কারখানার বাঁশি: পর্ব-১৫॥ হামিম কামাল | চিন্তাসূত্র
৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ১৮ নভেম্বর, ২০১৭ | সকাল ১০:২৫

কারখানার বাঁশি: পর্ব-১৫॥ হামিম কামাল

পরদিন কাজের মধ্যবিরতিতে সমীরকে চা খেতে ডেকে নিলো মকবুল। যখন ফিরে এলো তখন তার মুখ থমথম করছে। যদিও কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে তার প্রত্যুত্তর করছিল হাসিমুখেই; যেমনটা তার স্বভাব।
ফিরে আসার পর থেকে সমীর খুব কষ্ট করে হাসছিল। যেন একটা কিছু ভাবছে আর মরছে ভেতর ভেতর।
এরপর দিন বেলা বাড়তেই কারখানার হাওয়া যখন সূর্যের আঁচে ক্রমশ হালকা হয়ে উঠতে থাকল, হাওয়ার ঘনত্বের অভাবটা পূরণে ক্রমে ঘনিয়ে উঠল সমীরের গল্পটা তখন। এমন এক আবহ তৈরি হলো যে মুখ ফুটলেই সমীরকাণ্ড ছাড়া কথা নেই।
কারখানার বাতাসে প্রথমে একটা বাক্য ভাসছিল, সমীর চুরি করেছে!
বাক্যটা ক্রমেবিভাজিত হতেসৃষ্ট হলো আস্ত এক গল্প। গল্পের সারাৎসার এই, সমীর একটা রোবট বানাবে বলে কারখানার ভাঁড়ার থেকে দুটো পকেট ট্রান্সফর্মার সরিয়েছিল আর টিয়া তা দেখতে পেয়ে রীতিমতো যুদ্ধ করে ফেরত দিয়ে এসেছে।
টিয়ার জয় হোক! ধন্য ধন্য!

যোগ্য বাহক পেলে গল্প বিষয়টা একটা লোকবোধ্য ধারাবাহিকতা রাখতে যে দ্বিধা করে না, বরং তাণ্ডই দাবি করে, টের পেল সমীর। তার ভিজে ওঠা চোখজোড়া কেবল একবার একে আরেকবারে তাকে দেখে গেল। সেটা একবারের জন্যই। চোখের জল তার দৃষ্টির উত্তাপ শুষে নিয়ে একটা শীতলতা নিয়ে এলো। ওই শীতল চোখেই দেখল সমীর, বাহক যেহেতু অসংখ্য, তাই প্রথম গল্পের ধারাবাহিকতাও বজায় থাকল দিব্যি, কোথাও বাধা পেলো না। শুরুর পর আর পেছনে তাকানোর অবকাশ থাকল না। কোথাকার জল যে কোথায় গিয়ে গড়িয়ে কী ডুবিয়ে দিতে থাকল সেদিকে চোখই গেল না সিংহভাগের।
টিয়ার ওপর স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ ক্ষেপেছে সমীর। আসল রূপটাও দিব্যি বেরিয়ে গেছে। জীবনের হুমকি এসেছে টিয়ার ওপর, এখন?
এবার হলো? আগে কত শতবার কতকিছু বলেছে ছেলেটা, বিশ্বাস করোনি!
আর এখন যদি বলা হয়, কে কে বিশ্বাস করোনি তখন হাত তোলো দেখি? দেখিস, একটা হাতও উঠবে না!
কারখানার কাজ শেষে বাসায় সে ফেরে কী করে, তা নাকি দেখে নেবে সমীরের পাণ্ডারা।
এবারই কি প্রথম? এখানে কাজ শুরু পর থেকেই দুটি ভাই মিলে শুরু করেছে কারখানাকে ফাঁকা করে দেওয়ার কাজ! কোনো বিরাম নেই। ওসব ঢাকা দিতে আছে কতগুলো গালভরা বুলি। আহা যেন কত দুঃখ, যেন কত বন্ধু!
ওসবের অনেক কিছুরই সাক্ষী আছে টিয়া। এবার ছেলেটার জীবনের ওপর দিয়ে না যায়।
ওদের বাপ তো রংপুরে না কোথায় কোন কারখানায় কাজ করতো। মালিকের শালা না কাকে যেন খুন করে এখন ফেরার আসামি।এখন মা কোথায় নেই ঠিক। আর ওরা এখানেই বা এসেছে কেন? উত্তরে ঠেকেছিস, আসেপাশে থাক! একটা না একটা ব্যবস্থা তো হয়েই যেত! এলি কেন সুরবঙ্গের আরেক প্রান্তে? মগজে তো অন্য ধান্ধা।

আরে ভালো হবে কী করে, যেমন গাছ তেমন ফল। আমার মনে হয়, নির্ঘাৎ ওরা আগের ম্যানেজারের বিশ্বস্ত চর। দুটোকেই সরিয়ে দিয়ে ল্যাঠা চুকে যাক বাবা, এসব আর ভালো লাগছে না। নয়তো এক ঘটনা বার বার ঘটবে, বারবার।
আচ্ছা, সমীরের সঙ্গে গলায় গলায় প্রেম কেন লাবুণ্ডআমানদের? এসবে ওদের হাত নেই তাও বা কী করে বলা যায়?
এখন তো সবাই জানে, ভাঁড়ার থেকে সমীরকে ট্রান্সফর্মার দুটি সরাতে লাবুও দেখেছিল। তাহলে তার অত নীরব থাকার কারণ কী? সাবধান করতে এসে আবার টিয়াকে সজাগ দেখে কিছু না বলে ফিরে গেছে তখন?
যারা সব বিশ্বাস করেছে তারা তো করেছেই। গল্প প্রচারে তারা এগিয়ে। আর বিশ্বাস যারা করেনি, আবার যারা দুটোর মাঝামাঝি দোদুল দোল খাচ্ছে খুব, তারাও অন্তত এটুকু অনুমোদন করেছে, কারখানা এক ষড়যন্ত্রের জাল কেটে বের হতে না হতেই আরেক দুঃসহাবস্থার গর্তে বুঝি পড়তে যাচ্ছে। এখন নাণ্ডজানি কোন নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। নাণ্ডজানি এবার ঢাকা থেকে কোন সমন জারি হয়। নতুন করে হয়ত ছাঁটাই শুরু হবে এ সুযোগে।
এভাবে তিল পরিমাণ আশঙ্কাকে আর পারস্পরিক অবিশ্বাসের আঘাতে স্ফীত হতে হতে তাল পর্যন্ত হয়ে উঠতে দেখলো সলিল। ঘুরে ঘুরে সে সবার কথা বলা মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল নির্বাক। যেন কোনো বিষয়ে তার কোনো ভাষ্য নেই। শুধু ভাষা আছে।
যে কারখানা ওদের পেটে ভাত জোগায়, একটা শ্রেণী তাকে ভালোবাসে না। সব চেটে পুটে শেষ করে দিতে চায়। সঙ্গে লাথি মারতে চায় আরও দশ জনের পেটে। এরা প্রকাশ্যে দল পাকায় না। এদের দলটা পেকে ওঠে আড়ালে, বাইরে। ভেতরে ভেতরে। বলল সৌরভ। তো এখন কী করবে মকবুল?
মকবুল সবার প্রশ্নের সামনে হাসির মতো ভঙ্গি করে শুধু স্থানবদল করেছে কদিন, সৌরভের সঙ্গে তো আর তা করার সুযোগ নেই। ঊর্ধ্বতনের চোখজোড়া দেখতে গিয়ে দেখলকেবল একটা চোখ। এরপরই দৃষ্টি বদল করল।ঠোঁটও যে তাই বলে থেমে থাকল তা নয়।
ট্রান্সফর্মার যেহেতু এখন ভাঁড়ার ঘরেই আছে স্যার, আর সমীর তার দোষ কবুলও করেছে, লিখিত কোনও অভিযোগও কেউ দেয় নাই। কী করব আপনিই বলুন?
অভিযোগ তুমিই দাঁড় করাও! সৌরভ একবার সলিলের দিকে তাকিয়ে যেন স্বাক্ষী মানল এ কথার। এরপর ভাঁড়ার ঘরে ওই গোপন ক্যামেরা বসাতে চাওয়ার আবেদন করো। আমি স্বাক্ষর করে দিচ্ছি।
সমীরের পাশে সৌরভ এসে দাঁড়াল সেদিনকাজের ঘরে। কুণে চোখ করে তাকিয়ে থাকলো অনেকক্ষণ। সমীর তখন কাজ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ।বাঁকানো ছুরি হাতে মোল্লা যখন এসে দাঁড়ায় বলির পশুর পাশে, তখন চতুষ্পদের চোখের দৃষ্টি যেমন হয়, অবনত, ভীত, করুণাপ্রত্যাশী, খানিকটা সুযোগসন্ধানী, সমীরের দৃষ্টিও হয়ে উঠল ঠিক তেমন। কিন্তু মানুষের মানস তো আরো সরস।তাই অনুতপ্ত চোখ ফেটে একবার জল বেরোতে চাইল। লজ্জিত মন গোটা শরীরকে নিয়ে মাটিতে মিশে যেতে চাইল। আর এতোসব মনোভাবনার নগ্ন প্রকাশও ঘটল তার শরীরে, তার চোখে, মুখে।
সবাই কাজ ফেলে দাঁড়িয়েছে আরও আগেই। অনুভূতি লুকোতে অনভ্যস্ত সমীর কারখানায় এই প্রথম খাঁচায় আটক থাকা এক চিড়িয়া হয়ে সবার কৌতূহলী চোখের চাহিদা মিটিয়ে চলল।

তৃতীয় দিনেসমীরের সঙ্গে প্রায় সবার এক ধরনের প্রত্যক্ষ দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল। দেখা গেল তার সঙ্গে কথায়, আচারে সবাই যেন পুরোপুরি আড়াল নিয়ে নিয়ে নিতে চাইছে, একটা পুরু বর্ম পরে ফেলেছে। অর্থাৎ পরিবেশ যুদ্ধংদেহী। বর্ম পরেছে, কিন্তু অস্ত্র লুকোয়নি।
সেদিন থেকেই কারখানার আবহটা সমীরকে ছাপিয়ে ডোবালো তারেককেও।
আগেরদিনও সমীর একাই বিক্ষত হয়েছে। ওদিকে তারেকের জন্যেও তো ছুরি শানানো চলছিল। তবে মহড়ায় ওটা বাতাসই কেটেছে কেবল। তারেকের কাছে যেহেতু কেউ যায়নি, ওই ছুরি তাকে বিদ্ধও করেনি। সেদিনই করল প্রথম।
শুধুমাত্র সমীরের বিষয়ে কথা যখন প্রথম তারেকের কানে এসেছিল, প্রতিক্রিয়া খুব একটা জমাট বাঁধতে গিয়েও বাঁধেনি তার মনে। সদ্য তারুণ্যে আসা বিগতকৈশোর ভাইটির প্রতি করুণাতেই বরং মনটা ভিজে উঠেছিল।কিন্তু ওটা ক্ষণিকের জন্যই। ক্রমেই বিষিয়ে উঠেছিল মন। কিন্তু সেদিন হিসাব বদলে গেলো আরো। আত্মনিয়ন্ত্রণে থাকা তারেক হয়ে উঠল আচমকা মারকুটে।
কী ভাই। কী শুনি এসব? এই পর্যায়ে গেল কী করে? ঠেকিয়ে রাখতে পারলে না?
হুম, শুনলাম আপনার ভাইয়ের ব্যাপারে সব।আদরে আদরে গা দরদ।
আপনার এই ভাইটাকে আমি আগেও সন্দেহ করেছিলাম, বলিনি কাউকে। ওর যা দাপট, শেষমেষ আমাকেই না বিপদে পড়তে হতো!
আজ এটা, কাল তবে কী? লতা চুরি পাতা চুরি, শেষে রাজার হাতি চুরি। এণ্ডই তো হচ্ছে।
কী ব্যপার তারেক ভাই। কদ্দিন, হ্যাঁ? সঙ্গে অর্থপূর্ণ হাসি।
কী, কেমন বড় ভাই তুই তারেক! আমার ভাই হলে তো হাত ভেঙে দিতাম এতোক্ষণে। তুই তো দেখি দিব্যি বসে আছেন। এখনো আদর করছিস, খাওয়াচ্ছিস দাওয়াচ্ছিস।
কে জানে বাবা,আমরা তো বোকাসোকা মানুষ, চোখে ধুলা দেওয়া সহজ।
ওরে বাবা! চোরের মায়ের দেখি আবার গলা বড়! কারখানার ছুটি হওয়ার পরও তুই কেন এতো লম্বা সময় ছুতো করে থাকিস, মনে হয় কেউ জানে না! মনে হয় বোঝে না কেউ?
কিছু না বলায় বাড় বেড়েছে। এখন ফোঁস করছে। মার ডাণ্ডা দুই চোট্টাকে।
অন্য কিছু আশা করেছ নাকি তোমরা? এরা বাপকা বেটা! হাহ্ হা!
এ পর্যায়ে তারেক আর নিজেকে সামলাতে পারল না। কথকদের এই শেষ বাক্যটা তাকে এক ধাক্কায় আত্মনিয়ন্ত্রণের সীমানার বাইরে দিলো ফেলে। ভেতরের ভালোমানুষী ক্ষোভটুকু বিকৃত ক্রোধে রূপান্তরিত হতে শুরু করল। মানুষের প্রশ্নের বিপরীতে নিজের ওপর ক্ষোভ, আর সবার ওপর ক্রোধের ঘোড়ার লাগাম সে পেশি ফুলিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে রাখল বটে। কিন্তু ক্ষ্যাপা সে ঘোড়ার ক্ষুরাঘাত তো চলছে তখন বুকে। চলছেই। ক্ষুরের আঘাতে বুকটা বিক্ষত হলেও মাটিতে দিব্যি দাঁড়িয়ে ছিল তারেক আগমুহূর্তেও। কিন্তু একটা কথার পর আর পারল না।
এই এই, থামাস না আমাকে। ওদের বাবার ঘটনাজানি না মনে করেছে নাকি ওরা? পালিয়ে মনময়পুর এসেছে কেন এ দুটো? মঙ্গার ভিক্ষুক! বাড় বেশি হলে হাঁড়িটা হাটে ভাঙব।কী,ভাঙব নাকি! এসব কি আর চাপা থাকে ভায়া? থাকেও না, রাখতেও নেই।
মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গিয়ে কাতরাতে থাকলো তারেক।আরো একবার উঠে দাঁড়াতে কত চেষ্টাই না করলো! সব ব্যর্থ হলো।
অন্যদিনের মতো সেদিনও কারখানায় বেশি সময় ধরে থাকল তারেক। একমনে করে গেলকাজ। কাজ করল, আরপ্রকৃতির কাছে প্রার্থনা করল; প্রার্থনা করল, আর কাজ করে গেল।
কী সেই প্রার্থনা? সমীর যেন আজ বাড়ি না ফেরে। সমীর যেন চোখের সামনে না পড়ে আজ।
নয়ত ইতোমধ্যে তারেকেরদুর্মূল্য অহম উপর্যুপরি আঘাতে ক্ষয় পাওয়ার, সঙ্গে বাবার নামে ওঠা পুরনো ভয়ানক ওই মিথ্যে অভিযোগ পুরোপুরি অনাকাক্সিক্ষতভাবে অস্থানে উথলে ওঠার অবিশ্বাস্য দুটি বাড়াবাড়িকে কেটে ফেলার খঞ্জরেরদুপাশের ধার পরীক্ষা চলবে আজ সমীরের ওপর! ছোট্ট সমীর ওই পরীক্ষার ভার নিতে পারবে না। ন্যুব্জ হয়ে পড়বে, ভেঙে পড়বে, মারা পড়বে। এমন এক বিক্রিয়া ঘটবে যার পেছনে ফেরার কোনো উপায় থাকবে না। যেমন পানীয় জল উড়ে গেলে তাকে ঘনীভূত করে আবার তরলে রূপ দেওয়া যায়, কিন্তু সরোবরে গিয়ে মিশলে তাকে আর পৃথক করা যায় না। যেমন চেতনা হারিয়ে গেলে অনুকূল পরিবেশে তা ফিরে পাওয়া চলে, কিন্তু তা প্রাণসমেত তা উধাও হলে গোটামহাবিশ্ব চষেও তার কোনো খোঁজ আর মেলে না।

সমীরের শেষ রক্ষা আর হলো না সেদিন।
কারখানা থেকে বেরিয়ে এখানে ওখানে আরও বহুক্ষণ সময় ক্ষেপণ করে অবশেষে যখন ঘরে ফিরে এলো তারেক। দেখল, সমীর না খেয়ে তখনো তার জন্য অপেক্ষা করে আছে।
বাইরের শীত শীত ভাব হয়েছে উধাও। ভাত একণ্ডআধটু ভিজে উঠতে শুরু করেছে তখন। ঢাকনা উল্টে দেখা গেল, পুরোপুরি নতুন করে চড়াতে হতো আরও কিছুক্ষণ দেরি হলে।
তারেককে ঘরে ঢুকতে দেখে সমীরের মন ভরে উঠল। সারাদিন যে ভর বুকের ওপর পাথর হয়ে চেপে বসে ছিল তা নামাতে পারে কেবল এই একটি মানুষ।তার ভাই। সলিলও পারতো। কিন্তু তার সামনে সমীর কী করে যাবে? কী করে তার কাছে তুলবে অতো বড় দাবি?বাকি থাকে কেবল সহোদর ভাইটি তার। একমাত্র এখানেই তার সম্বন্ধসূত্রটি যে কোনো অলিখিত শর্তেরও ঊর্ধ্বে।
সমীরের আগ্রহ নিয়ে তাকাল ভাইয়ের দিকে। অস্ফুটে ডেকেও উঠল। ওই ডেকে ওঠার মুহূর্তে টের পেল, ভাইয়ের মুখোমুখি হতেও অন্তর্জগতের কত পরীক্ষা উৎরে তাকে আসতে হয়েছে।
এতো দেরি করলে?
সমীরের কোমল প্রশ্নের সামনে নিরুত্তর তারেক। সমীরেরও জানার কথা নয়, গত রাতেও যে পিঠে হাত রেখে কথা বলেছে, আজ তার দেরি করে ঘরে ফেরার পেছনে সে কতখানি তীব্রতায় উপস্থিত।

তারেকের মারমুখী মন একটা কোনো সূত্র খুঁজছিল। সমীরের কথা বলে ওঠার মতো সূত্র আর কী হতে পারে? ধর ধর সুতোটাকে ধর! চড়াও হ, চড়াও!
তেড়ে এসে সমানে হাত চালাতে থাকল থাকল তারেক। জানালার পাশে একটা চেয়ারে বই হাতে বসে ছিল সমীর। তারেকের আচমকা আক্রমণে চেয়ারসহ কাত হয়ে পড়ে গেল। ঠিক তখন অসুস্থ উল্লাস যেন পেয়ে বসল তারেককে। সমানে হাত চলল, পা চলল, সঙ্গে চলল মুখ।
কারখানার বাতাসে ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নগুলো থেকেই শুরু হলো। একটির উত্তরও সমীরের ভেতর তৈরি ছিল না।
আর কী কী তুই চুরি করে এনেছিস যখন কেউ দেখেনি? বল, আর কী কী চুরি করেছিস! নিজে চোর হয়েছিস, আমাকেও চোর বানিয়েছিস! আর কী কী বল? বল? সব ফেরত দিতে হবে তোকে। সব পাই পাই করে ফেরত তোকে দিতে হবে। কোথায় কবে কখন কী সরিয়েছিস, সব ফিরিয়ে দিবি! সব! আর কবে কোথায় কখন। বল? যখন কেউ দেখে ফেলেনি যখন একেবারে তুই পাকা চোর! জারজ! তুই জারজ, তুই জারজ! একটা জারজ তুই! পাকা চোর! কেউ দেখেনি, কেউ দেখেনি আগে, না? কেন কেউ দেখেনি। কেন কেউ দেখেনি? যখন কেউ দেখেনি তখন? আর কী কী বল? আর কী কী! বলতে তোকে হবে। বলতে তোকে হবে তুই যদি আমার মায়ের ছেলের হোস। এটা বলতে তোকে হবেই!
পরম্পরাবিহীন কথাগুলো বলতে বলতে তারেকের কণ্ঠে কান্নায় অবরুদ্ধ হয়ে উঠল। চোখজোড়া এই ভিজছিল, এই শুকোচ্ছিল, এই ভিজছিল। এমন বিচিত্র রসায়নে তার হৃদয় আর কখনও বিষাক্ত হয়নি।
যে প্রশ্নগুলো করছিল ওসবের কোনও উত্তর আশাও করেনি তারেক। উত্তর তো তার জানাই আছে। এরপরও তার মগজে প্রশ্নটা একটা চক্র ধরে আবর্তিত হচ্ছিল। কারণ ক্রোধে তখন বাহ্যজ্ঞান তার হারিয়েছে।খুলির ভেতরটা লাগছে ভীষণ রকম ফাঁপা। যেন ওখানে মস্তিষ্ক নামে কোনও দ্রব্য নেই, কখনো ছিলও না।

সমীরের অবয়বটাও চোখের সামনে একবার সামনে এগিয়ে আসছে, এবার পেছনে সরে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন জলের নিচ দিয়ে সে দেখছে তাকে, তার এই ভাইটিকে। অথবা তার ভাইটি হয়তো এখন মায়ের গর্ভে। নয়ত এমন কুঁকড়ে আছে কেন?এমন করেই না উল্টো হয়ে কুঁকড়ে থাকে ছবিতে আঁকা মানুষের ভ্রুণ?
মগজের ভেতর একটা পাথর গড়াচ্ছিল। এই পাথরই ওই প্রশ্নের চক্রটাকে ভাঙলো। জন্ম হলো নতুন কথার।
কী করে আরও অবমাননা সমীরকে করা যায়, কী করে আরও মাটিতে তাকে মিশিয়ে দেওয়া যায়, সেই অসুস্থ বাসনা তারেকের ভূতগ্রস্ত মনকে আচ্ছন্ন করে তুলল। করে তুলল আরও বেপরোয়া। খানিক আগের দেওয়া জারজ গালটিকে এবার এক বিস্তৃত পরিণতি দিয়ে নতুন বাক্য নির্মাণ করল তার মগজ। বলিয়ে নিলো,
নিশ্চয়ই তুই আমার ভাই না। তোর নামেই তার প্রমাণ আছে!
কথা কটা বলবার আগে তারেকের মগজে রক্ত ছলকে উঠেছিল। ওর হৃদয় বলে উঠেছিল, এটা কেমন কথা! আগপিছ কিছু ভেবেছিস? বলিস না, এটা বলিস না মন!
হৃদয়ের কণ্ঠ যে পায়েমাড়ালো সে বহুদিনের অবদমিত ক্রোধ। আরো এগিয়ে বলে উঠল তারেক,নিশ্চয়ই তোকে কোনও চোরের ঘর থেকে আমার বাপণ্ডমা কুড়িয়ে এনেছে।
এটুকু বলার পর তারেকের ভেতর থেকে বাধো বাধো ব্যাপারটা উধাও হয়ে গেল। সে হয়ে উঠল আরও দুঃসাহসী, দুর্বিনীত, নির্দয়। তার ওপর যেন খোদ তার শয়তান তখন ভর করেছে।

নয় যুদ্ধে ভারত পালিয়ে যাওয়ার সময় তোকে কারা রেখে গেছে। চোরের ঘরে তো আর বড় হসনি। নিশ্চয়ই মিশেছিস সব চোরের সঙ্গে এরপর। আর সত্যি সত্যি তুই যা, তাই হয়েছিস। নির্ঘাৎ! আর যেটা করতিস সেটা ভান। এখন আমি বুঝলাম। ডাহা ভান। অভিনয় করতিস। ওই টিয়ারা এতোদিন যা বলতো সব নিশ্চয়ই সত্যি। সত্যি না হয়ে যায়ই না। উঁহু, একদম না!

এরপর হঠাৎ, যেন এর আগে রহস্যে ঢাকা ছিল আর এই মাত্র চোখের সামনে থেকে পর্দাটা সরে গেছে, এমন আবিষ্কারের বিস্ময়মাখা আনন্দে অভিভূত তারেক বলে উঠল, তাই তো! তাই তো বলি, চোর কোথাকার, তোরণ্ডআমার চেহারা কেন আলাদা! নাম কেন আলাদা রকমের। চেহারা আলাদা, নাম আলাদা, আর কোনও প্রমাণের কি দরকার আছে? এবার বুঝেছি! তুই কুড়ানো। তাই বুঝি ভোলানোর জন্য মা যেন তোকে বেশি আদর করত! আদর দিয়ে ভুলিয়ে রাখতে চাইত। ভুলে থাকত চাইত। কিন্তু এভাবে আদর দিয়ে কি আর স্বভাব বদলানো যায়? সম্ভব! জন্মের স্বভাব বদলানো যায়? যায় না। কখনও না। মা, তুমি এসে দেখে যাও, কাকে তুমি বেশি আদর করতে। সে তোমার আদরের কী মূল্য দিয়েছে এখন। সুযোগ পেয়েই ছোবল মেরেছে। এভাবেই! ঠিক এভাবেই সব বেরিয়ে পড়ে, পড়তেই হয়।

এরপর কিছু বাক্য ক্রমাগত জপে গেল মস্তিষ্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো ব্যক্তির মতো। জপতেই থাকল। এসব কোনকালে কে চাপা দিতে পেরেছে? বেরিয়ে পড়েই। বেরিয়ে পড়তেই হয়। না পড়ে যায় কোথায়। চোরের দশদিন গেরস্তের একদিন। ঘুঘু! ঘুঘু একদিন ধরা পড়েই। আর সেদিন সে মরে। তুই মরবি। তুই মরে যাহ। তুই মরে যাস না কেন? মরে যা তুই! তোর মৃত্যু হোক। তোর কঠিন মৃত্যু হোক! তোর কঠিন মৃত্যু হবে, কঠিন মৃত্যু।
এতোক্ষণ কথাগুলো বলতে বলতে তারেকের হাত কখনও চলছিল, কখনও চলছিল পা। আর মাটিতে কুঁকড়ে পড়ে ছিল সমীর। নিশ্চুপ, নিথর।
প্রথম প্রথম চোখ ফোটে জল এসেছিল। শরীরের মারে নয়, অন্তরের মারে। একসময় বন্ধ হলো জলের নিঃসরণ।

শুকনো চোখে পড়ে পড়ে মার খেতে থাকল সমীর। হাত তুলে ঠেকাল না। প্রত্যুত্তর করল না একটা কথারও। তার সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ মন তখন এক ধরনের কাল্পনিক সুখে আক্রান্ত। ক্ষণিকের জন্য সে ভেবেছিল, এই যে পড়ে পড়ে মার খাচ্ছে, এর ভেতর দিয়ে বড় ভাইয়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার যে প্রকাশ সে দেখাচ্ছে, তাতে দূর থেকে দেখতে নিশ্চয়ই সুন্দর দেখাচ্ছে ভীষণ! যদি জানালা দিয়ে কেউ এসে দেখে যায়! কেউ একবার এসে দেখে অনুভব করে তাদের মধ্যকার সাম্পর্কিক রসায়ন, কী চমৎকারই না হবে।

পরক্ষণেই আবার নিজের এমন কল্পনাবিলাসের বালখিল্যতা টের পেয়ে সে পড়ে থেকেই লজ্জিত হলো। আর মার খেতে থাকল।বুঝে নিলো,ভাইয়ের করা প্রশ্নগুলো যে অবান্তর, এসবের উত্তর যে তার বিশ্লিষ্ট মনের চেয়েও ভাইয়ের মনেই বেশি গোছানো রূপে আছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাকে আঘাত করতে গিয়ে ভাইয়ের মনের দেহ আঘাতে জর্জরিত হচ্ছে আরও বেশি। যে কথাগুলো ভাই তাকে বলছে, ওসব কথার মর্ম ভাইয়ের চেয়ে ভালো আর কে বোঝে?

আর সবচে যা বড়, ভাই যে নিবিঢ় বেদনাবোধের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তা থেকে মুক্তি পেতে যে ধাক্কাটা এ মুহূর্তে বড় প্রয়োজন, তা সমীর কেবল এই একটিমাত্র পন্থাতেই দিতে পারে। চলুক! আর অপরাধ তো করেছেই। যা করেছে, তার শাস্তি নেবে না? দেবেটা কে? ভাইয়ের চেয়ে যোগ্য আর কে আছে এই শাস্তি দেওয়ার?

তারেক যতো শরীরে, মনে আঘাত করতে থাকল, ততোই সব প্রাপ্য জ্ঞান করে অপরাধের ভার থেকে সমীর মুক্তি পেতে থাকল।  হঠাৎ নিজেকে সরিয়ে নিল তারেক। ক্ষোভ প্রকাশের পাশবিকতার চূড়ায় ওঠার পর এবার তার আত্মোপলব্ধির সময় কাছিয়ে এলে তার প্রাকপ্রস্তুতি হিসেবে সে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে থাকল তার বাক্যে। এটুকু ঠিক থাকল। কিন্তু কণ্ঠের জোর ক্রমেই কমে আসছিল আরো আগ থেকে। এবং ওই সরে আসার মুহূর্ত থেকে সেই জোর একেবারেই নিঃশেষ হয়ে গেল। কণ্ঠের জোর নিঃশেষ হলো, সেটুকু ঠিক আছে। কিন্তু ক্রোধের তখনো আরো কিছুটা নিঃশেষ হতে বাকি। সেটুকুর জন্যে এবা পরবর্তী সলতেটা চাই।

জানালার কাছে টলতে টলতে সরে এলো তারেক। জানালাটা খোলা। সপাটে কবাট আছড়ে বন্ধ করে থম মেরে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। কপাট বন্ধের শব্দটাই হলো ওই সলতে।

হায়, এই ভাইকে আমি আগলে রেখে তিল তিল করে বড় করেছি! আজ তারজন্যই আমার কী অপমান, কী অপমান! লোকে এখন আমাকেও, এই আমাকেও চোর সাব্যস্ত করতে দুই বার ভাবছে না। এই আমাকেও লোকে চোর ভাবতে ছাড়ছে না। কারখানার কাজে ডুবে থেকে দুঃখ ভোলা আর হলো না আমার, হলো না। আজকে আমার দিকেও সন্দেহের আঙুল তুলল, আমার দিকেও। চোখ তুলে তাকাতে পারত না যারা, তারাও আজকে বলে গেল, শুনিয়ে গেল। বাপ তুলে কথা বলে গেল! ওরা বাপকে তুলে কথা বলে গেল। সব নাকি জানে। ওরা নাকি সব জানে! জানবেই তো! বলবেই তো। কারণ আমার সাধের ভাইটি হয়ে উঠেছে পাকা চোর! তাকে দুপয়সার পকেট ট্রান্সফর্মার চুরি করতে হয়। দুপয়সার একটা জিনিসের জন্য তাকে চুরি করতে হয়। চুরির কথা তার মনেণ্ডদিলে আসে।

কোনওদিন তো একবার বললি না! প্রথমবারের মতো সরাসরি সমীরকে উদ্দেশ করে বলে উঠল তারেক। ক মুহূর্তের বিরতি। চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছিল। আবারো বেরিয়ে এলো ফেটে। একটা শান্ত, নিচে ধরে থাকা স্বরে কাঁদতে শুরু করল তারেক।কেঁদেই গেল, কেঁদেই গেল। কান্নার শব্দে মুখ তুলে তার দিকে তাকাল সমীর। ঘরের ষাট ওয়াটের আলো তার ভেজা গালে প্রতিফলিত। বাহুতে ভর রেখে ধীরে উঠে বসল মেঝেতে। চেয়ারটা পাশেই উল্টে পড়েছিল। ধরল তার একটা পায়া। তাকে উঠে বসতে দেখে আবারউষ্ণ হয়ে উঠল তারেক। এবার আর পাথর বর্ষণ নয়। বরং অবিরত ঝর্ণা।

কোনোদিন তো একবার বলিসওনি তোর এই তুচ্ছ জিনিসের মতোএকটা জিনিস তোর লাগবে! আমি, এই আমি, তারেক, তোর ভাই, তোকে এটা বাম হাতে বানিয়ে দিতো! তোকে বাম হাতের কড়ে আঙুল দিয়ে বানিয়ে দিতো এরকম একশ পকেট ট্রান্সফর্মার। তা না করে, না বলে, চোর হওয়া তোর পছন্দ হলো? চোর হওয়াটা তুই বেছে নিলি? ছিহ্, ছিহ্, এই করলি? এতো পড়লি, আর এই করলি? এতো পড়লি তুই এতো পড়লি, আর এই হলি?

সমীর এতোক্ষণের অতি কটু কথায়ও বিচলিত হয়েছে, কিন্তু নিজেকে হারিয়ে ফেলেনি। তাই চুপ করে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। এতোক্ষণ পরিণত জায়গায় আঘাত পড়ছিল বলে সয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল। কিন্তু ভাইয়ের শেষ কথাটা সম্পূর্ণ নতুন জায়গায় আঘাত করে বসল। তার জীবনের এই বাঁকটাকে সে খুব ভালো বেসে ফেলেছে। চেতনার নতুন যে শরীর গড়ে উঠেছে তা তখনো কাঁচা। তাই তাতে জীবাণুর আক্রমণ ঘটেছিল অতো সহজে। শরীরটা তো আগে থেকেই নাজুক হয়ে ছিল। তাই এই দফায় ভাইয়ের আঘাত আর সইতে পারল না। মুখটা তার ব্যথায় বিকৃত হয়ে উঠল। ভাবলো একটা বার অন্তত প্রতিবাদ করে। এই প্রতিবাদ না করা হলে তার ভাই একটা কথাই জপতে জপতে মারা পড়বে। চক্রে পড়ে যাবে, উন্মাদ হয়ে যাবে।  ভাইয়ের মুখের ওপর থেকে চোখ সরেছে, তাই এবার মন পড়েছে মনের চোখ। উদ্বাস্ত এ জীবনে দুটি ভায়ের যাপনস্মৃতি ভেসে ওঠায় সমীরের চোখ দুটো হয়ে উঠল সজল, বাক্সময়।

বড় ভাই, এতোটা নিচে আমাকে নামাবেন না দোহাই লাগে। আর যাই বলুন, চুপ করে শুনতে রাজি আছি। আমাকে যখন এমন পিষে কথা বলেন, আমার চেয়েও বড় কষ্ট আপনি পান। আমি জানি তো ভাই। এতো নিচে নামিয়ে উল্টো আপনিই কষ্ট পাচ্ছেন।নিশ্চয়ই আপনি আরো অনেক বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। আপনি একটা কথাই বলছেন বারবার। একটা কথাই বারবার আপনি বলছেন। আপনি তো মারা যাবেন। এভাবে বলতে থাকলে আপনি মারা যাবেন ভাই। আমি তো মরব। কবুল করলাম। খুব খারাপভাবে আমি মরব। আপনি কি বাঁচবেন?

আমি তো আমার মন জানি। আমার মন কিভাবে ওই কথা, ওগুলো সরানোর কথা ভেবেছিল, ভেবে আমি লজ্জায় মিশে যাচ্ছি এখন। আমি শুধু একটা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম। তার জন্যে ওগুলো কেনার দরকার ছিল না তো, হাহা। এ কাজে খরচের টাকাই বা কই। আর আমি নিজের কাজের জন্য চেয়েছি জানলে ওগুলো ওরা দিতো না। মকবুল ভাই আমাকে যতো ভালোই বাসুক, দিতো না নিশ্চিত। তিনি তো চকরমাত্র।তার ওপর এতোরকম প্রশ্ন করত, আমার ভালো লাগতো না। তাই ভেবেছিলাম আমার পরীক্ষাটা করেই আবার ওখানে রেখে দেবো। আমার মনে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু যার মালিক আমি না, তাতে নাণ্ডবলে হাত দেওয়াই অসৎ কাজ হয়েছে। উদ্দেশ্য তো কাজের আগে। ওটা শুদ্ধ। কাজটায় হয়েছে গোলমাল। কিন্তু এরপর কী হলো?

ভাই, আমি ভাবতেও পারি নাই আমার এতো শত্রু কারখানায়। আমি জানতাম সবাই আমার বন্ধু। কারণ কখনো কারো জন্য বুক পেতে দিতে দেরি করি নাই। নিজের জিনিস বিলিয়ে দিতে, কারো হয়ে খাটতে, জরিমানা গুনতে আমি দুইবার ভাবি নাই। খাটার পর, দেওয়ার পর আমার মাঝে মধ্যে খারাপ লেগেছে। মনে হয়েছে যে, কী করে! কী পেলাম। পরে ভাবলাম, ধুর, এটাই তো আমার ধাঁচ। এটাই আমি করব। আক্ষেপ কী। আমি ভাবতেও পারি না কারখানায় আপনাকে কেউ অপছন্দ করতে পারে। আরো ভাবনার বাইরে যে আপনাকে কেউ দোষ দিতে পারে। শ্রমিকদের কে আপনার কাছে দৌড়ে আসে নাই যখন বিপদে পড়েছে? আব্বাকে নিয়ে পর্যন্ত এখন কথা শোনাতে পারে। আসলে ভেতরে আমাদেরকে সবাই কেন জানি, এখনো জানি না, আমাদেরকে খুব ঘৃণা করেছে। আমি জানি না আব্বার ব্যাপারে এরা কিভাবে জানলো, আর কীই বা জানে। কিন্তু একটা শুধু সুযোগের অপেক্ষায় ছিল এরা, এটা বোঝা গেল ভাই।

তবে, আরেকটা জিনিস আমি পেলাম। আরেকটা বিষয় আমি বুঝলাম। কারো আচরণে কিন্তু কোনো অস্বাভাবিকতা নাই। আমি পাই নাই। আমাকে সলিলদা বলেছিল একদিন, দেখো ভাই, সবই মানুষের আচরণ। সলিলদাও এ কথা শুনেছিল তার এক বড় ভাই জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে। জাহাঙ্গীর নামে ওই ভাইয়ের সঙ্গে সলিলদা একদিন রাগ করে উঁচু গলায় কথা বলে ফেলেছিল। পরে ক্ষমা চাইতে গিয়েছিল যখন, তখন জাহাঙ্গীর বলেছিলেন ভাইকে কথাটা; সবই মানুষের আচরণ।

ভাই, কিছুই আর আমি অবিশ্বাস করি না। মানুষের ওপর থেকে আমার দাবি আমি সরিয়ে নিয়েছি। আমাকে সলিলদা শিখিয়েছে, কিভাবে করতে হয় এমন। আমি শিখেছি দাবি সরালে ভালো করে কাজ করা যায়। তখন মানুষ আপনিই প্রভাবিত হয়। কারণ মানুষ রোদের ভেতর ছায়ায় দাঁড়াতে ভালোবাসে। এই এটুকু কথা দিয়ে শুধু মানুষ না, গোটা প্রাণিকূলের আচরণ ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু আজকে বলতেই হবে ভাই, আপনার মতোই সলিলদাও বহু কিছু অপাত্রে ঢেলেছেন। আপনার মতোই। আমি শুধু নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না।

আসলে, একটা কেমন করতেই হবে ভাব আমার ভেতর ঢুকে গিয়েছিল এমনভাবে যে কী বলব, কোনো দেরি সহ্যই হচ্ছিল না। কিন্তু সবকিছুরই একটা সীমা আছে। আর আমি সীমা ছাড়িয়েছি। আপনি তাই এতো কিছু বললেন আমাকে। এসব আমি প্রাপ্য হিসেবে মেনে নিয়েছি। তাই আমার ওপর কোনো অত্যাচার হয়েছে বলে মনে হয় নাই। কিন্তু ওই পড়াটাকে যদি এটার সঙ্গে মেলান, তো সত্যিই ভাই, এটা অত্যাচার হবে। এই অত্যাচারটা আমার ওপর আপনি করবেন না। এটুকু দয়া আমি চাই। ভাই। এছাড়া আপনি যা বলতে চান বলে যান। আমি কান ফেলে শুনছি। এরপরও কথা আছে, যে জানালার কবাট তারেক সশব্দে লাগিয়ে দিয়েছিল, ওটাই আবার খুলে দাঁড়াল। বাইরের তাজা বাতাস এসে ওর চোখের জলে ভেজা গালে পরশ বোলাতে থাকল। শীতলতার আরামদায়ক চাদর তাকে জড়িয়ে ধরল। তার অন্তর্গত নিথর পশুটির পাপবোধকে ওই চাদর ভালোবেসেছে। তার অনুক্ত অনুতাপকে আমলে নিয়েছে।

সমীরের কথাগুলো তারেক শুনছিল আবার শুনছিলও না। দারুণ এক ঘোরের ভেতর থেকে অস্বচ্ছ চিন্তার দেয়াল বহু কষ্টে ঠেলে একেকটা সিদ্ধান্তে তাকে পৌঁছতে হচ্ছিল। ওদিকে মরিয়া হয়ে ওঠা সমীর ভাইয়ের এই আপাত নীরবতাকে অনুধাবনকাল বলে অনুমান করল। তাই প্রাণপণে চাইল কথার অবিরতি রক্ষা করে যেতে।  আমাকে আরও কিছু বলার কি বাকি আছে বড়ভাই? আরও কিছু বলার প্রয়োজন কি আছে? এখনও কিন্তু এখানে পাপ নির্লজ্জভাবে বাসা বাঁধতে পারে নাই। হাতটা বুকে রাখল সমীর। জানালার পাশ থেকে হটে এসে হঠাৎ এক লাথিতে এ কথাকে উড়িয়ে দিলো তারেক। চিৎকার করে বলতে থাকল, তেমন হলে তুই ভাঁড়ার ঘরেই কেন আবার ফিরিয়ে দিয়ে এলি না।

এই কথার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল কালো ক্রোধের অবশেষ। আবার শুরু হলো বেদম মার। এবার সমীর হাত দিয়ে মার ঠেকাতে লাগল মেঝেতে পাক খেতে খেতে।আবার ওই অবশ কল্পনা শুরু হলো। জানালা দিয়ে কেউ যদি একবার দেখত, এই দৃশ্যের গভীরতা হয়ত তার মনে আজীবনের ছাপ ফেলত! একইসঙ্গে তারেকের প্রশ্নটার উত্তরও সে দিতে চাইলো। কিন্তু তাকে বিভ্রান্ত করে যথাযথ উত্তরটা কিছুতেই মনে পড়তে চাইলো না এবার।

এতো কথা মনে পড়ছে! কিন্তু সমীর জানে, এসবের একটির প্রভাবেও সেদিন জিনিস দুটি জঞ্জালের নিচে সে রেখে আসেনি। মনের ভেতর হাতড়াতে হাতড়াতে অবশেষে দেখতে পেল উত্তরটিকে। এক গোপন লাল ভীতি বুকে আঁকড়ে ধরে একটা শিশুর মতো গুটি সুটি হয়ে বসে আছে সেই উত্তর। আর ভয়ার্ত চোখে থেকে থেকে তাকাচ্ছে দিকে। উত্তরের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো সমীর। কিন্তু উত্তর তার ওপর আস্থা রেখে পাল্টা হাত বাড়াল না। সমীর এবার মরিয়া হয়ে খামচে ধরল উত্তরের হাত, টান দিয়ে নিয়ে এলো নিজের কাছে। এরপর রওনা হলো দক্ষিণের উদ্দেশে।

বাইরে তখন উন্মাদের মতো তাকে পিটিয়ে চলেছে তারেক দ্বিতীয়বার। মুখে ওই একটিই বাক্য, যেন এর কোনও উত্তর সে চায় না। অনন্তকাল ধরে প্রশ্নটিই শুধু করে যেতে চায়। সমীর ওই ভীত সন্ত্রস্ত উত্তরটিকেই এবার ছুড়ে দিলো। জবাবটা তার নিজেরও মনোপুত হচ্ছিল না, কিন্তু আবার অস্বীকারও করতে পারছিল না যে এটিকেই তো তার মনের গোপন কোণে লুকিয়ে থাকতে দেখেছে। প্রবলভাবে মনে হচ্ছিল, এটাই, এবং এটাই একমাত্র কারণ। আর এটিকে কারণ হিসেবে দাঁড় করানোর অধিকারআদায় করতে হয়েছে তাকে পেরিয়ে আসতে হয়েছে দীর্ঘ অতীত। দীর্ঘ রক্তাক্ত অতীত।

তারেকের উদ্যতসচল পা ধরে ফেলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সমীর বলে উঠল, শুধু মনে হচ্ছিল কারখানার বাঁশিটা কখন নাণ্ডজানি বাজে! পরমুহূর্তে পা ছেড়ে ধেয়ে আসতে থাকা মুঠোও করল তালুবন্দি।হাতে এ দুটো নিয়ে কী করব বুঝতে পারলাম না ভাই! এখনই সবাই হৈ হৈ করে বেরোতে শুরু করে করবে, আসা যাওয়া বেড়ে যাবে অনেক। পাছে কেউ,মনটা খুব দুর্বল হয়ে ছিল, খুব। পাছে কেউ দেখে ফেলে তাই সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়েই ওটা রাখলাম, তাই না? হাত ছাড়!

কী করি আমি তখন? ওই জঞ্জালের নিচে লুকিয়ে রেখে আজকের জন্য, কালই ফেরৎ দিয়ে আসা যাবে। এমন কথা কে যেন বলল কানে। ওটার চেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত ওই সময়ে আর কিছুই মনে হয়নি আমার। বিশ্বাস, বড় ভাই! ভাঁড়ারে ফেরত দিয়ে আসার মুখ ছিল না। কারণ এগুলো আমি দেখিয়ে আনি নাই। বুঝতে পারলেন ভাই? দেখিয়ে যা আনি নাই, খাতায় যার নিবন্ধন নাই, তা নিয়ে যাই কী করে? ভেবেছিলাম আজকে এটা কোনক্রমে লুকিয়ে রাখি। কালই দিয়ে আসব। কিন্তু পরদিন গিয়ে দেখি সর্বনাশ হয়ে গেছে। সবদিক থেকেই সর্বনাশের পথ আমি করে এসেছিলাম। তারেক মারে ক্ষান্ত দিয়ে স্থির দাঁড়াল। তার এতোক্ষণের চিৎকার আবার কান্নায় পরিণত হয়েছে।

আর সেই যে নিজের দিকে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল জানালার পাশে দাঁড়িয়ে; সে আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তি খুঁজে বেড়াচ্ছিল, দুর্বল সেসব যুক্তিকে মনে স্থানও দিতে পারছিল না বলে শেষতক সমীরের সঙ্গে তার আচরণকে অপরাধ হিসেবেই গণ্য করে চলছিল; এক মনের সঙ্গে দশ মনের বিরোধে, দশ মনের সঙ্গে এক দ্বৈরথে তার ব্যক্তিত্বে ধস নামলে থামলো সে যাত্রা।

ঝড়ের তাণ্ডব প্রাণির জগৎকে সংহার করার পর ক্লান্ত হয়ে শক্তির রূপ বদলে যেমন পৃথিবীর বুকের ওপর ভারী বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়তে থাকে, তেমনই সমীরকে বলা শত কথা তারেককেই আঘাতে আঘাতে জর্জরিত ক্লান্ত করে মেঝেতে ভাইয়ের ওপর আছড়ে ফেলল।

সমীরের স্থির দেহটাকে আঁকড়ে ব্যকুল কান্নায় ভাসল তারেক। হায় হায় ভাই, তোকে এসব আমি কী বলেছি। আমার মাথার ঠিক নেই ভাই! তুই আমার মায়ের পেটের ভাই। তুই না, আমি, আমিই সব খারাপের মূল। আমিই তোর দিকে কোনও নজর করতে পারি নাই। কারখানায় কাটিয়েছি, বাড়তি সময় খেটে গেছি বিনা কারণে। এদিক ওদিক ঘুরে সময় নষ্ট করে দেরি করে বাসায় ফিরেছি। তুই খাবার নিয়ে অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে গেছিস। আমাকে মাফ করে দিস ভাই। আমি দেরি করে এসে শুয়ে পড়তাম, ভাত পচত হাড়িতে; নিজের কী চিন্তায় থাকতাম জানি না রে ভাইটা, তোর যে খাওয়াই হয়নি সে কথা মনেই আসত না আমার! এরপরও তুই কোনওদিন আমার ওপর রাগ করিস নাই। কোনও দিন বড় ভাইয়ের কাছে কিছু চাস নাই। সবসময় নিজে যতটা পারলি, করলি। না পারলে ভুলে গেলি। ওরা তো বলে আমি নাকি ভালো কাজ জানি, কই, কোনওদিন কি কিছু তোকে শিখিয়েছি আমি? মনে পড়ে না। এই যে এতো বইপত্র, তুই নিজে জোগাড় করলি, নিজের আগ্রহ থেকে কত কিছু বানালি, আমার কাছ থেকে কী আর পেয়েছিস তুই।আমার মেধাবী ভাইটা, কত ভালোবাসি তোকে, কিন্তু নিজেই তা ভুলতে বসেছিলাম। নিজের ভেতর এমনই ডুবে ছিলাম যে তুই যে একটা মানুষ, তোরও যে আলাদা দুঃখ কষ্টের মন আছে, কোনওদিন তার তোয়াক্কা করিনি। আমার নিজের কী এতো দুঃখ হ্যাঁ? বলতো? এতো কিসের দুঃখ! আমার তো উচিৎ ছিল নিজের দুঃখ যদি থাকেও, এতোটুকু আঁচ তোকে পেতে না দেওয়া। তোকে সময় দেওয়া। নয়ত আমি কিসের বড় ভাই। কেমন বড় ভাই, বলতো? বলতো আমাকে? এই আমার, প্রথমবার তোর কথাটা শুনে তো আমার এতোটুকু গায়ে লাগেনি! নিজের গায়ে লাগেনি! তোর জন্য আমার করুণা হয়েছিল। দ্যাখ, কত অধঃপতন হয়েছে তোর এতো সাধের বড় ভাইটার। তোর এই ঘটনার কথা শুনে আমি প্রথমে তোর ওপর করুণা করেছিলাম। আহা ছোট ছেলে। ভেবেছিলাম, তাতেই বুঝি বোঝা গেল তোকে ভালোবাসি আমি! হায়, যখনই এটা আমার ওপরও এলো, আমাদের পালিয়ে আসার কথা, আমাদের পরিবারের কথা উঠল, যে মিথ্যা অভিযোগ বাবার বিরুদ্ধে, সেই অভিযোগটা উঠল;আচ্ছা, কারা এসব ছড়ায় রে! উঠল যখন চমকে উঠলাম। আমি তো জানতাম না এসব এখানে কেউ জানে, জানতে পারে। ক্ষেপে উঠলাম! আমার নিজের আত্মসম্মানবোধ আসলে কি এতোই তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে তুই বল? লোকে বলল আর অমনি আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল? এটা কি কোনও ভালো মানুষের হয়? হওয়া উচিৎ? না, উচিৎ না। আমি খারাপ, এই আমিই সব খারাপের মূল। তুই আমাকে ক্ষমা কর ভাই, ক্ষমা কর! তুই আমাকে ক্ষমা কর। আর না, তুই আমাকে কোনোদিন ক্ষমা করিস না।

তারেকের বুক ভেঙে যেতে থাকে ছোট ভাইটির সঙ্গে হাজারও স্মৃতির ভরে।
সমীর এতোক্ষণে তার ধৈর্য্যরে পুরস্কার পেতে থাকে আর নিজেকে শোনায়, দেখেছ? তোমার ভাইকে তোমার চেয়ে ভালো আর কে চেনে?
ভাইকে সবলে আঁকড়ে ধরে সেও। এভাবে বহুক্ষণ দুজনে চুপচাপ ঠাণ্ডা মেঝেতে পড়ে থাকে দুজন।
বাইরে রাত যখন গভীর হতে থাকে ক্রমশ, মাটির নিচ থেকে বোরোয় জলবাষ্প; বাতাসের স্থির কুয়াশা তখন ঝুলে থেকে আর রহস্য ছড়ায় আর গোটা গ্রামটাকে দেয় অতিলৌকিকতার পাঠ। সেই দিব্য পাঠদান আর গ্রহণ চলতে থাকল জানালার বাইরে।
যেটুকু দোষ স্বীকার তারেক করেছিল তার বিপরীতে আরো বেশি গ্লানি জমা ছিল তার বুকে। ওই গ্লানির অংশ ছোট ভাইয়ের ওপর চাপাতে গিয়ে বিবেকে ঠেকে গিয়েছিল তারেকের, পারেনি। কিন্তুগ্লানিটুতু আঠালো পাপ হয়ে আরও কতশত পাপচিন্তাকে টেনে আনছে ক্রমশ, সে কথায় যখন শঙ্কিত হয়ে উঠল তারেকের অবচেতন মনন, তখন আর কারও ওপর ওই গ্লানি চাপিয়ে দেওয়ার কথা দ্বিতীয়বারের মতো ভাবল তারেক অবচেতনে। এবং পেয়েও গেল।
তারেকের সচেতন মন এর কিছুই জানতে পারল না।
তারেক জানতেও পারল নাওটুকু গ্লানির দায় গোপনে কখন সে সলিলের ওপর আরোপ করে ফেলেছে।
সূত্র হিসেবে কাজ করেছে সলিলের সঙ্গে সমীরের সম্পর্ক।এই সম্পর্কের সুতোটা ধরেই তো সমীর শেষতক এমন এক কাজের দিকে এগিয়েছে। যে কাজের সঙ্গে ওই সম্পর্কের নিকট কোনও সম্পর্কও নেই। তারেকের চেতনায় যখন পৌঁছুল ওই বার্তা, যথষ্ট যুক্তিযুক্ত হয়ে ওই আরোপণটা ধরা দিলো। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল তার।

ভাইকে ছেড়ে সোজা হয়ে বসল তারেক। বড় করে শ্বাস বুকে টেনে উঠে দাঁড়িয়ে দরজা খুলল ধীরে। বাইরের করিডোরে কোমরসমান উঁচু সীমানা দেয়ালের ওপর হাতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল এভাবে বহুক্ষণ। মাটির দিকে তাকিয়ে তার ভেজা চোখজোড়া। এক মুহূর্তের জন্যে ভেসে উঠল কিছুক্ষণ আগের দৃশ্যটা, সমীর শরীর কুঁকড়ে পড়ে পড়ে মার খাচ্ছে। যাকে চাইলেই মারা যায়, তাকে মারার পর অশান্ত মনের সংগ্রামটাও হয় বড়। নেচে উঠল চোখের গ্রন্থি। দেয়ালের ওপরের তলটা তাই আবার তিন ফোঁটা জলে উঠল ভিজে।
বালু আর তৃষ্ণার্ত পোড়া মাটির স্থাপনায় সেই জল মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন হলো।

চলবে…

কারখানার বাঁশি-১৪॥ হামিম কামাল

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন