পাগল করে বসুক না, মজা বুঝবে। খেলা কথা না।

কথাগুলোর কিছু সমীরকে লক্ষ করে বলা। কিছু কথা স্বগোতোক্তির মতো, আর কিছুতে অভিমতের সুর। কিছু কথায় রায়ের সুর রীতিমতো।

সমীরের ভেতর রক্ত ততক্ষণে নাচতে শুরু করেছে। এই বিরোধ, এই জমাট মানুষ দূর শৈশবে সে দেখেছিল। তখন একটা পূর্ণাঙ্গ পরিবারের অপত্য ছিল সে, বুঝতো কম, জানতো কম, জীবনের কিছুই তখনো দেখেনি। কিন্তু প্রতিক্ষণে যে বার্তা এসেছিল, মনের গোপন ঘরে সেটা ছিল জমা। আজ বুঝি উপযুক্ত চাবি পড়েছে। আর ওই ঘর ছেড়ে অতীত স্মৃতি, প্রেরণা, প্রেষণাও বেরিয়ে এসেছে। সমীরের কণ্ঠস্বর বদলে গেল। বলল, আমি বাইরের মানুষ, বুঝতে পারছি। তবু বলব, আমি থাকতে চাই।

অবশ্যই! কেন না!

সামনের দুজনেই চুপ। কে বলে উঠল এ কথা? লোকটা পাশেই ছিল। নতুন এসে দাঁড়িয়েছে। তার পাশের লোকটি এবার আগের চেয়ে দ্বিগুণ উঁচু স্বরে অভয় দিয়ে বলল, আরে! সবার আসা দরকার, সবার! এটা তো কারও একার যুদ্ধ না, সবার যুদ্ধ! সমস্ত গার্মেন্ট শ্রমিকদের যুদ্ধ!

বিকালের সূর্য সোনারঙ ঢেলে দিতে শুরু করেছে পৃথিবীতে। সেই রঙে স্নান চলছে দেদার। জড়ো হওয়া নরনারীর কারও চোখে ভীতি নেই তা বলা যাবে না, তবে ঝলমল করছে, এমন মুখের সংখ্যাই বেশি। নারীর খোলা ঢেউ খেলানো চুলে গড়াচ্ছে আলো। আলোর ঝিলিক তার সোনালী নাকফুলে। সেই আলো যার যার ভেতর থেকে যেমন বিচ্ছুরিত, বাহির থেকেও তেমনই গৃহীত, বোঝা যায়।  আছে মাথায় ওড়না চেপে কানের দুপাশে গুঁজে রাখা নারী। আছে সৌখিন গুঁফো পুরুষ থেকে কালো দাড়িতে বুক ঢাকা মানুষ, সবাই।

জটের ঠিক মধ্যখানে নেতাকে দেখেই চেনা গেল। তার মুখচোখ থেকে বুঝি অবিরত শক্তি ঝরে পড়ছে। শত লোকের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকার পরও চোখের আলোয়, তার শরীরী ভাষায় ওই স্বাতন্ত্রটি যেন আলাদা করা যায়। ভিড়ের মধ্যে অধঃমুখে চুপ করে সে দাঁড়িয়ে আছে, যে একমনে অনুভব করছে কিছু। হাত দুটো বুকের কাছে বাঁধা। কপালে দুটো ভাঁজের রেখা, স্থায়ী। কালো আয়ত চোখজোড়া থেকে থেকে তুলে ধরছে মানুষের দিকে। যেন গণনা করছে চারপাশ। মাঝে মধ্যে এদিক ওদিক মুখ ঘুরিয়ে বিশেষ কাউকে খুঁজে নিতে চাইছে তার চোখ। কখনো আশ্বস্ত হয়ে ওপর নিচ মৃদু মাথা দোলাচ্ছে, কখনো আবার চোখে জাগছে চাপা অসন্তোষ। বিকেল শেষের সোনালী আলো তার কালো চুলেও খেলছে। কেউ একদৃষ্টে তাকে দেখছে। কেউ তাকে দেখছে থেকে থেকে। কেউ আবার তার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকিয়ে, বুঝে নিয়ে যা বোঝার, বিশেষ কাউকে খুঁজে এনে দাঁড় করাচ্ছে জটে, হচ্ছে সাময়িক দলছুট। তেমনই দলছুট একজন এসে দাঁড়াল নুরের চা দোকানের সামনে। টান টান চুল মাসওয়ালাকে লক্ষ করে ছুড়ল বাক্যবাণ।

সরোজ ভাই, আশ্চর্য মানুষ! তোমরা এখানে? বস ক্ষেপছে না?

কথাটা শোনামাত্র যেন টনক নড়ল সরোজের। সিগারেট পায়ের পাতায় চেপে তৎক্ষণাৎ, এই চলো চলো,। নড়েচড়ে উঠল সবাই।

জটের কাছে পৌঁছে সমীর বুঝতে পারল সরোজ তাদের নেতা সালামকে কতখানি ভালোবাসে, কিংবা অনুসরণ করে। তার চুল রাখার ধরন, গোঁফের ছাঁট, মুখের ভাব, সব কিছুতেই সালামের ছাপ স্পষ্ট।

চারপাশে পছন্দসই অনেককে দেখে আশ্বস্ত হয়ে সালাম প্রথমবারের মতো গলা পরিষ্কার করে নিলো। মুখেও হাসি ফুটে উঠল।

কণ্ঠ ভরাট নয়, উচ্চকিত হয়ে নেই। যেন এক গভীর গম্ভীর নদ ধীরে বয়ে চলেছে। সে নদের সংস্পর্শে আসছে দুপাশের জনপদ। নদের পাশের ভেজা নরম মাটিতে হাঁটু গেঁড়ে বসে তারা আঁজলা ভরে নিয়ে জল পান করছে, তপ্ত বুক, পিঠ, ব্রহ্মতালু শীতল করে তুলছে। কিন্তু মধ্যনদের দিকে তাকাচ্ছে ভয়ার্ত চোখে। সেখানে সম্মুখগামী কিন্তু অন্ধ যে স্রোত, তার নিচে বয়ে চলা যে উল্টো স্রোত আর উভয়ের মিলনবিন্দুতে তৈরি যে জলঘূর্ণি, সেসবের বিষয়ে তারা খুব বেশি জানে না, তাই তাদের ভয়, বাবা, ডুবে যাব ওই জলে! সব কথা কেন শুনতে হবে ওর? কারও কারও চোখে ওই মাঝনদের জলে ডুবে মরার ভয় থেকে ফুটে উঠেছে ভীত দৃষ্টি; কেউ আবার সেই দৃষ্টিকে স্পষ্ট ফুটে উঠতে দিচ্ছে না। কারও কারও চোখে আবার ওই মাঝনদে ডুবসাঁতারের স্বপ্ন, তোমাকেই ভালোবেসেছি, তুমি আমাদের কথা বলেছ, আমাদের মনের কথা পড়েছ। তোমার সব কথা শুনব বলে এসেছি আমরা। আছি তোমার পাশে। আবার কারও চোখে সে নদ সাঁতরে পেরিয়ে ওপারে গিয়ে ওঠার স্বপ্ন, আপাতত শুনছি আপনার কথা। দেখি তারপর, বাতাস কোনদিকে বয়। এমন বিবিধ ভাষ্যের বিপরীতে নদ তার নিজ গতিতে চলেছে। চলেছে আর ভালোবাসা বিলিয়ে চলেছে। বুঝি সে নিজেও দিব্যি জানে, জাতে আর গন্তব্যে দুই পক্ষ পুরোপুরি আলাদা। তবে দুজনের ক্ষেত্রেই শুধু সংগ্রামটুকু সত্য। শান্ত হাস্যমুখী, একইসঙ্গে কথা আগুনমুখো এই মানুষটির ভেতর সমীর তার জ্ঞানরথের সুপ্রিয় সারথী সলিল আর প্রাণরথের সহযাত্রী অগ্রজ তারেককে যেন একসঙ্গে দেখতে পেল। মুহূর্তে মানুষটিকে তার ভালো লেগে গেল।

 এখানে পুলিশ লাঠিয়াল বাহিনী চলে আসার আগে দুটো নতুন তথ্য দিই ভাই তোমাদের! বলে চলল সালাম।

আমাদের গার্মেন্টস চলতি সপ্তাহে আরো একবার হলুদ কার্ড পেতে যাচ্ছে। এ নিয়ে দ্বিতীয়বার। এরপর কী হবে জানো? তোমরা বোধয় জানো না, পর পর দুবার যদি কোনো প্রতিষ্ঠান হলুত কার্ড পায়, তো তাদের সঙ্গে বিদেশের বেচাকেনা চুক্তি বাতিল হয়ে যায়। বেচাকেনা বন্ধ হয়ে যায়।

তোমাদের হয়ত মনে আছে, গত মাসে শেষবার বিদেশিরা ক্রেতাদের একটা দল নিয়ে এখানে দ্বিতীয় দফায় দেখতে এসেছিল। এর আগে কেনাবেচার পুরনো চুক্তিটা নবায়ন করার আগে এসে দেখে বলে গিয়েছিল, এখানে কাজের পরিবেশ ভালো না। ভবনের অবস্থা ভালো না, যেখানে যা থাকার সেখানে তা নাই। যেখানে যা থাকার না, সেখানে তা আছে। ভালোটা নাই, খারাপটা আছে। যন্ত্রপাতি, বিদ্যুতের সংযোগ, এসব হয়ে গেছে পুরনো, যে কোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। আর হঠাৎ আগুন লাগলে নেভানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নাই। আগুন বা ভূমিকম্পে শ্রমিকদের জন্য দ্রুত নিরাপদে বের হয়ে যাওয়ার রাস্তা নাই। নতুন ভবনের নকশা বেতনাদিসহ আরো নানা বিষয়ে এখানে আন্তর্জাতিক শ্রম আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে; ওরা এসব বলে গেছে। ঠিকঠাক করতে বলেছে আমাদের মালিককে, তিনি কোনো গা করেন নাই।

ওদের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে কোনো গা তিনি করেন নাই ভাই, তিনি কোনো গা করেন নাই আমার বোনেরা। ফলে, দ্বিতীয় দফায় আরো একবার হলুদ কার্ড পাওয়ার পথ পরিষ্কার করা হয়েছে। ইচ্ছে করেই।

আমার অনুমান, কারখানা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হবে। মালিক অন্য পরিকল্পনা আঁটছেন। ঠিক করার দিকে যেহেতু তার নজর নেই, সুতরাং অনুমান করা যায়, তিনি অন্য কোনো পরিকল্পনা আঁটছেন। এই কারখানা নিয়ে তাঁর আর কোনো মাথাব্যথা নেই। তাহলে আমাদের কী উপায়?

হয়ত তিনি ব্যবসা গোটানোর পরিকল্পনা আঁটছেন। কিন্তু আমাদের পক্ষে কি চট জলদি আরেকটা কাজ জোগাড় সম্ভব? বকেয়া বেতনে কী হবে?

যাহোক, মালিক কারখানা সত্যিই বন্ধ করে দেবেন কিনা, আমি জানি না। আমি আমার অনুমানের কথা বলেছি। আমি আমার মনে হওয়ার কথাটা বললাম। যদিও এটা আমি এই মুহূর্তে প্রমাণ করতে পারব না। তবে, আমার প্রমাণের অপেক্ষায় কিছু বসে থাকবে না বন্ধু। সময় কথা বলবে আমার ভাইয়েরা। শিগগিরই একটা রদবদল ঘটবে। শিগগিরই বড় কিছু ঘটবে। কারখানা ক্রমশ বড় ধরনের খারাপ কিছুর দিকে খুব দ্রুত এগোচ্ছে আমার বোনেরা।

আমার কাছে জানতে চাইতে পারেন, দ্বিতীয় দফায় হলুদ কার্ড আসছে এই তথ্য আমি কোথা থেকে পেয়েছি।

এই তথ্য আমাকে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রমিক ফেডারেশনের বাংলাদেশ শাখার সমন্বয়কদের একজন। তাদের সঙ্গে আমি নিয়মিত যোগাযোগ রাখি।

যেহেতু ঘটনা এখনো ঘটেনি, আমার বন্ধুর নামটি আগাম বলতে চাই না। তবে এটুকু বলতে পারি, বিপদের বন্ধু হিসেবে তিনি আপনাদের মুখচেনা মানুষ। তাকে আপনারা নামে না চিনতে পারেন, মুখে নির্ঘাৎ চেনেন। তিনি আমার বন্ধু লোক, খুব ভালো লোক, আমাদের পক্ষের লোক। তিনি মনে করেন, মালিক জানালো না তাতে কী। কারখানার শ্রমিকদের এসব জানার অধিকার আছে। কিন্তু মালিকপক্ষের গোপনীয়তা নীতির বিরুদ্ধেও তার চটজলদি কিছু করার ক্ষমতা তার নেই। তাই এই সতর্কতা। আপনাদের সতর্ক করে দেওয়ার জন্য আজ ডাকা।

কিন্তু আমার বিশ্বাস, আমার দেওয়া এই তথ্য মিথ্যা হবে না।

বিদেশিদের যে দলটা এসেছিল, তারা কিন্তু সরাসরি ক্রেতা ছিল না। ক্রেতাদের পাঠানোর একটা দল ছিল বরং। তারা কিন্তু প্রত্যেকে একেকজন বিশেষজ্ঞ। বিশেষজ্ঞ মানে হলো, কোনো বিষয়ে যার আলাদা করে বেশি পড়া শোনা আছে, যিনি ওই বিষয়টা আলাদা রকম ভালো বোঝেন। ওই বিদেশি মানুষগুলো কারখানার বিষয়াদি নিয়ে পড়াশোনা গবেষণা করেন, তারা ভালো বোঝেন। বিদেশে বড় বড় শিল্পপতিরা এঁদের পরামর্শ শোনে।

এই বিশেষজ্ঞদেরও হাত করতে চাওয়া হয়েছিল। ঘুষ দিয়ে তাদেরকে দিয়ে মিথ্যা প্রতিবেদন তৈরি করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।

তবে ভাই, এটাও আমি প্রমাণ করতে পারব না। আপনারা হয়ত বলছেন, এই লোকের সমস্যা কী, যেটাই বলে, সঙ্গে এও বলে দেয়, এটা সে প্রমাণ করতে পারবে না। আরে, প্রমাণ করতে যা পারবে না তা শোনাও কেন!

শোনাই এ জন্যে যে, আমি চাই বিভিন্ন সম্ভাবনার কথা আপনারা এই সংকটের মুহূর্তে মাথায় রাখেন। এটা জরুরি। অপরদিকে, যে সূত্র থেকে আমি এটা শুনেছি, ওই সূত্রকে আমি বিশ্বাস করি। যা হোক, প্রমাণ করতে যা পারবো না, তা নিয়ে আর কথাও বাড়াবো না। কিন্তু বিষয়টা আপনাদের মাথায় রাখতে অনুরোধ করি।

বিদেশের ওই প্রতিনিধি দল স্থানীয় ট্রেড ইউনিয়নের অন্যতম কর্মী হিসেবে আমার সঙ্গে আলাপ করতে চেয়েছিল। আমি কিন্তু নিজের ভাষা ছাড়া আর কোনো ভাষায় কথা বলতে পারি না, এখনতক দরকারও হয় নাই। যখন আমাকে ডাকলো, আমি ভাবলাম, আমি আমার কথা তাদের কিভাবে বলব, তারাই বা তাদের কথা আমাকে কিভাবে বোঝাবে।

কিন্তু আমি যে পথে ভাবি নাই, দেখি সেই পথে সমাধান এসে বসে আছে। শ্রমিক ফেডারেশনের বাংলাদেশ শাখার কর্মী তো একজন দুজন নন, অনেক। তাঁদেরই একজন রূপোসনগরের সেই অতিথিশালায় ওই ঘরোয়া মিটিঙে আমার, মানে আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এলেন।

হ্যাঁ, তাঁর নাম বলা যায়। কুসুমকুমারী সাঁওতাল। তিনি জীবনে অনেক সংগ্রাম করেছেন। এবং সংগ্রাম যারা করছে, তাদের পাশে থেকেছেন। এ দিকে তিনি পুরনো পাপী!

সালামের মুখটা হাসি হাসি হয়ে উঠল।

যাহোক, তাঁর সঙ্গে প্রতিনিধি দলের বেশ ভালো বোঝাপড়া হয়েছিল। তিনি আমাদের দুই পক্ষের মধ্যে দাঁড়িয়ে কথা বললেন। আমি আমার দিক থেকে যা বলার সব বললাম। তারা কখনো হাসলো, কখনো কাঁদলো, কখনো আমাকে জড়িয়ে ধরল! কত কথা যে বলল! তার খুব কমই আমি কুসুমকুমারী আমাকে অনুবাদ করে দিতে পেরেছেন। কিন্তু আমি সব ভাবে বুঝে নিয়েছি।

একেকবার মনে হয়েছে, মায়াকান্না, আমাদের জন্য কাদের আর এতো দরদ থাকবে। কিন্তু পরে নিজেকে ছোট মনে হয়েছে। ওই বিশেষজ্ঞদের ভেতর নানা দেশের লোক ছিল। ভাইয়েরা, তাদের বাপ দাদারাও একদিন আমাদের মতো শ্রমিক ছিল। অত্যাচার করা হতো খুব তাদের ওপর। গুলি করা হতো, তারা আমাকে বলেছে। এসব কোন দেশে ছিল না ভাই?

ভাইয়েরা, বোনেরা শুনুন। ওদের পরিকল্পনা আঁটা আছে। আমাকে নাশকতার পরিকল্পনাকারী বলে ফাঁসিয়ে দেওয়া হবে, আমি জানতে পেরেছি। তাই আপনাদের বলে যেতে এসেছি, তাদের প্রতিবেদনের ভেতর সর্বনাশের ইঙ্গিত আছে। বড় ধরনের সর্বনাশের ইঙ্গিত আছে।

প্রতি তলায় যে জরুরি দরজাগুলো ইট তুলে বন্ধ করে দেওয়া, সেগুলো আমাদের ভেঙে ফেলতে হবে।

আটতলা দালানোর দোতলায় মাত্র চওড়া বেরোনোর জায়গা। এই কারখানাকে একটা মৃত্যুকূপ বলা যায়। কূপের যেমন একটা মুখ থাকে, এই কারখানারও তাই। এখন কূপের সেই মুখটাও যদি বন্ধ থাকে, তখন? নিরাপত্তার জন্য আরো বড় বড় সব হুমকি এই ভবনে আছে। ওসবের কথায় খোলাখুলি আসছি ভাইয়েরা। কারণ মনে হয় না আজকের পর আমি আর সময় পাবো, আর তোমরাও সময় করতে পারবে।

বিদ্যুতের তার এমন পুরনো মেয়াদোত্তীর্ণ আর জড়ানো এখানে, শর্ট সার্কিট হতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। পুরনো অভিযোগ। কারখানার যন্ত্রপাতি; মানে উৎপাদনযন্ত্র; চিরকাল আমাদের মতো শ্রমিকদের চেয়ে বেশি যতœ পেয়েছে মালিকের। যেন ওদের প্রাণ আছে, আমাদের প্রাণ নাই। সেই যন্ত্রপাতিরও বা কী হলো? পুরনো কথা। মালিকেরও বা হলোটা কী ভাইয়েরা বলুন?

বাজারে আমাদের কারখানার প্রতিযোগী তো কম না। দেখেন, যতো কাপড় আমার বানিয়েছি, তার সব কিন্তু বাজারে ছাড়া যায় নাই। একবার হলুদ কার্ড পাওয়ার ধাক্কা মালিক এখনো সামলে উঠতে পারে নাই। সুতরাং দ্বিতীয়বার পেলে কী হবে অনুমান করা যায়। যে ভয়ঙ্কর ঘটনা এরপর ঘটতে পারে, তার দিকে তাকিয়ে আমি ওই বিশেষজ্ঞ দলের বিরোধিতাও তো করতে পারি না।

খুব মনোযোগ দিয়ে শোনেন! শুনছেন তো? বাজারে প্রতিযোগিতা, হলুদ কার্ড, গুদামে কাপড়ের তুজ জমা পড়ে আছে, বাজারে ছাড়লে দাম যাবে পড়ে সুতরাং ছাড়া যাবে না; এর সঙ্গে মেলাও উৎপাদনযন্ত্র বিকল। আমাদের বেতন, বাড়তে থাকা ক্ষতি। তাহলে? কী হতে চলেছে ভাইসব? অনুমান করতে পারেন? সব কিছু আমার ওপর ছেড়ে দিলে হবে না তো, অনুমান করেন, বলেন। নিজেরা নিজেরা আলাপ করেন না?

কথা বলতে বলতে সালামের নিচের ঠোঁটে থুতুর একটা সাদা বিন্দু অনেকক্ষণ হলো জমে আছে। ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে দাঁড়ানো সমীরের চোখ বারবার ওই বিন্দুটার দিকে চলে যাচ্ছিল।  হয়ত ভাবছিল, একবার কাছে গিয়ে মুছে দিয়ে এলে হয়। এই সাদা বিন্দু খেয়াল করতে গিয়ে বিন্দু মিলের নেতার কটা কথা কান ফসকে গেল, শোনা গেল না।

যখন আবার মনোযোগ কথায় ফিরে এলো, তখন সালাম অভিনয় করে বুকে হাত দিয়ে বলছে, আমাদের মালিকের অবস্থা তখন বুকে হাত দিয়ে কাৎ! তার অভিনয় দেখে ঘিরে দাঁড়ানো জনতা হেসে উঠল। যারা কয়েক স্তর পরে আছে তারা দেখতে না পেয়ে কোনো একটা আমোদ অনুমান করে কাঁধ দোলালো কেবল।

সালাম বলে গেল, যেহেতু নিজের লাভ ছাড়া আর কিছুর ওপর তার দরদ নাই, সারা পৃথিবী জুড়ে এমন মালিকদের এই এক জায়গায় ভারি মিল, সুতরাং কাজটাও সে করবে অন্যদের মতো, আমি অনুমান করি। ওই কমিটিকে যেহেতু হাত করতে পারে নাই, সুতরাং এই কারখানার ভবিষ্যৎটা নিয়ে তার অন্যরকম কোনো পরিকল্পনা সে বাস্তবায়ন করবে।

নতুন পরিকল্পনার জন্য তার চাই নতুন করে অনেক কাঁচা টাকা! তোমরা যদি মনে করো, এই কাঁচা টাকা তোমাদের পরিশ্রমের লাভ থকে উদ্ধার করতে চায়, তাহলে বলব তোমরা অর্ধেক জানো। বাকি অর্ধেক জানো না!

এসময় ভিড়টার বাইরের দিকে চাঞ্চল্য দেখা গেল। দূরের রাস্তার মোড়ের কাছে পরপর দুটো বিশাল ভ্যানগাড়ি এসে থেমে থরথরিয়ে কাঁপতে থাকল। প্রথমটির প্রথম চাকা যে কোনো মুহূর্তে ফেঁসে যেতে পারে, এমনভাবে চিরে আছে টায়ার। গাড়ির ধূসর ছাউনি আর নীল দেহ দেখে চিনে নিতে অসুবিধা হয় না কাদের বহন করে এনেছে এ দুটো। মাথায় শিরস্ত্রাণ, বুকে বুলেটরোধী বর্ম, হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত শক্ত পা সুরক্ষী, এসব আত্মরক্ষী উপাচারে নিজেদের ঢেকে হাতে লাঠি নিয়ে লাফিয়ে গাড়ি থেকে নেমে প্রথমে পাশাপাশি সার বেঁধে দাঁড়িয়ে একটা মানবদেয়াল তৈরি করল পুলিশ। এরপর গটগটিয়ে হেঁটে আসতে থাকল দ্রুত। দেখে ভিড়ের বাইরের চাঞ্চল্য ভেতরেও পড়ল ঢুকে। এদিকে সালাম বলেই চলল কথা, পুলিশের ওই দলটার দিকে তাকালো না একটিবারও। একবার আগুয়ান দলটার দিকে, আরবার সালামের দিকে তাকাতে থাকল সমীর। ঠিক করে উঠতে পারল না, সরে পড়বে নাকি কথা শুনে যাবে আর দেখবে শেষতক কী হয়।

দেখতে দেখতে চলে এলো পুলিশ। কজন অবস্থান নিলো, আর বাকিরা এগিয়ে ছড়িয়ে পড়ল। ক সেকেন্ড পর দেখা গেল পুলিশরা বলতে গেলে জটলাটিকে লক্ষ করে একটা পরিধি রচনা করে ফেলেছে। এবার তার বেড় ক্রমে ছোট হতে থাকবে। এতোক্ষণের আগ্রহী জনতার কপালে ঘাম, ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল ওদের সিংহভাগ। সমীর দেখতে থাকল মানুষের মুক্তকচ্ছ ছুটোছুটি। মনে হলো, পুলিশও বুঝি চায় বেশিরভাগই সটকে পড়ে জটটাকে হালকা করে দিক। কারণ তাতে জল ঘোলা হবে কম, আর চাঁইটাও হবে তুলনামূলক বেশি অরক্ষিত। দলনের জন্যে ক্রমে বৃত্ত ছোট করতে থাকা পুলিশ সদস্যদের চোখ দেখার উপায় নেই। কারও শিরোস্ত্রাণের মুখঢাকা কাচে অন্ধকার আটকে গেছে; সূর্যের দিকে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে যারা। আর যারা তাদের বিপরীত দিকে, তাদের ওই মুখঢাকা কাচে বিকালের সোনালী আলোর ঝিলিক। সুতরাং কারও চোখ দেখার, চোখের ভাষা পড়ার কোনো সুযোগ খোলা নেই। চোখের ভাষার প্রকাশটুকু ধরা না গেলেও পলায়নপর কেউ কেউ শুনতে পেল কথোপকথনের ছিন্নাংশ কিছু।

একজন বলল, কিরে মজদুর, এক হলি কই। বলে না ওরা? ওই যে, দুনিয়ার মজদুর এক হও, এক হও।

অপরজন বলল, না না, এরা ওরা না। ওগুলোকে চিনি না?

কাচের আড়ালে নাকচ করা হাসি হেসে আরেকজন বলল, ভাই, আপনি চেনেন না তাহলে। এরা ওরা না, আবার এরাই ওরা।

তাদের সবার কথার প্রসঙ্গকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিতে চায়, এমন সরোষ জেদি কণ্ঠে একজন সবার দৃষ্টি একদিকে নিবদ্ধ করতে চাইলো আঙুল তুলে, ওই যে শালা, নাটের গুরু!

সবাই সালামের দিকে তাকালেও একজন তাকালো ওই পুলিশ সদস্যটির দিকে। চোখে তার শীতল ভর্ৎসনা। ওটুকু চোখে না পড়লেও অপেক্ষাকৃত ঊর্ধ্বতনের এই ঘুরে দাঁড়ানোটুকু ওই পুলিশ সদস্যের দৃষ্টি এড়াল না। আরো কিছু বলতে গিয়ে থমথমে মুখ করে লোকটা নিজেকে সামলে নিলো।

যারা তখনই দলবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল আর সমানুপাতে চোখের ভাষা শরীরের ভাষা গেল বদলে; পুলিশ তাদের পথ ছেড়ে দিলো, যা ভাগ! একেকবার আঘাত করার ভঙ্গি করে লাঠি উঁচু করতেই লোকগুলো দুহাত এগিয়ে দিয়ে কখনো মাথা, কখনো পা বাঁচাতে মরিয়া হয়ে, ভীত চোখে পথকুকুরের মতো স্বরে ক্ষমা ভিক্ষা করতে করতে একে অপরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে সামলে নিয়ে, পালালো যত দ্রুত সম্ভব। মেয়েদের দিকে পুলিশের কজন এগোতে গিয়ে এগোলো না। কেউ খোলা চুলে ঊর্ধ্বশ্বাসে, কেউ দাঁতে আঁচল কামড়ে, কেউ কারও হাত ধরে, কেউ হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে; যে যেভাবে পারল দ্রুত সরে পড়তে থাকল। বিচ্ছিন্ন বিশ্লিষ্ট মানুষগুলো পুলিশের তৈরি করা বলয় পেরিয়ে দৌড়ে চলে যেতে থাকল আরো দূরে, মন মানলো না, তখন আরো খানিকটা দূরে। এরপর হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে জ¦লজ¦লে সন্ত্রস্ত চোখে তাকিয়ে দেখতে থাকল ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা রণক্ষেত্রটাকে। বীরত্ব, সংকট, দুঃখ বর্ণনার প্রসঙ্গটিকে ক্রমে তৈরি হতে দেখে ওদের মনের ভেতর হয়ত এক ধরনের আনন্দ ঘন হয়ে উঠল ক্রমে। দেখা গেল, বিচ্ছিন্ন বিশ্লিষ্ট না থেকে ওরা ক্রমে পরস্পরের কাছে ঘেঁষে এসে দাঁড়িয়েছে, এবং নিতে শুরু করেছে একে অপরের শরীরের, চিন্তার উত্তাপ।

ওদিকে নারী পুরুষের একটা ছোট অংশ জটলার ভেতরেও থাকল না, বাইরেও চলে গেল না। তাদের কারও দৃষ্টিতে ভীতি আর বিভ্রান্তির মধ্যবর্তী কোনো অনুভব খেলা করছে। তারা ক্রমে ছোট হয়ে আসা বলয়ের দিকে বারবার তাকাচ্ছে, ফিরে ফিরে দেখতে সালামদের। কিন্তু নিজেদের দূরেও রেখেছে বিপৎমুক্তও রাখেনি। তবে কারও কারও চোখে শীতল নিস্পৃহ ভাব। ওদের চোখ বলছে, আমরা তো নিজের ইচ্ছায় আসিনি, আবার স্বেচ্ছায় যেতেও চাই না এভাবে, এই সময়ে।

ছোট একটা অংশ তখনো সালামকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। সালাম পুলিশের উপস্থিতিতে কথা চালিয়ে যাওয়া আর সমীচিন মনে করে নি বলে চুপ করে গেছে। এরপরও তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো এমন মুখ করে অপেক্ষা করে আছে যেন এখনই ফের বলতে শুরু করবে তাদের নেতা। তাদের ঘিরে কী ঘটছে, ঘটতে চলেছে এ বিষয়ে যেন কোনো ধারণা তারা নিতে চায় না, কোনো কথা তারা শুনতে চায় না। সালাম এই মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে একবার ম্লান হাসলো। তার ভেতর কিছু নড়ে গিয়ে থাকবে। চোখ দুটো ভিজে উঠল কোনো প্ররোচনা ছাড়াই। আর ঠিক এরপর সে বলতে শুরু করল আবার।

আমি সরাসরি বলব না ভাইয়েরা, তোমরা বুঝে নাও। তোমরা যারা শেষতক এখানে আছো, আমি জানি, বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা তোমাদের আছে।

তোমাদেরকে বলছিলাম, লাভের টাকা দিয়ে কিন্তু মালিক ওসব করবে না। টাকা বের করার অন্য পন্থা আছে। সত্য কথা বলতে গেলে, সত্য দাবি তুলতে গেলে, ক্ষেপে গিয়ে যারা সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীকে কিনে নিয়ে এরপর লেলিয়ে দেয়, ভাইয়েরা, আবার বলি, সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীকে উপযুক্ত মূল্যে কিনে নিয়ে লেলিয়ে দিতে পারে, তাদের মন বুঝতে শেখো, তাদের মন পড়তে হবে। এবারে বুঝতে হবে আগের দিনের মতো ভয় দেখাতে তারা এটা করে নাই। কেন করেছে? একটাই কারণ, তারা মরিয়া হয়ে গেছে। আর মরিয়া মানুষ যা তা করতে পারে। আর যেহেতু ওদের মনে কোনো দরদের স্থান নাই, টাকা বের করতে ওরা কী করবে? কারখানায় আগুন জ্বালাবে! ওরা তোমাদের পুড়িয়ে মারতে চাইবে! এটা কৌশল। দুর্ঘটনার নামে এমন অনেক কৌশল আমি সালাম দেখেছি!

তবে শেষ পর্যন্ত এটা আমাকে বলতেই হচ্ছে,  আমার এই কথাটাও আমি প্রমাণ করতে পারব না। একাত্তর সালের কথা, ইয়াহিয়া খান যেমন মানুষ চায় নাই, মাটি চেয়েছে; এরাও তেমন। মানুষ চায় না, এরা কেবল টাকা চায়। যদ্দিন মানুষ টাকা আনে, তদ্দিন তার কদর। এবং আমার প্রচণ্ড সন্দেহ হয়;

সালামের কথা যখন এ পর্যন্ত এসে থামল, ঠিক সেই মুহূর্তে পুলিশ তাদের বিরাট ও বিকট ওয়াকিটকিতে শেষ নির্দেশটা পেয়েছে। ঘেরাওয়ের পরিধি আরো ছোট হয়ে এলো। সেই শুরুর সময়ের মতো সালাম এবারও গেছে থেমে। ঘাড়ের ওপর পুলিশের নিঃশ্বাস পেয়ে লোকেরাও এবার নড়েচড়ে দাঁড়ালো; লাগামে হাত পড়লে কোরবানির শান্ত পশু যেমন হঠাৎ ছটফটিয়ে ওঠে। বলির পশুর মতোই তাদের চোখের কোণ লাল, ক্ষোভ আর ক্রোধের অক্ষমতাটুকু অবচেতন মন ততক্ষণে বুঝে নিয়েছে। এদিকে সচেতনে আত্মসমর্পণও করার নয়। তাই এক পুলিশের দিকে, তাদের চোখে না তাকিয়ে তারা দ্রুত একে অপরের দিকে দৃষ্টি বদল করতে থাকল। বুঝি যে কারও চোখ থেকে বেরিয়ে আসবে কোনো সমাধান। কিন্তু শেষতক কোনো সমাধান বেরিয়ে এলো না। মানুষের ওপর ভরসা হারিয়ে একজন যেই না অস্তায়মান সূর্যটার দিকে তাকিয়েছে, অমনি পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ল নিরস্ত্র, অপ্রস্তুত দলটার ওপর।

পুলিশের মোটা লাঠির সবল সপাট বাড়ি এসে পড়ল সমীরের বাম হাঁটুর পাশে, একেবারে গিঁট বরাবর। পরমুহূর্তে ব্যথাটা যেন মাথায় এসে ঘা মারল, আর ওই ঘা খেয়ে ঘুরে উঠল গোটা পৃথিবী। এবার সে সরে পড়তে চাইলেও কোনো লাভ হলো না। তার বাঁ পা কথা শুনলো না তার। টাল হারিয়ে কাত হয়ে রাস্তায় পড়ে গেল সমীর। তাকে মাড়িয়ে ছাড়িয়ে পুলিশ কি অচেনা শ্রমিকের দল দিগ্বিদিক হুটোপুটিতে লেগে গেল। মুখ তুলে দেখল সমীর, পুলিশ অনেক পেছন থেকে বাতাস কেটে এনে কোমর থেকে নিচে সব গিঁট বরাবর সবেগে লাঠি চালাচ্ছে। মুখ ঢাকা শিরোস্ত্রাণের কারণে তাদের মুখের ভাব দেখা কোনো উপায় নেই। তবে পেশির চালনা দেখে মনে হয় যেন, কয়েক জনমের জিঘাংসাকে বুঝি ওরা এক করে তবেই এই শ্রমিক বিরুদ্ধে চড়াও হয়েছে। যেন শ্রমিকদের প্রত্যেকে একেকজন পুলিশের সন্তানের নৃশংস হত্যাকারী, স্বপ্নদৃশ্যে সর্বশক্তিতে লাঠি চালিয়েও যাদের মনমতো আঘাত করা যায় না; অথবা যেন মানুষই নয় কোনো পক্ষের কেউ। মানুষের হাড়ের ওপর লাঠি পড়ার এমন বিশ্রী মড়াৎ মড়, গাঁট গাঁট শব্দ এর আগে কখনো সমীর শোনেনি। আর চারপাশের চিৎকারে কানে তালা। দু হাতে শরীরের বাকিটা টেনে সমীর ওই জট থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলো। আর থেকে থেকে পেছনে তাকিয়ে দেখতে থাকল, যারা পড়ে গেছে তাদের অবস্থা, যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের চেয়ে কম শোচনীয় নয়। নিজ তুলনামূলক সৌভাগ্যের কথা মনে আসতেই আরেকবার শরীরের সমস্ত উদ্যম জড়ো করে বুকে হাঁটতে শুরু করল সমীর। পরমুহূর্তে আবার কী মনে হতে ভয় বিস্ফারিত চোখে তাকাল জটলার দিকে। এবার দেখল, বেশিরভাগই মাটিতে পড়ে গেছে। সালামকে ঘিরে দাঁড়ানো ছোট একটা দল মার খাচ্ছে বেদম। প্রবল শোরগোল ওখানে। ক্রমে অর্ধনগ্ন, রক্তাক্ত হয়ে উঠছে বুক পিঠ পেতে দেওয়া কৃশকায় বাদামি, কালো শরীরগুলো। সমীর আবারো সামনের দিকে ঘোরালো মুখ। হাতের নিচে ছোট ছোট কাঁকর ফুঁড়ছে, ডান হাঁটু মাটিতে ছুঁইয়ে বাঁ হাঁটুটিকে যথাসম্ভব রাস্তার ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে নিয়ে চলার চেষ্টা চলছে। কাঁকরের আঁচড় পড়ছে সাধের চামড়ার জুতোর ওপর। শরীরটা লাগছে দুর্বহ, এ অবস্থায় প্রবল হুড়োহুড়ির ভেতর কেউ তার হাতের পাতা মাড়িয়ে দিচ্ছে, কেউ তাকে ডিঙিয়ে চলেছে লাফিয়ে। হঠাৎ কে একজন তার গায়ের ওপর হুড়মুড়িয়ে পড়ে গেল। মনে হলো মেরুদণ্ডের হাড় বুঝি সরে গেছে। সামলে নিয়ে লোকটা ফিরে তাকাল সমীরের দিকে। এই চোখ সমীর কোথায় দেখেছে? হঠাৎ পড়ল মনে। এই লোকটা চায়ের দোকানে সরোজকে খুঁজতে এসেছিল। দেখামাত্র সমীরকে সে চিনতে পারল। সঙ্গে সঙ্গে এতো বিপদেও মুখে ফুটে উঠল হাসি।

ছোট ভাই, নয়া ঘুঘু; বকের ভিড়ে সারস। তুমিও। ইস!

হঠাৎ তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। ঝটিতে উঠে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে সমীরের একটা হাত নিজ ঘাড়ের ওপর চালান করে দিয়ে কৌশলে আহত ছেলেটিকে দাঁড় করিয়ে দিলো। এরপর পা চালালো দ্রুত। ব্যথা সইতে নিচের ঠোঁট ওপরের পাটির দাঁতে কামড়ে ধরল সমীর, নরম মাংস কেটে নোনা রক্ত বেরিয়ে এলো। ব্যথার প্রথম ঢেউটা এভাবে সামলালেও দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময়ে আর পারল না। গলা ভেঙে চিৎকার! তাকে তুলে নেওয়া লোকটা কানের কাছে মুখ এনে বহু কিছু বলে যেতে লাগল একটানা। ওসবের ভেতর থেকে বোঝা গেল কেবল এটুকু, লক্ষ্মী ভাই! সোনা ভাই!

সমীর আরো একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, ছোট ওই দলটার ওপর এবার সব পুলিশ তাদের সবটুকু দগ ঢেলে দিয়েছে। না, সব পুলিশ নয়; কেউ কেউ কার লাঠিতে ভর ঠেকিয়ে শরীর এলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দিব্যি, বিকারহীন। যেন বিশ্রাম করছে।

সন্ধ্যা এই নামলো বলে। এমন সময়ে প্রতিদিনের মতোই স্বয়ংক্রীয়ভাবে সড়কবাতিগুলো একে একে জ¦লে উঠল। এবার আর কল্পনায় অদেখাটুকু ভরাটের প্রয়োজন হলো না। দিব্যি স্পষ্ট দেখা গেল সব, কী হয়ে চলেছে ছোট্ট এটুকু জায়গার ভেতর। দেখা গেল, প্রায় দশটির মতো নিথর দেহ রাস্তায় দলির এঁটোর মতো পড়ে আছে। সমীর কাতর কণ্ঠে পাশের লোকটিকে জিজ্ঞেস করে উঠল, সালাম ভাই শেষে কী বলল ভাই?

থামো তো ছোটভাই! লোকটার কপট ধমক। তোমাকে নিয়ে পারি না। তোমার দাঁড়ানোর কোনো দরকার ছিল? বলো ছিল? তুমি বিনা কারণে মার খেলে মিঞা। এরচেয়ে আমার মাথা ফাটলে ভালো ছিল। আহারে! কেন আসলা আজকেই? বোঝাও আমাকে। আর আসলেও থাকতে হবে কেন? বলো? চলে যেতে পারলে না?

লোকটার কণ্ঠে দরিয়ানগরী টান। ঠিক এই টানের বাংলা সমীরের বুঝতে কষ্ট হয়। তাই অনেক কথাই শুনলেও সে ঠিক যোগ ঘটাতে পারল না। তাছাড়া অতো মার কাট আর চিৎকারের ভেতর বোঝাও কঠিন। তবু ভর্ৎসনা আর চাপা দরদের সুরটুকু সমীর ধরতে পারল। ওটুকু পেরে সমায়িকভাবে হলেও শান্ত হলো তার মন। ওদিকে লোকটার ঝিকিয়ে ওঠা ভেজা চোখজোড়া এতো কষ্টেও দিব্যি হাসছে তখন। ওই হাসিতে প্রশ্রয় পেয়ে সমীরের মুখেও উদ্বেগচাপা হাসি ফুটে উঠল। বলল, আমি সালাম ভাইয়ের সামনে ঢালও হতে পারতাম। তাকে খুব ভালো লেগেছে আমার। আচ্ছা, তাকে মেরে ফেলবে না তো ভাই?

দুজন এগোচ্ছিল সামনের দিকে। পুলিশের দলটার সিংহভাগ ওই ছোট দলটার কাছে। বাকিরা পূর্ব পরিকল্পনামাফিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। চোখ রাখছে, কেউ যেন ঢুকতে না পারে নতুন করে। তবে বেরোতে বাধা নেই। দেখতে দেখতে টং দোকানের কাছে চলে এলো সমীর আর লোকটা। ছাউনির নিচে তখন অন্ধকার। সেখানে সমীরকে বসিয়ে দিয়ে পূর্বদিকে তাকালো লোকটা। যারা পালিয়ে গিয়েছিল, তারা তখনো দূরে দাঁড়িয়ে তাদের দেখছে। বহুদূরে দৃশ্যমান তাদের রঙরঙিন কাপড়ের নড়াচড়া। বিচিত্র আলোআঁধারি তাদের চারপাশ ঘিরে। বাতাসে রাস্তা পেরোচ্ছে বেওয়ারিশ ছেঁড়া পলিথিন, দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে রাখা টুকরো কাপড়ের স্তূপ থেকে বিচ্ছিন্ন নীল একটা কাপড়ের পাতলা টুকরো। কাপড়টিকে দেখে টঙ দোকানের ভ্যানগাড়ির নিচের ভাঁড়ারের ভেজানো দরজা সরিয়ে লাফিয়ে রাস্তায় নামলো একটা রোঁয়া ওঠা সাদা বেড়াল। তুলে দিলো লেজটা। কাপড়ের দিকে এগিয়ে একবার নখ বাগিয়ে ঝাঁপিয়ে এরপর বোকা বনে সরে এলো। পশ্চিমে পুলিশের ওই মারকুটে জটের দিকে তাকিয়ে কড়া জান্তব শব্দ করল একবার। এরপর রাস্তার অপর পারে কিসের আড়ে হারিয়ে গেল। পশ্চিমে তাকিয়ে লোকটা দেখল, দূরে পুলিশের গাড়ি দুটো বেকার দাঁড়িয়ে। নাকতোলা ঘাসভোজী দুটো বিকট প্রাণি যেন বসে আছে রাস্তার ওপর, পরপর।

লোকটা ফিরে এসে বলল, না না, সালাম ভাইকে মারবে না। তাকে ওদের দরকার। তাকে দিয়ে কথা স্বীকার করাতে হবে না? আর তাছাড়া মেরে ফেললে ঝামেলা হবে। অন্য সময় হলো হতো না, কিন্তু এখন হবে। দেশেও ঝামেলা, বিদেশেও ঝামেলা। মারবে না। ছোটভাই, এখানে একটু বিশ্রাম করি আমরা, কেমন? তবে তাকে খুব খারাপ ভাবে জখম করে, বুঝলে, পঙ্গু করে দিতে পারে। আচ্ছা থামো, তুমি আর কথা বলো না মিঞা। আমার কাজ বাড়িয়েছ। তোমাকে তো ডাক্তারের কাছে নিতে হবে মনে হয়। থাকো কোথায়, কে আছে তোমার?

আপনার কোনো ঝামেলা নাই আর, ভাই। সমীরের কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা। আপনি অনেক করেছেন। চলে যেতেন তো, আমার জন্যেই তো ঠেকে গেলেন। এবার যান। আমি এখানে আর কিছুক্ষণ থাকি। এরপর আরেকটু এগিয়ে রিকশা নিয়ে চলে যেতে পারব। তবে একটা শেষ উপকার যদি করেন। একটা নাম্বার দিচ্ছি, এ নম্বরে ফোন করে শুধু দ্রুত বাসায় চলে আসতে বলে দিন, যদি তার পক্ষে সম্ভব হয়। আমার বড় ভাই তিনি। আমার ফোন নাই।

এই তো ফেললে আসল সমস্যায়। আমার মোবাইলে টাকা আছে কিনা তো; কী নাম তোমার ভাইয়ের? দেখি তো চিনি কিনা? লোকটা কথার ফাঁকে মুঠোফোনটা তার মুখের সামনে তুলে ধরল। ফোনের উজ্জ্বল পর্দার আলোয় তার মুখটা আলোকিত হয়ে উঠেছে। লোকটার সারা মুখে স্বচ্ছ চামড়ার মতো সেঁটে আছে ঘাম। সেই ঘর্মাক্ত মুখের ওপর ঘটছে আলোর রঙ বদল।

তারেক। আমার ভাইয়ের নাম তারেক। বলল সমীর। শক্তিমতির প্রকৌশলী।

তারেক, তারেক; লোকটা আওড়ালো নামটা কবার। এরপর ঠোঁট বাঁকি মাথাটা এপাশ ওপাশ দুলিয়ে বলল, উঁহু, প্রকৌশলী কোনো তারেককে চিনি না। এরপর হতাশ মুখে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে বলল, আচ্ছা আমি ফোন দিয়ে জানাচ্ছি, তুমি এটা নিয়ে চিন্তা কোরো না। এবার ওঠো। অনেক বিশ্রাম হয়েছে।

লোকটা আগের মতো ভঙ্গিতে সমীরের হাত নিজ ঘাড়ের ওপর তুলে ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে থাকল। ব্যথায় আড়ষ্ট সমীরের ভেজা দাঁতের পাটি ঝিকিয়ে উঠল বাইরের আলোয়। আর একটু খানি ধীরে যেতে পারেন ভাই? আর একটুখানি ধীরে? বলতে গিয়ে স্বর ভেঙে এলো। গতি তাতে কমলো খানিকটা। আগের চেয়ে ধীর গতিতে তারা এগোতে থাকল দূরের দর্শক জনতার দিকে।

সকালের সুদৃশ্য পোশাক বিকেলে ঘামে, মাটিতে কাদা। আলোর নিচে আসায় চোখে পড়ল, লোকটির শার্টের ওপরের দুটো বোতাম ছোঁড়া। বোতাম গলানোর জায়গাও ফেঁসে গেছে। কপালে, চুলের গোড়ায় একটা জায়গা ফুলে কালো হয়ে উঠেছে। চোখ জোড়া সামনের দিকে। সমীর তাকে দেখছে বুঝতে পেরেও তাকালো না। তাকে দেখে নিয়ে সমীর ঘাড় ঘুরিয়ে আরো একবার পেছনে তাকালো। তার দেখাদেখি এবার লোকটাও। হঠাৎ করেই ঘটল ব্যাপারটা। সমীরের মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। দুই ভুরুর মধ্যখানে হাজার ভোল্টের বিভব সইতে না পেয়ে হঠাৎ বর্তনী ছিন্ন হওয়ায় চোখ দুটো ঝিমিয়ে ক্রমে অন্ধ হয়ে উঠল, পা পড়ল বেসামাল। বুক থেকে স্বরতন্ত্রী ধরে উঠে এলো বিকট এক ক্রোধ। সরোষকণ্ঠে চিৎকার করে উঠল সমীর, হাঁই!

সালামসহ ছোট দলটার ওপর লাঠির আঘাতবৃষ্টি কি ক্রমে হালকা হয়ে আসে নি? আঘাতে জর্জরিত শ্রমিকরা শোয়া কিংবা আধশোয়া হয়ে তখনও মাথা ঢেকে রাখার ভঙ্গিতে হাত তুলে রেখেছে। তাদের হাতের সাদা পাতা আলোয় উজ্জ্বল। দেখা গেল, গাড়ি থেকে কিছু পাকানো দড়ি নিয়ে আসা হয়েছে। শীতল চোখের তুলনামূলক বয়স্ক সেই পুলিশ সদস্যকে দেখা গেল কাছেই দাঁড়িয়ে নির্দেশনা দিয়ে চলেছে। থেকে থেকেই করছে স্থানবদল। মাঝে মাঝে আহত মুখগুলোর কাছে গিয়ে চিনতে চেষ্টা করছে। এরপর তার আঙুলের নির্দেশ মেনে দড়ি পরানো হচ্ছে আহতদের। ঝটিতে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে হাত, বেঁধে নেওয়া হচ্ছে কোমর। বিদ্বেষপরায়ণ সেই কমবয়েসী পুলিশটি বেশি ত্বরিৎকর্মা।

সমীর আর ত্রাণকর্তা তখন দুই সড়কবাতির মধ্যবর্তী আলোকসীমানা অতিক্রম করছিল। হঠাৎ কোথা থেকে অমন পাহাড়চেরা হুঙ্কার এলো দেখতে পুলিশের জটটা এদিকে ওদিক তাকালো একবার। অপর পারের দর্শকরাও হয়ে উঠল সন্ত্রস্ত ভীষণ। সেই মুহূর্তে সমীর আর লোকটা দুজনেই মুখ ফিরিয়ে নিলো আবার। সাহস আর শক্তির রহস্যময় আচানক পুঞ্জীভবন আতসবাজির মতো ক্ষণিকের আলো ছড়িয়ে হাওয়ায় বাতাস আয়োনিত করে সেখানেই নিঃশেষিত হলো। এরপর বুকের হাতুড়ি সজোরে ঘা মারতে থাকল পর্শুকার খাঁচায়। সামনের দিকে তাকিয়ে পেছনে সমীরের কান হয়ে উঠল সজাগ। কোনো পুলিশ পেছন থেকে চুলের মুঠি ধরতে ছুটে আসছে নাতো? তার এই মনোভাব ধরা পড়ে গেল কিনা, তা পরখ করার জন্য তাকালো ত্রাণকর্তা লোকটার দিকে। না, ধরা সে পড়েনি। লোকটা মাথা নিচু করে সামনের দিকে চলেছে, যেন কিছু অনুভব করছে। এবং তার অনুভবে যা এসেছে, তা ভালো কিছু নয়।

সমীর বলল, আপনার নামটা জানা হলো না ভাই। এতো উপকার করলেন!

লোকটা মুখ তুলে মৃদু হেসে বলল, জাকারিয়া। জাকারিয়া আমার নাম। তবে জাকারিয়া এখানে আরো একজন আছে। আমাকে ঈসার বাপ বললে চিনবে সবাই।

চলবে…

কারখানার বাঁশি: পর্ব-১৮॥ হামিম কামাল

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন