জাফর আহমদ রাশেদ: দূরগামী অভিযাত্রী ॥ মুহাম্মাদ আমানুল্লাহ | চিন্তাসূত্র
৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ১৮ নভেম্বর, ২০১৭ | সকাল ১০:১৬

জাফর আহমদ রাশেদ: দূরগামী অভিযাত্রী ॥ মুহাম্মাদ আমানুল্লাহ

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ শতকের শেষের দিকের কাব্যশৈলীতে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য যুক্ত করেছে। দীর্ঘদিন পর গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন দেশে এক ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এনে দিয়েছিলে। হয়তো এ কারণেই এই সময়ের কবিতায় আমরা তীব্র রাজনৈতিক চেতনা, সমকাল  ও সমাজ সংলগ্নতার অনুপস্থিতি লক্ষ করি।

এই সময়ের কবিতায় প্রধানত অন্তর্জগত ও প্রচ্ছন্ন বহির্জগতের একটা দোলাচল, আর  মাটিছুট কল্পনার শূন্যযাত্রা ও ফ্যান্টাসির তীব্রতার ব্যাপক উপস্থিতি দৃশ্যমান; কবিতাগুলো পরাবাস্তববতার ঘেরাটোপে লীন হয়ে পড়ে। উপমা নির্মাণের প্রতি দলগত তীব্র অনীহা, স্বদেশ-স্বকালের প্রতি অমনোযোগ আর পোস্টমডার্নিজমের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সমর্পণ—এই সময়ে স্বাতন্ত্র্যরূপে চিহ্নিত হয়ে আছে। বিশেষ করে পোস্টমডার্নিজমের প্রতি মনোযোগ-আকর্ষণের পেছনে পশ্চিমবঙ্গের ‘সাম্প্রত’, ‘লাল নক্ষত্র’সহ বিভিন্ন ছোটকাগজ আর বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘লিরিক’, ‘সুদর্শনচক্র’ এবং ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘একবিংশ’সহ কোনো কোনো ছোটকাগজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ছোট কাগজগুলোতে উত্তর আধুনিক কবিতাকর্মের প্রচার প্রসার ও মূল্যায়ন তৎপরতা একটি দীর্ঘ সময়জুড়ে অব্যাহত থাকে।

জাফর আহমদ রাশেদ ২০ সেপ্টেম্বর ১৯৭০ সালে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার সুচক্রদণ্ডীগ্রামের খাস্তগীরপাড়ায় জন্ম গ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।  তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৪টি: কাচের চুড়ি বালির পাহাড় (১৯৯৭), যজ্ঞযাত্রাকালে (২০০১), দোনামোনা (২০১০) ও ছেলেদের মেয়েদের স্নানের শব্দ (২০১৬)। এছাড়া আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছোটগল্প: জীবনোপলব্ধির স্বরূপ ও শিল্প  (২০০১) নামে তাঁর একটি গবেষণা-গ্রন্থ রয়েছে। এখানে প্রথম তিনটি কাব্য নিয়ে আলোচনা করো হচ্ছে।

কাচের চুড়ি বালির পাহাড় (১৯৯৭) জাফর আহমদ রাশেদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ বাংলা একাডেমির  তরুণ লেখক প্রকল্প প্রকাশ করে। এ কাব্যগ্রন্থে ‘কাচের চুড়ি বালির পাহাড়’, ‘নদীতে নৌকায়’ ও ‘সমুদ্রে সমতল’—এ তিন বিভাজকে  ৪৩টি কবিতা মুদ্রিত হয়েছে। কাচের চুড়ি বালির পাহাড় (১৯৯৭)-বিদীর্ণ বাউলের ব্যাকুল পঙ্‌ক্তি্‌মালা; যা পাঠকের কানে শব্দেছন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে। এই গ্রন্থের প্রথম কবিতায় কবি নিজেকে ঘোষণা করেছেন আকাশের সহোদরা সুপ্ত দুপুর হিসেবে। আবার কখনো কখনো তিনি নিজেকে বলেছেন উদ্বাস্তু, আরব-আগন্তুক, আত্মহন্তারক,  প্রাকৃত ক্রীতদাস, সন্তসন্তান বা অসহ সাধক । এই কবিতাগুলোর প্রধান বিষয় প্রণয়বেদনা মনে হলেও কবি এখানে আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে নিমগ্ন। তাঁর এই সুলুক সন্ধান মাঝে মাঝে দোলাচলের দ্বৈরথে বিদীর্ণ। তিনি পূর্ব পুরুষের হাতের রক্ত তাঁর হাতেও যেন দেখতে পান -তখন নিজেকে নিজে বলে ওঠেন—

১. ‘বঙ্গের পুষ্পের হাতে ভালোবাসা শেখো।’ (পাঠ / কাচের চুড়ি বালির পাহাড়)
২.কিন্তু এখন শুধু রক্ত দেখি শিশ্নে-কব্জিতে/ আমি কি অবঙ্গজ বেদুঈন দূত? (পাঠ / কাচের চুড়ি বালির পাহাড়)
৩. বিবস মাথায় কাঁদে তারার শহর / উদ্বাস্তু বুঝি না আমি কে আপন পর।  (উদ্বাস্তু / কাচের চুড়ি বালির পাহাড়)
৪.আমি তো সন্ত-সন্তান সাধক অসহ/ ভালোবাসা প্রেম বলে বাঁশের খুঁটিকে কেটে বানিয়েছি বাঁশি। (প্রাকৃত ক্রীতদাস/ কাচের চুড়ি বালির পাহাড়)

রোম্যান্টিক প্রণয়বেদনা এই গ্রন্থের কবিতাগুলোর  প্রধান অনুষঙ্গ—এখানে কবিপুরুষ, প্রেমিক-প্রেয়সীর ক্রীতদাস। বাস্তব জীবনের লৌকিক দুঃখ-যন্ত্রণার রূপায়ণে কবি এখানে পুরোদস্তুর রোম্যান্টিক। তাঁর এই চেতনা গ্রাম-শহর, সমতল-পাহাড়, স্বদেশ-স্বকাল ছাপিয়ে গেছে অনায়াসে। কবিতাগুলো পড়তে পড়তে মনে হতে পারে—কবি নারীপুরুষের হৃদয়জ বন্ধনকে কাচের চুড়ি বা বালির পাহাড় বলে অভিহিত করতে চান। বাংলাদেশের প্রকৃতি-আকাশ, জোনাকি, ভ্রমর, দোয়েল, চন্দ্র, প্রজাপতি, ফড়িঙ, চামেলি প্রভৃতির অনুষঙ্গে তাঁর এই বোধ রূপায়িত হয়েছে স্বতন্ত্র ব্যঞ্জনায়। যেখানে কোনো বাস্তবতার বিন্যাস বা যুক্তির জালজট অনুপস্থিত।

১.
চন্দ্রকে ভালোবেসে হয়ে উঠি প্রাকৃত ক্রীতদাস।
(প্রাকৃত ক্রীতদাস/ কাচের চুড়ি বালির পাহাড়)      
২.
যা কিছু তোমার আমি রেখেছি গো জমা
আমাদের পাপ নেই, নেই কোন ক্ষমা
আনন্দের ঘর নেই নীল তার সীমা
পূজায় বানাই আমি তোমার প্রতিমা।
(কীর্তনীয়া/কাচের চুড়ি বালির পাহাড়  )

৩.
সর্বস্ব ছাড়বো আমি, আমার নির্বাণ হবে তোমার ভিতর
নগরের বাইরে গিয়ে বাঁধবো স্বপ্নের ঘর টিলার ওপর।
(প্রেয়সী অস্পৃশ্যা হলে/ কাচের চুড়ি বালির পাহাড়)          

কাচের চুড়ি বালির পাহাড় (১৯৯৭) কাব্যগ্রন্থের  ‘নদীতে নৌকায়’ বিভাজকের অধিকাংশ কবিতা পয়ার আর চতুর্দশপদীর ঢঙে রচিত। কবি প্রতিনিয়ত যেন স্বপ্নকে পান করেন; পান করতে চান। কিন্তু তিনি লক্ষ্য করেন ‘পুরবাসী নারীদের আঁচলে বারুদ বাঁধে কৌমের কুমার’ আবার ‘চাঁদ শুধু পুড়তে জানে, পোড়াতে জানে না’। প্রভু, প্রেম, পুরাণ, প্রকৃতি ছন্দে ছন্দে অনুরণিত হয়ে ওঠেছে এই কবিতাগুলোতে। স্বপ্নে-সৌন্দর্যে ভরে উঠেছে কবিতার পঙ্‌ক্তিগুলো। তিনি সমুদ্রের কথা, সমতলের কথা বলেছেন: আবার শুনতে পেয়েছেন পাহাড়ের ডাক। ঋতুবতী, টংঘর, অর্জুনের মাছ, আঁধারে আঁধার নামে শিরোনামের কবিতাগুলো সুরেলা চতুষ্পদী। ঠিক যেন ব্যক্তিগত অনুভবের অপার আকাশ থেকে তারায় তারায় খচিত শব্দমালা দ্যুতিত হতে থাকে।

১.রূপচাঁদা মরে যায় পুকুরের জলে।                 (প্রকৃতিজ/ কাচের চুড়ি বালির পাহাড়)

২.নদী ছিল নদী আছে- শোনা যায় গান
বিচ্ছিন্ন বাউল এক ফিরেছে আবার।               (বনজ আবাস / কাচের চুড়ি বালির পাহাড়)

৩.কালাপাখি শোন তোর চোখ কান নাই?
মনের ভেতরে মাঝি রাঙা নাও বাই।                (কালাপাখি / কাচের চুড়ি বালির পাহাড়)

৪.পাপ চেড়ে চলে যাই পাপ তো ছাড়ে না।
মানুষ ক্ষমে না প্রভু মানুষ পারে না।                (অক্ষমার্হ/ কাচের চুড়ি বালির পাহাড়)

৫.পাহাড়ের নিচে যারা জুম চাষে দুপুর হারায়
… তাদের প্রণাম করি।                                   (স্বার্থেও শর্তে / কাচের চুড়ি বালির পাহাড়)

জাফর আহমদ রাশেদের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ যজ্ঞযাত্রাকালে (২০০১)। এই কাব্যের কবিতাগুলোতে কবির কাব্যভাষা ও শিল্প ভাবনা বাঁক নেয় প্রজ্ঞায়-প্রাত্যহিতকতায়—এখানে শব্দ চয়ন, দৃশ্যকল্প ও উৎপ্রেক্ষা নির্মাণে অধিকতর স্বাতন্ত্র্য দৃশ্যমান।  কবি এখানে এক স্বাদহীন, অর্থহীন, অযূথচারী বোধের কথা বলেছেন স্বজাত কণ্ঠে। আবার ছায়া কুয়াশার বিভ্রান্তি পেরিয়ে এক আলোকিত আকাশ পানে ছুটছেন, স্বপ্নের সোনালি ডানায় ভর দিয়ে।

১.ছায়া চিনি, কায়ার ভেতরে তাকে আলোয় দেখি না।                     (ছায়া/ যজ্ঞযাত্রাকালে)

২.জিহ্বায় জিহ্বা রেখে বেদনার ভাব বিনিময়, লালজিভ, নীলওষ্ঠ—
কতদিন! রসনায় স্বাদ থাকে কতকাল….                                   (স্বাদ/ যজ্ঞযাত্রাকালে)

৩.পাথরের পেট ভেঙে উঠে আসে চপল দাঁড়াশ। দূরবিন্দুগুলো বহুদূর।     (অর্থহীন / যজ্ঞযাত্রাকালে)

কখনো কখনো প্রাত্যহিক জীবনচর্যার নানা অনুষঙ্গ আর স্মৃতি তর্পণের কথামালা চিত্রিত হয়েছে রূপক প্রতীকের সুরেলা ব্যঞ্জনায় । বোন বোন অনুভব, ঘরের চৌকাট, জংধরা লোহার দরজা তাঁর সহচর আর সহমর্মী হয়ে জেগে উঠেছে যখন তখন। আবহমান বাংলাদেশের ঋতুচক্রের নান্দনিকতায় কখনো আলো, কখনো কুয়াশা আবার কখনো অনুযোগের বার্তা নিয়ে শীত হেমন্ত জোনাকির প্রসঙ্গ এসেছে এ কাব্য গ্রন্থের কয়েকটি কবিতায় ।

১.বাড়িতে জোনাকি এলে কেন এত দ্রুত মরে যায়।                                  (শোক/ যজ্ঞযাত্রাকালে)

২.কত বোন নারী হল, আমার একটি বোন এখনো বোন হয়ে আছে।        (বোন-বোন / যজ্ঞযাত্রাকালে)

৩.জোনাকি সুসুপ্ত পথ জুড়ে আমাকে চিনিয়েছে আমাদের বাড়ির দরজা।          (শোক/ যজ্ঞযাত্রাকালে )

৪.ঘরের চৌকাট কিছু জানে, জংধরা লোহার দরজাও, বেশি জানে কাছের
তারাটি -আহা সেও নাকি কত শত লক্ষ মাইল দূরে।     (কাছের তারাটি দূরে / যজ্ঞযাত্রাকালে)

যজ্ঞযাত্রাকালের বেশ কিছু কবিতা টানা গদ্যে লেখা; কয়েকটি কবিতা পরাবাস্তবতার চাদর আর উত্তর আধুনিকতার নিবিড় নিরীক্ষায় আবৃত। ‘পায়ের নিচে পা’, ‘বারচন্দ্রের গল্প’, ‘অযূতচারী’,‘জীবনানন্দ’,‘মুজিব মেহদী বাড়ি চলে গেছে’ নামের কয়েকটি কবিতা এ ঘরানার লেখা। আবার কিছু কয়েকটি কবিতায় প্রকৃতি ও পাখির প্রতি দুর্নিবার ভালোবাসা লক্ষণীয়।  সুখের বিষয় এই এখানেও কবিতায় প্রবল দুর্বোধ্যতা নেই—এ যেন এক মায়াবি চাদর দুলে দুলে আলো-জোছনার বোধ জাগিয়ে তুলে। তাঁর এ বাঁক বদল পাঠকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে কোনো ব্যত্যয় ঘটায়নি; এখানে তিনি অনন্য।

১.আশ্বিনে টুপটাপ শিউলির পর কার্তিকে শিশির।  বর্ষার মন্দ্র মেঘের পাড়ে চন্দ্রজন্ম অবলুপ্ত থেকে যায়। তখন জলপতনের আবেগে চুম্বনোন্মুখ ঠোঁটের ভঙ্গিতে শরীর কাঁপে; কিংবা তার কাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে অতলান্তিক জলের সারৎসার থেকে। রাত্রি তার সর্বশক্তি নিয়ে নিতান্ত শুক্লপক্ষেও চন্দ্রময় করোটির পরাজয় ঘোষণা করে।     (বারচন্দ্রের গল্প/ যজ্ঞযাত্রাকালে)

২.বিভ্রান্তি ঘুচে গেলে সেইখানে কাছাকাছি জেগে উঠবে তারা; চারপাশে পাতারা কথা বলবে মাতৃভাষায়। মাতৃভাষা মাত্রেই সকলের গম্য, আর তুমি কক্ষে ফেরা তারার অধিক। পৃথিবীর যাবতীয় ভাষা, আকাশ ও মৃত্তিকা তোমাতে লীন। তখন তুমিও অনেক তারা একগুচ্ছ পত্রপল্লববিহঙ্গনদী।   (অযূতচারী / যজ্ঞযাত্রাকালে)

এ কাব্যগ্রন্থের সিঁদুর, কানামাছি, জন্ম, সুবাতাস, লবণদুধ  নামের কবিতাগুলো পাঠকপ্রিয়তা পাবে নিঃসন্দেহে। তাঁর সময়ে এ রকম কবিতা খুবই কম দেখা যায়। এখানে তিনি বারবার আলো ঝলমলে সময়ের কথা বলেও আবার বলছেন ‘আমিও এসেছি বড় আঁকাবাঁকা পথে’। ‘আমিও সুবাতাস হই আমাকে নেবে।’ কবিতাগুলো হৃদয়গ্রাহী, সুখপাঠ্য আর শিল্পগুণ বিচারেও উঁচু মাত্রার।

১.
যেতে আমি বলি নাই তবুও সে গেছে,
হাত ধরে রাখি নাই তবু সে রয়েছে;
ইন্দ্রিয়ের সীমানায় খেলে কানামাছি
উদ্বাহু বাতাস বলে : ‘আছি, আমি আছি।’
(কানামাছি/ যজ্ঞযাত্রাকালে)

২.ক.
কুমারীর বুকে মুখ রেখে পান করেছি লবণদুধ।
মাতৃত্ব চায়নি যে নারী,
যতটুকু পারি
যূথবদ্ধ ভালবাসাবাসি তার সাথে আমিও খেলেছি।
(লবণদুধ / যজ্ঞযাত্রাকালে)

খ.
অপত্য স্নেহের তৃষ্ণা কাঁপায়নি শিশ্নের শিরা
ফুলকুমারীর কাছে বাজিয়েছি অলস মন্দিরা।
 (লবণদুধ / যজ্ঞযাত্রাকালে)

তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘দোনামোনা’ (২০১০)।  কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম শুনে আমাদের দোটানা বা দ্বৈতসত্তার কথা মনে আসে। হ্যাঁ, কবির এ সত্তা নীরবতার-সরবতার, প্রেমের-অপ্রেমের, প্রতীকের-অভিব্যক্তির। এ গ্রন্থের কবিতাগুলো বিমূর্তচেতনার বহুবর্ণ রূপায়ণ, নিরালম্ব শূন্যতার আর্তস্বর আর নিবিড় নীরবতার বাঙ্ময়রূপে উৎকীর্ণ, প্রতীকময়তায় উৎকর্ষে উত্তার্ণ। ‘দোনামোনা’ র সুর ও স্বর একবারে স্বতন্ত্র । দুয়েকটি বাদে প্রায় সকল কবিতা টানা গদ্যে লেখা। শীতের স্তন, জীবিত ও মৃত, প্রত্যহ শবযাত্রায়, উল্টানো আকাশ, পাথর, দাগ, উৎসর্গের গল্প, প্রেমিক ও নির্মাতা, কেন যাবো বলেছিলাম, মূলবিন্দু শিরোনামের কবিতাগুলো যেকোনো সহৃদয় পাঠককে আনন্দ দেবে নিঃসন্দেহে।

 ১.
একটি মেয়ে আমাকে বলেছিল—‘যা চাইবে, দেব।’
আমি কাউকে বলিনি।
আমি কি একটি মাত্র ছেলে, মেয়ের কাছে যা চেয়েছি, পাইনি?   (মূলবিন্দু/ দোনামোনা)

 ২.
বয়ঃসন্ধিকালে চালতে তলায় বীর্যমোচন হলো। সঙ্গমে বীতশ্রদ্ধ হলেই কী, লিঙ্গ নেড়েচেড়ে মৃত ইঁদুর ঝুলিয়ে রাখতে কে বারণ করেছে? অবসাদে সুখ করো, মন্দিরা বাজাও।   (নিঃসঙ্গমে/ দোনামোনা)।

গদ্যশৈলীতে মুক্তমেজাজে রচিত কতিপয় পদাবলি কখনো কখনো নিখাদ নিরীক্ষায় ঘেরাটোপে সংবৃত- যা আকষ্মিক মনে হতে পারে দুবোর্ধ্য, অথচ এই সুস্বাদু- উপভোগ্য এই কবিতাগুলোই একটু পরে পাঠককে খুব সহজে জানিয়ে গদ্য কীভাবে গদ্য-পদ্য পেরিয়ে কবিতা হয়ে উঠে। কোথাও কোথাও বেজে উঠেছে স্বপ্ন ভঙ্গের করুণ বিউগল, নৈঃসঙ্গ-নীরবতার সুর; প্রতীকে -রূপকে।

ভেন্টিলেটর ভেঙ্গে রাজার চড়ুই উড়ে গেছে।…..
তবু উড়ে গেল ছেলে চড়ুই মেয়ে চড়ুই, আর কোন দিন আসবে না, ডানা প্রজাতি আর আস্ত একটি বাড়ি তুলবে না—আমাদের বাসায় আর ভেন্টিলেটর নেই।….গহ্বরে স্রোতের বিপরীতে আমি সাঁতার কাটি।  (রাজার চড়ুই উড়ে গেছে / দোনামোনা)।

এ কবিতায় কে রাজা? ছেলে চড়ুই, মেয়ে চড়ুই, ভেন্টিলেটর নামের শব্দগুলো প্রতীকী চিহ্ণ মাত্র-পাঠককে খুঁজে নিতে হবে শব্দগুলোর অর্থব্যঞ্জনা। রাজা এখানে একজন ব্যক্তি আর চড়ুই তাঁর জীবনের স্বপ্ন, গতি, প্রেম বা অন্যকিছু-এভাবে পাঠকের উপলব্ধির স্বাধীনতা দিয়েই কবিতাগুলো রচিত। কবি নিজেই বলেছেন- ‘স্রোতের বিপরীতে আমি সাঁতার কাটি’-শুধু তিনি নন, মূলত প্রতিটি সৃজনশীল মানুষই এটি করেন।

সময়ের বিপতীপ স্রোতের উজানে চলে ভাটির মানুষ; জীবন এগিয়ে যায়। ‘স্রোত ভেঙ্গে স্রোতে ভেসে’- দুইভাবে মানুষ এগিয়ে যায়- এগোনোর চেষ্টা করে। এই এগিয়ে যাবার বিষয়টি কবি পর্যবেক্ষণ করেন এভাবে-‘স্রোত ভেঙ্গে মাছ তার যৌবন ডেকে আনে, পাখি হাওয়া ভেঙ্গে চলে।’ অথচ সময় তার চলার পথের বিপদ-বাঁককে দেখে না, দেখে তার সফলতা, অভিষিক্ত করে তার স্বপ্ন আর ব্যাকরণ জয়কে। সময়ের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে তিনি বলেন: ‘আমরা সমস্ত আড্ডায় সেই বিবাহিত পুরুষের কথা বলি যে স্বপ্ন ও ব্যাকরণ জয় করে।’

তারপর আবার বলছেন— ‘তবু তাকে ফড়িঙের ক্ষিপ্রতা নিয়ে জেগে উঠতে বলি, কতিপয় ঘাসফুলের কথা বলি, যারা আজও মেশিনের নিচে জল ও হাওয়ার মতো তীব্রতা নিয়ে আসে।’   (স্রোত ভেঙ্গে স্রোতে ভেসে-/ দোনামোনা)

দোনামোনা’র প্রেমের কবিতাগুলোতে কবি একজন পরিণত প্রেমিক—প্রণয়বোধের উচ্ছ্বাস আবেগের উন্মত্ততা নয়, এখানে এক দীর্ঘ দুঃখ কাতরতা, সহমরণ সহমর্মীতা আর অমরঅজর চেতনাবোধের গীতল বয়ান দেখা যায়।  তিনি যখন প্রেম কাতরতায়, জন্মমৃত্যুতে লীন একজন প্রেমিকপুরুষ; তখন তিনি কখনো গণিকা, কখনো প্রেমিকার প্রেমে মত্ত-নিমজ্জিত। এই প্রেম প্রণয়কাতরতা আকুতি সমর্পণের পাশাপাশি কখনো প্রশ্ন কখনো স্বীকৃতি আবার কখনো নিবিড় ভাবনায় দীপ্তমান। তাঁর প্রেমের এই ‘ঘটনা’য় দুপুর বা ভরবিকেলে রাত নেমে আসে ছন্দের দোলায় দোলায়। কয়েকটি কবিতায় নাগরিক যৌন জীবনের ছায়পাত ঘটেছে-তখন গণিকার শরীরের বর্ণনার সঙ্গে দশটাকার নোটে বঙ্গবন্ধুর ছবির কথা উঠে এসেছে অকপটে।

১.
বিবস্ত্র গণিকার কোমরে ঝুলে থাকা দুঃখ আমি।        (আমি ও আমার গণিকা / দোনামোনা)
২.
সত্যি করে বলো তো-আমি কি মরিনি? সমস্ত সহ-অঙ্গের প্রত্ঙ্গ নিয়ে বলো-তুমি বেঁচে আছো?  (আত্মঘাতী/ দোনামোনা)

৩.
ডান হাতে সে তার আঁচল সরাল প্রকাশ্যে-তার ডান দিকের স্তন দেখলাম।
হবে পাঁচশ গ্রামের এক টুকরা মাংস, দেখলাম তার ঘা-চূড়ায় ও চতুর্দিকে, (প্রথম দেখা/ দোনামোনা)
৪.
মধ্যদিনে ঘনিয়ে এলো নির্জনতা
আমি তাকে পরিয়ে দিলাম রাতের মুকুট।
ঝিঁঝির ডাকে সমাহিত তোমার কথা
আমি চাইছি এবার ঘটুক এবার ঘটুক। (ঘটনা/ দোনামোনা)

জাফর আহমদ রাশেদের কাব্যযাত্রা সবুজ ভাবাবেগ ও তীব্র রোম্যান্টিকতার উচ্ছ্বাস নিয়ে সূচিত হয়ে এক নিবিড় নীরবতায় দীর্ণ দুঃখকাতরতার দিকে প্রবহমান। তিনি কোমল পেলব অনুভবের পাশাপাশি জীবনের কঠিন কৃশরূপকে চিত্রিত করেছেন-রূপকে প্রতীকে, উপমায় উৎপেক্ষায়। তাঁর কবিতাগুলোর প্রশান্ত, সৌম্য, স্নিগ্ধরূপ এক সুমধুর গীতলতায় ব্যঞ্জিত-অনুরণিত। কয়েকটি কবিতার গল্পময়তা আর রসবোধ তাঁকে স্বতন্ত্র স্বর ও সুরের সন্ধান দিয়েছে। তাঁর তিনটি কাব্যগ্রন্থ পর্যালোচনা করে সহজে এ কথা বলা যায় যে, তিনি সৃষ্টিতে-দৃষ্টিতে পরীক্ষা নিরীক্ষাপ্রবন একজন সন্তসাধক। প্রতিনিয়ত তাঁর কবিতার ভাবনাবোধ ও ভুবনবৃত্ত বিবর্তিত হয়েছে প্রজ্ঞায়-প্রাত্যহিকতায়। তিনি নিজেকে একজন আরব-আগন্তুক উদ্বাস্তু বলে কবিতা লেখা শুরু করলেও ক্রমাগত কাব্য শিল্পের দূরগামী অভিযাত্রীরূপে এগিয়ে যাচ্ছেন স্রোত ভেঙে স্রোতে ভেসে।

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


One Response to “জাফর আহমদ রাশেদ: দূরগামী অভিযাত্রী ॥ মুহাম্মাদ আমানুল্লাহ”

  1. মাসুদ আনোয়ার
    সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৭ at ১১:৫৯ অপরাহ্ণ #

    জাফর প্রচণ্ড নিভৃতচারী। কবিতায় আরো বেশি নিভৃত, নীরব।

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন