লিউ শিয়াবোর শেষ প্রেমপত্র | চিন্তাসূত্র
৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ১৮ নভেম্বর, ২০১৭ | সকাল ১০:৩১

লিউ শিয়াবোর শেষ প্রেমপত্র

লিউ শিয়াবো (২৮ ডিস্বের ১৯৫৫—১৩ জুলাই ২০১৭)

লিউ শিয়াবো একজন চাইনিজ সাহিত্য সমালোচক, লেখক, কবি ও মানবাধিকারকর্মী। তিনি ১৯৫৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর চীনের জিলিনে জন্মগ্রহণ করেন। ২০০৮ সাল থেকে চীন সরকার তাকে কারাবন্দি করে রাখে। তিনি ২০১০ সালে সাহিত্যিক হয়েও শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন।  ২০১৭ সালের  ১৩ জুলাই লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬১ বছর।

কারাবন্দি হওয়ার পর থেকে অর্থাৎ দীর্ঘ ৯ বছর লিউ শিয়াবো ও তার স্ত্রী লিউ শিয়া একে-অন্যের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন। মৃত্যুর মাত্র ৮ দিন আগে লিউ শিয়াবো তার স্ত্রী লিউ শিয়ার উদ্দেশে একটি চিঠি লিখে যান। চিঠিতে তিনি স্ত্রীকে ‘Xiami’ বলে সম্বোধন করেছেন, যার অর্থ ‘ছোট চিংড়ি’ বা ‘কুচোচিংড়ি’। এছাড়া লিউ শিয়াকে ‘G’ বা ‘জি’ নামেও সম্বোধন করেছেন। লিউ শিয়াবোর স্ত্রী লিউ শিয়াও একাধারে কবি, চিত্রকর ও চিত্রগ্রাহী। তাই তিনি তার স্ত্রীর সৃজনশীল কর্মগুলো নিয়ে একটি প্রদর্শনী করতে চেয়েছিলেন, যা করে যেতে পারেননি, চিঠিটিতে এই বিষয়টিও উঠে এসেছে। বিশ্লেষণধর্মী ওয়েব মিডিয়া কোয়ার্টজে(Quartz) চিঠিটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়, সেখান থেকে পত্রটি চিন্তাসূত্রের জন্য অনুবাদ করেছেন মোস্তাফিজ ফরায়েজী

প্রিয় Xiami
সম্ভবত আমার প্রশংসা এতটা বিষাক্ত হবে, যা তুমি ভুলতে পারবে না। নিষ্প্রভ একটি বাতির নিচে তুমি আমাকে জীবনের প্রথম কম্পিউটার উপহার দিয়েছিলে, মনে হয় সেটা পেন্টিয়াম ৫৮৬ছিল। ওই সাধারণ ঘরটিতে আমাদের ভালোবাসার উষ্ণতা এখনো পড়ে আছে।

তুমি তো আমার ওই কবিতাটি পড়েছ, যেখানে আমি কুচো চিংড়িকে (লিউ শিয়া) অযৌক্তিকভাবে বর্ণনা করেছি। সে আমার জন্য কনজি রান্না করতে করতে বায়না ধরেছিল, আমি যেন ছয় মিনিটের ভেতর পৃথিবীর সেরা স্তব রচনা করি।

নিষ্প্রভ বাতি, একটি তুচ্ছ ঘর, একটি চায়ের টেবিল তাকে অলঙ্কৃত করে রেখেছিল। সঙ্গে কুচো চিংড়ির অসম্ভব বায়না। ওই জিনিসগুলো একত্র করে তারকারাজি ও পাথরস্তম্ভের মতো সুন্দর হয়েছিল, যেগুলো নিখুঁত সন্ধি খুঁজে পেয়েছিল।

এরপর থেকে, তোমার স্তুতিগান আমার স্তবক হয়ে গিয়েছিল, এটা অনেকটা একটি মেরু ভাল্লুকের প্রবল তুষারপাতের ভেতর শীতযাপনের মতো।

একটির পর একটি পাখি আমার দৃষ্টিসীমা অতিক্রম করেছে। আমি সারাজীবন পাখিগুলোকে উপভোগ করেছি অথচ একসময় ওই পাখিগুলোই আমার উপলব্ধিতে খিল দিয়েছিল। কুচো চিংড়ির কবিতাগুলো শীতল ও তামসী, অনেকটা তার সাদা কালো ছবির মতো। উন্মত্ত শিশুরা উন্মুক্ত বক্ষে উড়ন্ত ধোঁয়ার সম্মুখীন হয়। একজন বোকা লোককে কালো কাপড় দিয়ে আবৃত করা হয়েছে। এটা যিশুখ্রিস্টের পুনরুত্থান থেকে উৎসাহিত না কি ম্যাকবেথের ডাইনিগুলো থেকে? না, কোনোটাই নয়। এটা শুধু কুচো চিংড়ির সৃজনশীলতার কৃত্রিম বনভুমির ভেতর একটি একাকী বৃক্ষপত্র, বিষণ্ন দিগন্তের একটি ধুলোময় সাদা পদ্ম, যা মৃতদের আত্মার প্রতি বিসর্জিত।

দুঃখের বিষয়, কুচো চিংড়ির প্রথম চিত্রকর্ম পর্যবেক্ষণ করে বুঝেছিলাম কুচো চিংড়ির সংকলন কখনো শেষ হবে না। আজকাল সবচেয়ে কষ্ট দেয় একটা বিষয়। আমি তার কবিতা, চিত্রকর্ম, সাদা-কালো ছবি নিয়ে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন আজও করতে পারিনি।

ভালোবাসা বরফের মতো তীক্ষ্ণ, আঁধারের মতো দূরবর্তী। সম্ভবত আমার চাতুর্যহীন প্রশংসা ওইসব কবিতা, চিত্রকর্ম ও ছবির সঙ্গে বেমানান। আমাকে ক্ষমা করো, জি।

জি, আর তো মাত্র কয়েকটা দিন বাকি, তোমার কাজ সমাপ্ত করার মতো শক্তি কী আমার আছে?
লিউ শিয়াবো,
৫ জুলাই ২০১৭

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন