অন্যকথা ॥ কাজী মহম্মদ আশরাফ | চিন্তাসূত্র
৫ কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২০ অক্টোবর, ২০১৮ | দুপুর ১২:২৮

অন্যকথা ॥ কাজী মহম্মদ আশরাফ

দৃশ্য-১
ভোর। আকাশের এক দিকে মেঘ। সূর্য উঠবে বাংলার দিগন্তে। দূরে মসজিদে ফজরের আজানধ্বনি।

দৃশ্য-২
বাথানের দরজা খুলে দিচ্ছে এক তরুণী। তার বয়স পেরিয়ে গেছে, বিয়ে হয়নি। গরু-বাছুর একে একে বেরিয়ে যাচ্ছে। সব শেষে বেরিয়েছে গাভীটা। বাছুরটা তার সামনে। গাভীর গলা জড়িয়ে ধরে আদর করে দেয় তরুণী।

তরুণী: দুর্গা, বোন আমার, যা মাঠে যা। আমি বালতি নিয়ে গোবর কুড়াতে আসছি একটু পরে।
দুর্গা গলার ঘণ্টা দুলিয়ে হেলেদুলে মাঠের দিকে চলে যায়। 

দৃশ্য- ৩
সুর্য উঠেছে। পূর্ণাঙ্গ লাল সূর্য।
একটা মোরগের কঁক ক কঁক শোনা যায় দু’বার। তিন বার।
হঠাৎ থেমে গেল নেপথ্যের মোরগের ডাক।

দৃশ্য-৪
সবুজ ঘাসে বড় বড় ফোঁটা রক্ত। পালকও ফড় পড়ে আছে। অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়।
পুব আকাশে সোনালি রোদ

দৃশ্য-৫
সূর্য অনেকখানি উঠেছে। কড়া রোদ।
মাঠে গরু-বাছুর ঘাস ছিঁড়ে খাচ্ছে। দুর্গাকে দেখা যায় তার বাছুরের গুঁতা সহ্য করছে।
মাঠে ঘাস পাতলা। বালু ওড়ে বাতাসে।

দৃশ্য-৬
কড়ই গাছের পাতলা ছায়ায় বসে আছে তরুণী। পাশে লোহার বালতিতে কাঁচা গোবর। তরুণী হাঁপাচ্ছে। ঘামে ভেজা মুখ।  চুল লেপ্টে আছে গালে ও কপালে। তার দৃষ্টি গরু-বাছুরের দিকে। হঠাৎ এক দিকে তার চোখ যায়। চোখ বড় হয়ে যায়। সে দৌড় দেয় সেদিকে।
তরুণী: হায় ভগবান!

দৃশ্য- ৭
বড় শিংওয়ালা একটা ষাঁড় কোথাও থেকে এসে গুঁতাচ্ছে সদ্য শিংগজানো এঁড়ে বাছুরটাকে। বাছুরটা রক্তাক্ত অবস্থায় শুয়ে পড়েছে। তরুণী লাঠি হাতে ষাঁড়টিকে মাঠের অনেক দূরে তাড়িয়ে নিয়ে যায়।

দৃশ্য-৮
তরুণী আহত বাছুরটির পাশে বসে আহাজারি করছে।

তরুণী: ভগবান, তুমি এ কী করলে! আমার কৃষ্ণ বাঁচবে তো! ও কৃষ্ণ চোখ মেল বাপ! পানি খাবি?
বাছুরটির বেরিয়ে পড়া জিভ দেখে তরুণীর চোখ পানিতে ভরে যায়। কৃষ্ণের গায়ের ওপর ওপুড় হয়ে পড়ে। তরুণী: ও কৃষ্ণ, কৃষ্ণ রে, চোখ মেল বাপ। ভগবান তুমি আমার কৃষ্ণরে এ কী করলে? ওই গ্রামের লালু কখন এলো আগে কেন চোখে পড়লো না! আগে কেন দেখলাম না!

দৃশ্য-৯
রাত। কুপি জ্বলছে। গোয়ালঘরে কৃষ্ণের যত্ন করছে তরুণী। ক্ষতগুলোতে হলুদবাটা গরম করে আলগোছে লাগাচ্ছে।  কৃষ্ণ চোখ মেলেছে।  তরুণীর মুখে হাসি।

দৃশ্য-১০
সকাল। গোয়ালঘর। একটা গাভী বাচ্চা দিয়েছে। বাছুরটা সরু পায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে কোনোভাবে। কাঁপছে। গাভীটা শুয়ে আছে। ক্লান্তি ও বেদনায় তার মুখটা পেটের কাছে গুঁজে রাখা। গোবর লেপ্টে আছে শরীরের নিম্নাংশে।
তরুণীর প্রবেশ।

তরুণী:  হায় এ কী করছিস দিদি!
তরুণী গাভীর ঘাড়ে ও গলায় হাত বুলিয়ে দেয়। গাভী চোখ বুজে থাকে। নীরব ও নির্লিপ্ত। বাছুরটা দুধের জন্য মাথা গুঁজে দেয় মায়ের পেটের নিচে। মা গাভী একবার চেয়ে দেখে শুধু, ওঠে না।
তরুণী: ওঠ দিদি, আমার ছোট মাকে দুধ দে।
গলায় ও ঘাড়ে আদর করতে থাকে। গাভী উঠে দাঁড়ায়। পা কাঁপছে। শাবক দুধ খেতে থাকে।  তরুণী গাভীর শরীর ও মেঝের গোবর পরিষ্কার করে নেয়।

দৃশ্য-১১
সকাল। উঠান। গোয়ালঘর থেকে তরুণী বেরিয়ে আসছে। হাতে বালতি। সামান্য পরিমাণে দুধ।
হঠাৎ ধপাস করে শব্দ হলো।
তরুণী ঘুরে দাঁড়ায়।
তরুণী:   আহ, পড়ে গেলি দিদি! তুই কি দাঁড়াতে পারবি না!

দৃশ্য-১২
দুপুর। মাঠে গরু-বাছুর চড়ে বেড়াচ্ছে। আকাশ কালো।
উত্তর-পশ্চিমে ঘন কালো মেঘ।

দৃশ্য-১৩
বিকাল। কালবৈশাখীর ঝড়। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। বাজ পড়ার কড়কড় গর্জন। আবছা অন্ধকার। বিদ্যুতের ঝলকানি।  তরুণী বাথানের দরজা ঠেলে দিয়ে দৌড়াচ্ছে উঠানের মাঝখান দিয়ে। মাথায় ছেঁড়া গামছা। উঠানের অন্যপাশে বসত ঘরে পৌঁছে তরুণী দরজায় দাঁড়িয়ে ভেজা গামছায় গা মোছে। উঠানে অকালপ্রয়াত কাঁচাপাতায় ভরে যাচ্ছে। গাছের ডালপালা প্রবল প্রতিরোধ করছে।

দৃশ্য-১৪
বিকাল। ঝড় বয়েই যাচ্ছে। বাথানের গরু-বাছুরগুলো ভীত ও সন্ত্রস্ত। বাতাসের ঝাঁপটায় চালের টিন ফাঁক হয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির তোড়ে ভিজে যাচ্ছে ঘরের ভেতর। বাছুরগুলো জড়োসড়ো হয়ে মায়েদের গায়ের সঙ্গে লেপ্টে আছে। হঠাৎ একদিকের টিন উড়ে যায়। ভয়ে বাছুরগুলো ভীষণ ডাক ডাকতে থাকে।

দৃশ্য-১৫
ঝড়ের পর। সন্ধ্যা। অন্ধকার। কুপির আলোতে তরুণী গোয়ালঘরের মেঝের পানি কাচছে।  গবাদি পশুগুলো সরিয়ে সরিয়ে বাঁধে।

দৃশ্য-১৬
রাত। নিচু চালের ঘর। বিছানায় মশারি ফেলে তরুণী শুয়ে পড়ে। মশারির বাইরে মাথা বের করে ফুঁ দিয়ে কুপি নেভায়।

দৃশ্য-১৭
পরদিন। বিকালের উজ্জ্বল আলো। সাজানো ঘোড়ার গাড়ি থেকে নেমে আসে এক রাজপুত্র। বার বার এগিয়ে আসে।  পেছনে ছয়জন সৈন্য। নেপথ্যে সম্মিলিত পদধ্বনি।

দৃশ্য-১৮
মুখোশপরা এক ডাকাত সরদার।  পেছনে ছয়জন ডাকাত। সবার মাথায় পাগড়ি। মুখে মুখোশ।  পেছনে সাজানো ঘোড়ার গাড়ি।  সবার হাতে ধারালো তলোয়ার। চকচক করছে অল্প আলোয়।  নেপথ্যে নারীকণ্ঠের চিৎকার।

দৃশ্য-১৯
রাত। ঘুম ভেঙে যায় তরুণীর।  উটে বসে হাঁপাতে থাকে। বালিশের নিচে থেকে দিয়াশলাই খুঁজে বের করে। কুপি জ্বালায়। কলসি থেকে পানি ঢেলে খায়।  আঁচলে মুখ মোছে। খিড়কি খুলে বাইরে তাকায়।

দৃশ্য-২০
উঠানে জোছনা। ঝিঁঝির ডাক।  আকাশ মেঘমুক্ত।

দৃশ্য-২১
রাত। মশারির ভেতর শুয়ে পড়ে তরুণী। কুপির আলো চোখে প্রতিফলিত হচ্ছে।
নেপথ্যে বাছুরের ডাক।
ত্রস্ত তরুণী উঠে বসে।
দরজা খোলে। বাইরে নামতে সাহস পায় না। দরজা আবার বন্ধ করে। বিছানায় উঠে হাঁটুতে মাথা রেখে বসে থাকে। হাই ওঠে। আবার শুয়ে পড়ে।  কুপি জ্বলতে থাকে।

দৃশ্য-২২
রাত। জোছনার আলো। ছয় জন পুরুষের হাতে দড়িধরা ছয়টি গরু। গরুগুলো যেতে চাইছে না। তারা টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

দৃশ্য-২৩
ভোর। বিধ্বস্ত বাথান। একপাশে চাল নাই। অন্য পাশের বেড়া নাই। গরু-বাছুরগুলো উঠানে। হাঁটছে-ঘুরছে। কোনো কোনোটি দূরের মাঠের দিকে চেয়ে আছে। ক্ষুধায় এখানে সেখানে মুখ দিচ্ছে।

দৃশ্য- ২৪
সকাল। উঁচু রাস্তা থেকে অনেক নিচে প্রায় শুকনা নালার পাশে এক নারীর মৃতদেহ পড়ে আছে। অর্ধেক মাটিতে, অর্ধেক ঘোলা পানিতে। মুখে শাড়ির দলা গোঁজানো। সারাশরীর ধুলামাটি মাখা। ছেঁড়া ব্লাউজ অদূরে। পেটিকোট হাঁটুর ওপর।

দৃশ্য-২৫
দুপুর। গাছে একটা কাক ডাকছে।
প্রান্তরে চড়া রোদ।

দৃশ্য-২৬
বিকাল। নিচু চালের একটা ঘরে ছয়টি গরু আটকে রাখা হয়েছে। সামনে খাবার নাই। এদের মধ্যে কৃষ্ণ এবং দুর্গাও আছে। দুর্গা তার শাবকের অনুপস্থিতিতে হাম্বা রবে মাথা উঁচু করে ডাকছে।  অন্যগুলোও অপরিচিত পরিবশে দেখে এবং ক্ষুধার তাড়নায় ডাকাডাকি করছে।

দৃশ্য-২৭
ক্ষুধার তড়নায় ক্ষেপে গেছে কৃষ্ণ। বাঁশের পুরনো বেড়া গুঁতাচ্ছে।  মড়মড় শব্দে ভেঙে যাচ্ছে বেড়া। বেড়া ফাঁক হয়ে যায়। বাইরে গাঢ় অন্ধকার।

দৃশ্য-২৮
ভোর। ফরসা হচ্ছে চারদিক। গরুগুলো দৌড়াচ্ছে। মুখে ফেনা। মাথা থেকে রক্ত ঝরছে।  রাস্তা থেকে উড়ছে ধূলা। দুপাশে কলাগাছের সারি। সবুজ কলাপাতার ভেতর দিয়ে সূর্য উঠছে। গাঢ় লাল সূর্য।

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন