স্বৈরশাসকের অধীনে প্রতিটি মানুষ অসহায়: ইমরে কার্তেজ | চিন্তাসূত্র
৫ ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২০ আগস্ট, ২০১৮ | সন্ধ্যা ৬:২৪

স্বৈরশাসকের অধীনে প্রতিটি মানুষ অসহায়: ইমরে কার্তেজ

Imre-Kertész[সাক্ষাৎকার শুরুর আগে ইমরে কার্তেজ বলছিলেন, তিনি বার্লিনে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন, ‘শিল্প নয়, জীবনের জন্য’।  মূলত বার্লিনে স্বাধীনতা ও মুক্ত সংস্কৃতি চর্চার অধিকার আছে তিনি পাড়ি জমান সেখানে।  সাক্ষাৎকারটি যখন নেওয়া হয়, এ সব উপভোগের সময় ছিল না তার, পারকিনসন নামক জটিল রোগের শেষ ধাপের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন তিনি।

কার্তেজ ১৯২৯ সালে বুদাপেস্টে একটি ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।  তিনি ১৯৪৪ সালে অসউইচ বন্দিশিবিরে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন।  এরপর তিনি বুচেনওয়াল্ড বন্দিশিবিরে ছিলেন।  হোলোকাস্ট ও হোলোকাস্টের ফল তার উপন্যাসগুলোর মূল বিষয়বস্তু।  উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হলো ফেটলেসনেস (১৯৭৫), ফিয়াস্কো (১৯৮৮), কাদ্দিস ফর অ্যান আনবর্ন চাইল্ড (১৯৯০), ও লিক্যুইডেশন (২০০৩)।  এছাড়া তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ডোসিয়ার কে. ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়।  ২০০২ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সময়, নোবেল কমিটি তার সাহিত্যকর্মকে অভিহিত করে—fragile experience of the individual against the barbaric arbitrariness of history. কিন্তু কার্তেজের মতে, হোলোকাস্ট কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ব্যাপার নয়।  এটি সভ্যতার ইতিহাসে একটি বিরাট ঘটনা, যা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার চেয়েও অনেক বড় বিষয়।  তার মতে, অসউইচ সব জায়গাতেই বিরাজমান।

নোবেল পুরস্কার ছাড়াও বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ও হাঙ্গেরীয় সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন এই মহান কথাসাহিত্যিক।  ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ তিনি পারকিনসন রোগে ভুলে মৃত্যুবারণ করেন।  ইমরে কার্তেজের এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছে জার্মান  সাহিত্যিক লুইজা জেলিনস্কি।  প্যারিস রিভিউ থেকে চিন্তাসূত্রের জন্য অনুবাদ করেছেন মোস্তাফিজ ফরায়েজী]

লুইজা জেলিনস্কি: সাহিত্যের সঙ্গে আপনার পরিচয় কিভাবে? আপনার পরিবারের কেউ লেখালিখি করতেন?
ইমরে কার্তেজ: না, আমার পরিবারের কেউ লেখালিখি করত না।  যতটুকু মনে আছে, আমার বয়স যখন ছয় কি সাত বছর, তখন ভুলবশত আমি সাহিত্যের সংস্পর্শে চলে এসেছিলাম। একদিন আমাকে কেউ একজন জিজ্ঞাসা করেছিল, তুমি কী উপহার পছন্দ করবে? কেন জানি আমি বলে দিয়েছিলাম, আমি একটা জার্নাল পছন্দ করব।  উপহার পাওয়া জার্নালটা ছিল খুব সুন্দর, সেটা এত সুন্দর ছিল যে, একটু ময়লাও লাগতে দিতাম না।  সময়ের পরিবর্তনে, একসময় আমি লেখার চেষ্টা করতে থাকলাম এবং নিজের লেখা দেখে নিজে বিরক্ত হতাম।  তাই আমি আমার পুরনো লেখাগুলো ঘষামাজা করে আরও উন্নত করতে লাগলাম। আমার মতে, একজন মানুষ লেখক হয়ে ওঠে নিজের খসড়া লেখাগুলো সম্পাদনার মাধ্যমে।  তারপর একদিন আমি বুঝতে পারলাম, আমি লেখক হয়ে গেছি।

লুইজা জেলিনস্কি: এটা কোন সময়ের কথা?
ইমরে কার্তেজ: আমার বয়স তখন চব্বিশ।  আমি এই বিষয়ে অনেক জায়গায় লিখেছি—সেই সময়টা আমাকে এখনো তাড়িত করে, ওই যে রাস্তার ওপর ওইখানে।

লুইজা জেলিনস্কি: আপনি কখন ইউনিয়ন জ্যাকে ছিলেন?
ইমরে কার্তেজ: এ সময়টার কথা ফিয়াস্কোতে অনেকটা উঠে এসেছে।  কিন্তু সত্যি কথা বলতে, এ বিষয়টাই আমাকে লেখালেখি শুরু করতে সাহায্য করেছে, এমনটি নয়। সে সময় আমার অর্থনৈতিক অবস্থা এতটা খারাপ ছিল যে, আমার একটা কলমও ছিল না।  আমি তখন লেখক হব কিভাবে!

লুইজা জেলিনস্কি: জীবনের প্রতিকূল অবস্থায় কোন বিষয়টা আপনাকে লিখতে উৎসাহ দিয়েছে?
ইমরে কার্তেজ: আমি এই বিষয়ে কথা বললে আমার সারাজীবন পার করে দিতে পারতাম, অসংখ্য বই লিখতে পারতাম।  আসলে, লেখকদের এই বিষয়ে কাউকে কিছু বলা উচিত নয়। লেখকদের কিছু গোপনীয় বিষয় রাখা উচিত। কেননা, লেখকেরা সব কিছু নিজেদের মতো করে অনুভব করে।  লেখালেখি আমার জীবনকে পাল্টে দিয়েছে।  এই অনুভবের একটা বাস্তবিকতা আছে,  প্রতিটি লেখকের ক্ষেত্রে এটি একই রকম। প্রতিটি শিল্পীর জাগরণের একটা মুহূর্ত আছে, সেই জাগরণের মুহূর্তের সময় একটা ধারণা আপনাকে আঁকড়ে ধরবে, আপনি চিত্রকর হোন কিংবা লেখক হোন।  আমার জীবনের পরিবর্তনটা স্বাভাবিক ছিল না, সেটা ছিল এক গভীর জাগরণের সময়।

আমি অসউইচে এক বছর ছিলাম। কিছু কৌতুক ছাড়া আর কিছুই ফিরিয়ে আনতে পারিনি, যেটা আমাকে লজ্জায় ভরিয়ে দিত।  আমি এও জানতাম না, সেই তরতাজা অভিজ্ঞতাগুলো দিয়ে আমি কী করব। এই অভিজ্ঞতার কোনো সাহিত্যিক মূল্য নেই, এর কোনো শৈল্পিক অন্তর্দর্শন নেই।  আসলে আমি কী চাইতাম, সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না।  আমি কী চাইতাম, সেটা খুঁজে বের করাটাও কঠিন ছিল। ওই সময় লেখালিখি করা আমার পেশা ছিল না। আসলে, তারও অনেক পরে লেখালিখির মৌলিক বিষয়গুলো বুঝতে শিখেছিলাম।

লুইজা জেলিনস্কি: অবাক করার মতো ব্যাপার, আপনি তের বছর ধরে আপনার প্রথম উপন্যাস ‘ফেটলেসনেস’ রচনা করেছিলেন।
ইমরে কার্তেজ: হ্যাঁ, এটা ঠিক।  তাই বলে আমি প্রতিদিন উপন্যাসটির পেছনে সময় দিয়েছি তা নয়, অন্যভাবে যদি ধরো, তাহলে আমি প্রতিদিনই সময় দিয়েছি। ওই সময় আমার দিনগুলো ছিল বড্ড কঠিন। কম্যুনিস্টদের দমন-পীড়নের দিনগুলোতে আমাকে সবকিছুই লুকিয়ে রাখতে হতো।  তাই উপন্যাসটির প্রথম বাক্যটি লিখতেই আমার অনেক দিন লেগে গিয়েছিল।

কিন্তু আমি আগে থেকেই জানতাম, আমি একটা  উপন্যাস লিখতে চলেছি।  আমি জানতাম, আমি শৈল্পিকভাবে কিছু বাক্য উপস্থাপন করতে চাই। যেটা আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করত সেটা হলো, যে সমগ্রতাবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় আমি বসবাস করতাম। তার বাস্তবতা হলো ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করা। সেই সমগ্রতাবাদী ব্যবস্থার কথা ভাষায় প্রকাশ করা আসলে অনেক কঠিন।

লুইজা জেলিনস্কি: আপনি ফেটলেসনেস ষাট ও সত্তরের দশকে লিখেছেন। এখনো এটা হোলোকাস্ট বিষয়ে একটি সমাদৃত লেখা।  কোন ঐতিহাসিক বিষয়টা আপনার উপন্যাসটি লেখায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে?
ইমরে কার্তেজ: খেয়াল করো, আমি আমার পুরো উপন্যাসটি কম্যুনিস্টদের সময় লিখেছি।  আমার কোনো ধারণাই ছিল না, আমি কী বলতে চাই, তাই আমার প্রথম সংগ্রামটা ছিল একটা ভাষা সৃষ্টি করা, একটা ভাষার গঠন সৃষ্টি করা।

আমি খুব সূক্ষ্ণভাবে বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছিলাম, একটা সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটা জীবনের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম।  কিন্তু কিভাবে আমি এই বিষয়ে এগিয়ে যাব, সেটা নিজের কাছেই পরিষ্কার ছিল না।  আমাকে একটা যেনতেন ভাষাকে হাতুরি পেটানোর মতো করে শক্তিশালী ও নির্ভুল করতে হতো। আমি মনে করি সেই সমগ্রতাবাদী যুগে যারা বসবাস করত, তাদের ভেতর থেকে সফল লেখক হওয়াটা ছিল খুবই কঠিন।

লুইজা জেলিনস্কি: ওই দিনগুলোতে কী করে জীবিকা নির্বাহ করতেন?
ইমরে কার্তেজ: আমার একজন বন্ধু আমাকে গীতিনাট্য লিখতে বলেছিল, আমি সেটাই করতাম।  বন্ধুটি ছিল একজন সফল নাট্যলেখক, কিন্তু তার মতো হওয়ার ইচ্ছা ছিল না আমার। বন্ধুটি যখন আমাকে বলেছিল, তখন আমি আমার স্ত্রীসহ আটাশ বর্গমিটারের একটি ঘরে মানবেতর জীবন-যাপন করতাম। বন্ধুটি দেখেছিল, আমাদের দুটি জীবন অনাহারে শেষ হয়ে যেতে পারে।  অবশ্য আমি ওভাবে বিষয়টা দেখতাম না।  যাই হোক, সে আমাকে গীতিনাট্য লিখতে বলেছিল এবং আমি লিখতাম।  আমি আসলে গীতিনাট্য কিভাবে লিখতে হয়, তার কিছুই জানতাম না, কিন্তু আমি জানতাম কী করে সংলাপ লিখতে হয়।  তাই আমরা দুজন মিলে গীতিনাট্যের প্রেক্ষাপট ঠিক করতাম, তারপর তার নির্দেশনায় সংলাপ লিখতাম, কেননা এ কাজে আমার তেমন কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না।  আমি একদিক দিয়ে ভাগ্যবান ছিলাম, কেননা আমার লেখার কিছু বিশেষ শৈলী ছিল, যে কারণে আমি সহজেই সব কাজ শেষ করতে পারতাম।

লুইজা জেলিনস্কি: এই বিষয়গুলো আপনি কিভাবে ফেটলেসনেসে উপন্যাসটি লেখার সময় কাজে লাগিয়েছেন?
ইমরে কার্তেজ: আমি আমার বন্ধুর বাড়িতে সন্ধ্যায় সময় কাটাতাম, আমরা গীতিনাট্যের বিষয়ে গল্প করতাম।  সাহিত্যের নানা বিষয়ে আড্ডা দিতাম। ও রকম এক সন্ধ্যায় হঠাৎ একদিন আমার মাথায় এলো, একটা উপন্যাস লেখার বিষয়ে।  একটা বাক্য আমার মাথায় ঘুর ঘুর করতে লাগল।  সেই বাক্যটি সম্পর্কে হুবহু বলতে পারব না, সেটা এ রকম ধাঁচের ছিল, ‘আমি গাজরের চেয়ে শালগম বেশি পছন্দ করি’। এ রকম অখ্যাত একটি বাক্য যে উপন্যাসটির মূল বিষয় হিসেবে উদ্ভাসিত হবে, আমাকে নতুনভাবে লেখাবে, তা কে জানত।  মজার ব্যাপার হলো, ওই একটা বাক্যই উপন্যাসটি সৃষ্টির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

আমি আসলে তিনটি বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিতাম—ভাষা, বাক্যগঠন ও খসড়া কাহিনী।  এই বিষয়গুলো আমাকে উপন্যাসে নিবদ্ধ থাকতে সাহায্য করত।  আমি উপন্যাসটি লেখা শুরু করলে সেটি কান্না উদ্রেক করার মতো বিষয়ে পরিণত হয়ে যেতে পারত, এটা আদৌ ঠিক নয়। কেননা উপন্যাসের নায়ক একজন ছেলে।  এই বিষয়ে আমি সবসময় সচেতন থাকতাম।  আমি ওই ছেলের চরিত্রকে খুব সূক্ষ্ণভাবে সৃষ্টি করলাম, কেননা স্বৈরশাসকের অধীনে প্রতিটি মানুষই শিশুদের মতো অসহায়ত্ব ও অবজ্ঞার স্বীকার হয়। এই কারণে, আমাকে উপন্যাসটির জন্য শুধু বিশেষ ধরন কিংবা গঠনশৈলী সৃষ্টি করতে হয়েছে, তা নয়, আমাকে খুব নিবিড়ভাবে বিষয়টার আধ্যাত্মিকতা অনুধাবন করতে হয়েছে।

আমি যখন ফেটলেসনেস নিয়ে কাজ করছিলাম, তখন বুদাপেস্টে সেমপ্রানের দ্য লং ভয়েজ প্রকাশিত হলো।  বইটি অনেক সমাদৃত হয়েছিল কিন্তু সেমপ্রান ভুল কৌশল বেছে নিয়েছিল, সে শুধু পাঠকদের জন্য চিত্তাকর্ষক ঘটনার বর্ণনা করেছিল। যেখানে আধ্যাত্মিকতা ছিন্ন-ভিন্ন অবস্থায় ছিল। এটা সাধারণ পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণের একটা পন্থা কিন্তু এটা সঠিক পন্থা নয়। যদি তুমি একটা শিশুকে একটি গল্প বলো, তাহলে গল্পের আধ্যাত্মিকতা শিশুটির জন্য উপযুক্ত হতে হবে। একটা শিশুর নিজের জীবনের ওপর প্রভাব কম, শিশুরা আসলে সব কিছু সহ্য করতে বাধ্য হয়।

সেমপ্রানের দ্য লং ভয়েজ প্রচুর প্রশংসা কুড়াচ্ছিল, এটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছিল যে, আমাকে যদি একটা গল্প বলতে হয় কিংবা বর্ণনা করতে হয়, তাহলে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বলতে হবে, শুধু পাঠকের চাহিদার জন্য চিত্তাকর্ষক মুহূর্তগুলো নয়, আমার নায়কের শুধু একটা অবস্থার কথা বললে হবে না, তার যেকোনো অবস্থার কথা আমাকে বর্ণনা করতে হবে।  উদাহরণ হিসেবে মনে করো, অসউইচে ট্রেন থেকে যে গুরুত্বপূর্ণ বিশ মিনিট মানুষ নামানো হয়েছিল, সেই বিখ্যাত বিশ মিনিটের কথা ভাবো।  বিশ মিনিট একটা সময় এবং ওই বিশ মিনিটে অনেক কিছু ঘটেছিল।

লুইজা জেলিনস্কি: নোবেল পুরস্কার উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে আপনি বলেছিলেন,  ‘বিষণ্নতা ও হতাশার মাঝে আমি প্রতিদিন সকালে পৃথিবীতে ঘুম থেকে উঠি এবং এটা আমাকে কোনও কিছু বর্ণনা করতে উৎসাহ দেয়।’’ এটাই কি আপনার সাহিত্যচর্চাকে বেশি প্রভাবিত করেছিল?
ইমরে কার্তেজ: আমি এমন এক জগতে গিয়ে পড়েছিলাম, যে জায়গাটা আমার কাছে একদম অচেনা। সেখান থেকে আমার মুক্তির কোনো আশাই ছিল না।  এটা যেমন স্টালিনীয় হাঙ্গেরির ক্ষেত্রে ঘটেছিল, তেমনি ন্যাশনাল সোশিয়ালিজমের ক্ষেত্রেও।  পরবর্তী ঘটনাগুলো আরও তীব্রভাবে আঘাত করত। হাঙ্গেরিতে স্টালিনীয় যুগে, তোমাকে যেনতেনভাবে চলতে হতো।  অন্যদিকে নাৎসি বাহিনীর যুগে, সময়টা এতটা নিকৃষ্ট ছিল যে, ‘সময় চলে যাচ্ছে’ বলতে বোঝাতো খুব কঠিন পরিস্থিতিতে তুমি টিকে আছ।  নাৎসিরা আসলে সবকিছু গিলে ফেলেছিল। এটা অনেকটা একটা পাশবিক যন্ত্রের মতো ছিল, অনেকে বুঝতেই পারত না তারা কিসের মধ্যে জীবন-যাপন করছে।

আমার মতে, সাহিত্যের বিচারে সেখানে সবকিছু তিনটি পর্যায়ে হয়েছিল। প্রথম পর্যায়টা হলো, হোলোকাস্টের আগে, সময়টা ছিল কঠিন, কিন্তু কোনো না কোনোভাবে তুমি এই সময়টা অতিক্রম করতে পারতে।  দ্বিতীয় পর্যায়টা বিভিন্ন লেখকেরা বর্ণনা করেছেন, যেমন প্রিমো লেভি। সেটা ছিল হোলোকাস্টের মাঝামাঝি সময়, এখানে উঠে এসেছে ঘটনাটির ফলে বিস্মিত ও আতঙ্কগ্রস্ত প্রত্যক্ষদর্শীদের কথাবার্তা। সেসব লেখকেরা বর্ণনা করেছে, হোলোকাস্টে যা ঘটেছিল, তা যেকোনো মানুষকে পাগল বানিয়ে দিতে পারত—অন্ততপক্ষে যারা পুরনো ধ্যান-ধারণা নিয়ে থাকত, তারা পাগল হয়ে যেত।  আসলে হোলোকাস্টে যা ঘটেছিল, তা একজন সাধারণ প্রত্যক্ষদর্শীর পক্ষেও অনুধাবন করা সম্ভব নয়। হোলোকাস্টের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টি করার জন্য তারা সর্বপ্রকার চেষ্টা করত, এর ফলে তারা জীবনে এমন কিছু পেত যা তাদের সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হত।

তৃতীয় পর্যায়টার সাহিত্যকর্মগুলো ন্যাশনাল সোশিয়ালিজমের পরে এসেছিল, যেগুলোতে পূর্বের মূল্যবোধের অবনতি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। জিন এমেরি অথবা টাডেউজ বোরয়াস্কির মতো লেখকেরা এ সময়ে লিখেছেন। এই লেখাগুলো ছিল তাদের জন্য যারা হোলোকাস্টের ইতিহাসের সঙ্গে আগে থেকে পরিচিত ও বিশ্বাস করত পূর্বের মূল্যবোধগুলো তার অর্থ হারিয়ে ফেলেছে। সেসময় সবচেয়ে দরকার ছিল ওই তীব্র দুঃখ-দুর্দশা থেকে নতুন মূল্যবোধ সৃষ্টি করা, কিন্তু বেশিরভাগ লেখকে সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে।  যাই হোক, তারা যেটা করেছে, সেটা হলো আমাদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করেছে, সেটাকে সাহিত্যে উগ্র রাজনৈতিক চেতনা বলা হয়ে থাকে।

লুইজা জেলিনস্কি: আপনি কি আপনার কাজগুলোকে ওই উগ্র রাজনৈতিক চেতনার অংশ মনে করেন?
ইমরে কার্তেজ: হ্যাঁ, আমি মনে করি। আমার কাজ, নাকি আমার অসুস্থতা আমাকে মেরে ফেলছে, এটা আমি জানি না। এই প্রশ্নটা করলে সেটা ব্যতিক্রমী প্রশ্ন হতো। অন্ততপক্ষে আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। ইতিহাসের সঙ্গে বোঝাপাড়ার জন্য আমি এখনো মারা যায়নি, বরং মনে হচ্ছে ইতিহাসের পরিবর্তে পারকিনসন রোগেই আমি মরতে চলেছি।

লুইজা জেলিনস্কি: সাহিত্যচর্চা কি টিকে থাকার একটা লড়াই?
ইমরে কার্তেজ: একটি নির্দিষ্ট নিকৃষ্ট সর্বগ্রাসী ব্যবস্থায় কিভাবে টিকে থাকতে হয়, সেটা আমি আমার জীবনে বুঝেছি। আমি আত্মহত্যা করতে চাইনি, কিন্তু আমি লেখকও হতে চাইনি।  এমনকি লেখক হওয়ার চিন্তা দীর্ঘদিন দমন করে রেখেছিলাম, তারপর আমি বুঝলাম, আমাকে লিখতে হবে, আমাকে লিখতে হবে হোলোকাস্টের সেই ভয়ঙ্কর অবস্থার কথা।

দেখো, আমি একসময় অসউইচের একজন বন্দি ছিলাম। এখন নোবেল পুরস্কার পেয়েছি। আমি মনে করি, আমি অসাধারণ কিছুর সাক্ষী, আমি শুধু আতঙ্কের ভেতরই বসবাস করিনি, সেই সময়টাকে বর্ণনাও করেছি। একদিক দিয়ে এটা সহনীয় ও গ্রহণযোগ্য, তবু এর একটা অংশ ছিল উগ্রচেতনা।  সে সময় খুব কম লোকই এই ব্যবস্থার অতলস্পর্শ করেছিল—বোরয়াস্কি, শালামভ, এমেরি, এককথায় আমরা খুব বেশি জন নই। এইসব লেখকের জন্য সাহিত্যচর্চা ছিল আত্মহত্যার পূর্বপ্রস্তুতি। জিন এমেরি তো তার বন্দুকটা সবসময় প্রস্তুত রাখত।

আমি সেই একজন, যে সবকিছু পেরিয়ে টিকে ছিলাম, আমি গরগনের ছিন্ন মস্তক দেখেছি,  এখনো টিকে আছি আমার কাজ শেষ করার জন্য। সাহিত্যের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে শিক্ষা দেওয়া, বিনোদিত করা, তাই আমরা মানুষকে জঘন্য দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচয় করাতে চাই না। আমি হোলোকাস্টকে নিয়ে সুশৃঙ্খল একটা কাজ করেছি, যেখানে রুচিহীন অগোছালো সাহিত্যের উপাদান অনুপস্থিত।

আমাকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করতে পারো, কিন্তু আমি অনুভব করি, আমার কাজটা বিরল প্রকৃতির। আমি ইতিহাসের মানবীয় মুখোশ উন্মোচন করার চেষ্টা করেছি। আমি এমন একটি বই লেখার চেষ্টা করেছি, যেটা মানুষ সত্যিকার অর্থেই পড়তে চাইবে।

লুইজা জেলিনস্কি: কোনো কিছু সহজে লিখতে সম্ভবত লেখকের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকা লাগে!
ইমরে কার্তেজ: সবার জন্য নয়।

লুইজা জেলিনস্কি: কিন্তু আপনার জন্য?
ইমরে কার্তেজ: ১৯৫৫ সালের দিকে যখন বুঝতে পারলাম, আমি একটি ভয়ঙ্কর পরিবেশে বসবাস করছি, তখন অবাক হয়েছিলাম। সেই পরিবেশে তুমি টিকে থাকতে পারবে না। এখন তার কিছুই অবশিষ্ট নেই, যা আছে তা কিছু মজার গল্প, যেগুলোকে এক ধরনের কৌতুক ছাড়া কিছুই বলা যায় না।  আমার ভেতর যখন লেখার ধারণা এসেছিল, আমি সেটা লিখতে আগ্রহী ছিলাম, আমার কাছে যথেষ্ট উপাদান ছিল লেখা, তাই ভেবেছিলাম সত্যিই এটা নিয়ে কাজ করা উচিত।

তাই আমাকে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধাত নিতে হয়েছিল। কেননা সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে আমার নৈতিক শিক্ষা ছিল, এখন প্রশ্ন হলেঅ, আমি কী আমার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো খসড়া আকারে লিখে ফেলব? আমি যদি সেই সময় গল্পগুলো না লিখতাম, আমি হয়তো সব ভুলে যেতাম।  মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে সে সময় আমি অল্পভাষী হয়ে উঠেছিলাম।

হয়তো আমি দুর্ভাগা ছিলাম এ কারণে আমাকে অসউইচে যেতে হয়েছিল।  কিছু মানুষ আমাকে সাহায্য করেছিল, অন্যরা করেনি।  আমি ছোট ছোট গল্প নিয়েই বেঁচে ছিলাম, সেগুলো আবর্জনার ঝুড়িতে ফেলে দেওয়ার মতো পেকে গিয়েছিল। কিন্তু সেগুলো আবর্জনা ছিল না, তাই আমাকে আমার জীবন দিয়ে হলেও সেই গল্পগুলো লিখতে হতো। আমার অভিজ্ঞতার বিনিময়েই আমি সাহিত্য জগতে প্রবেশ করতে পেরেছিলাম।  আমি যেকোনো উপায়ে সত্যটা বের করে আনার চেষ্টা করেছিলাম, বলার চেষ্টা করেছিলাম এমন একটি গল্প যে গল্প আগে কেউ বলতে পারেনি।

লুইজা জেলিনস্কি: তখন কি আপনি অনেক বই পড়তেন?
ইমরে কার্তেজ: আমি আসলে বিশ্বসাহিত্য গোগ্রাসে গিলতাম। এছাড়া, ছোটবেলায় স্কুলে ক্লাসিক সাহিত্যগুলো পড়েছিলাম। কিন্তু সেই দিনগুলোতে ওই বইগুলো পাওয়াও কঠিন ছিল। পরবর্তী সময়ে, হাঙ্গেরিয়ান সরকার বৈধতা লাভের আশায় আবার সেগুলো প্রকাশ করেছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে সেখানে কোনো আধুনিক কথাসাহিত্য ছিল না, তাই নিজেকেই জীবনের কঠিন বাস্তবতা উপলব্ধি করা শিখতে হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে ব্যক্তিগত জীবনের অধ্যায়গুলো নিয়ে আমি আমার প্রথম উপন্যাসের কাজ করেছি।  কেউ এ রকম অভিজ্ঞতার কথা কখনোই বলতে পারবে না।

লুইজা জেলিনস্কি: এটাই বাস্তবতা, আপনি বলতে পারবেন না। এটা এত ব্যাপকভাবে পঠিত হয়েছে যে, এটা অন্যভাবে লেখাও যাবে না।
ইমরে কার্তেজ: এই বিষয়ে আমি খুব খুশি।  আমার মনে পড়ে, যখন জার্মানিতে ফেটলেসনেস প্রকাশিত হলো, তখন আমি ব্যাগভর্তি চিঠি পেতাম। অনেকে প্রচুর প্রশংসা করত চিঠিতে, কেননা আমি হোলোকাস্টকে ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলাম।  একজন পাঠক আমাকে বলেছিল, আমি শুধু জানালা খুলে দিয়েছি। আমি সেই পাঠকদের চোখ খুলে দিয়েছিলাম, যাদের বাবা ও মায়েরা নিস্তব্ধ থাকত।  তারা এই বিষয়ে কথা বলত না, কেননা তারা ইতিহাসের সামনে আসতে চাইতো না।  সত্যিকার অর্থে এটা একটা কঠিন কাজ, যেটা করা আবশ্যক ছিল।

লুইজা জেলিনস্কি: ছোট্ট ঘরটিতে বসে, কোন বিষয়গুলো আপনাকে আনন্দ অথবা সামান্য বিনোদন দিত?
ইমরে কার্তেজ: সেগুলো ব্যক্তিগত ব্যাপার, সে সম্পর্কে আমি বলতে চাই না। আমি তেমন কিছু করিনি।  আমি গীতিনাট্য লিখতাম।

লুইজা জেলিনস্কি: সেটা আপনাকে আনন্দ দিত?
ইমরে কার্তেজ: না।

লুইজা জেলিনস্কি: আপনি কিছু করতেন সেখানে?
ইমরে কার্তেজ: সেখানে গল্প গল্পকে লিখছিল! তুমি জানো, এটা একটা ভালো প্রশ্ন। যখন আমার উত্তরটা হয় ‘গল্প গল্পকে লিখছিল’ তখন বিষয়টা আমাকে আনন্দ দেয়, যদিও এটা সত্য নয়, কেননা আসলে আমিই লিখছিলাম। আমি যখন লিখতে বসতাম, আমার মনে হতো, কী নির্মম ভাগ্যকে আমার সহ্য করতে হয়েছিল। আমার অতীতের ইতিহাসই শুধু আমাকে আনন্দ দিত। একদিন আমি স্টাটগার্টে একটা বই পড়ছিলাম, বই পড়া শেষে এক মহিলার সঙ্গে আমার নৌশভোজের কথা ছিল, সে আমার জীবন সংগ্রামের জন্য তার সহানুভূতির কথা বলেছিল। আমার প্রথম উপন্যাস লেখার ত্রিশ বছর পরে স্টাটগার্টে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমি সেই দিনগুলোতে অনেক সুখী ছিলাম।

লুইজা জেলিনস্কি: আপনার উপন্যাস লিখছিলেন?
ইমরে কার্তেজ: অবশ্যই। আমি কঠিন পরিস্থিতিতে আমার একটি উপন্যাসের কাজ শেষ করেছিলাম। তারপর স্টাটগার্টের কোনো এক মহিলা আমার প্রতি গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করেছিল।  তার কথাগুলো আমার জন্য সফলতার স্বীকৃতি ছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমি আমার জীবনে বড় কিছু একটা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছি। সেটা ছিল অনাবিল আনন্দের একটি মুহূর্ত।

লুইজা জেলিনস্কি: ফেটলেসনেস, ফিয়াস্কো, কাদ্দিস ফর অ্যান আনবর্ন চাইল্ড ও লিক্যুইডেশনকে আপনি কি চতুষ্টয় উপন্যাস হিসেবে বিবেচনা করেন?
ইমরে কার্তেজ: না, এটা আসলে হাঙ্গেরিয়ান এক ফালতু সাংবাদিকের মিথ্যা প্রচারণা। সে বলেছিল, এটা চতুষ্টয় উপন্যাস। এর আগে যখন ফেটলেসনেস, ফিয়াস্কো ও কাদ্দিস ফর অ্যান আনবর্ন চাইল্ড প্রকাশিত হয়েছিল, সে বলেছিল এটা ত্রয়ী উপন্যাস। আসলে সে আমার উপন্যাসগুলো সম্পর্কে কিছুই জানে না।

লুইজা জেলিনস্কি: আপনি ‘ডোসিয়ার কে’তে বলেছিলেন আপনার স্থান ইতিহাসে নয়, আপনার টেবিলে।
ইমরে কার্তেজ: আসলে টেবিলে বসে আমি খুব কম সময় লিখেছি। ছাড়ো বিষয়টা, ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে আমরা কথা না বলি।

লুইজা জেলিনস্কি: ঠিক আছে, কিন্তু এটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন নয়।
ইমরে কার্তেজ: তাহলে ঠিক আছে, আমার টেবিলের রঙ ছিল হলুদ।

লুইজা জেলিনস্কি: আপনি এখন কিভাবে লেখেন?
ইমরে কার্তেজ: এটা একটা তামাশাপূর্ণ প্রশ্ন, কেননা আমি আর কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারি না। এমনকি হাত দিয়েও লিখতে পারি না। কিন্তু আমার কাছে আমার সারাজীবনের সংগ্রহ আছে, আমার ডায়েরি, আমার প্রতিবেদনগুলো, লিক্যুইডেশন। এগুলোর পরে আমার লেখার আর কিছু নেই। আমি আমার লেখালেখির পাঠ চুকিয়ে দিয়েছি।

লুইজা জেলিনস্কি: তাহলে আপনার শেষ উপন্যাস সম্পর্কে বলুন, লিক্যুইডেশন, এটা লেখার প্রাথমিক উৎসাহ কী ছিল?
ইমরে কার্তেজ: আমি মূলত একটি নাটক লিখতে গিয়েছিলাম, কিন্তু উপন্যাস লিখে ফেলেছিলাম।  ১৯৯০ সালে শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তনের সময়টা আমি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।  সময়টার নাটকীয় মূল্য আমি অনুভব করেছিলাম। কিন্তু আমি আটকে গেলাম, কেননা আমি নাট্যকার নই, নাটকের বিষয়ে আমার আগ্রহ ছিল না। তাই এটি লিখতে গিয়ে আমি সমস্যায় পড়ে গিয়েছিলাম।  তাই আমি নাটকের পাণ্ডুলিপি ছিঁড়ে ফেললাম। বুঝেছিলাম, এটা এমন একটা বিষয় যেটা নিয়ে স্বল্প পরিসরে সুন্দর একটি উপন্যাস লেখা সম্ভব।

শাসনামল পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন মানুষ কিভাবে নিজেদের মানিয়ে নেয়, সেটা পর্যবেক্ষণ করতে আমি খুব উৎসাহী ছিলাম।  আমি অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা করেছিলাম, তাদের জীবনী পড়েছিলাম ও তাদের গল্পগুলো শুনেছিলাম, মজার ব্যাপার হলো সেগুলোর বেশিরভাগই ছিলো মিথ্যায় পরিপূর্ণ। এটার সঙ্গে অসউইচের ঘটনার যোগসাজশ করার বিষয়টা আমার মাথায় আসলো। আমি একটা মূল চরিত্র খুঁজতে চেষ্টা করলাম।  এমন কেউ যে বন্দিশিবিরে থাকেনি কিন্তু যার জীবনে তার ছায়া আছে। ঠিক সেই সময়ই আমি খুঁজে পেলাম জুদিত এবং বি., একজন সম্পাদক যে কর্মজীবনে চরম ব্যর্থ, একজন লেখক যে আত্মহত্যা করে।

লুইজা জেলিনস্কি: ফুকুয়ামার ‘ইন্ড অব হিস্টোরি’ সম্ভবত একটা সস্তা কাহিনী হয়ে গেছে, কিন্তু আমি অবাক হই, আপনি যখন লিক্যুইডেশন লিখছিলেন, তখন আপনার মনে কী কাজ করছিল?
ইমরে কার্তেজ: আমি এভাবে কখনো ভাবিনি। তুমি উপন্যাসটি সম্পর্কে কী বলতে চাও?

লুইজা জেলিনস্কি: আমার কাছে আপনার উপন্যাসটি ইন্ড অব হিস্টোরি ধাঁচের লেগেছে। এটি একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে লেখা হয়েছে, কিন্তু এটাতে তুলে ধরা হয়েছে ১৯৯০ সালে সমাজতন্ত্রের পতনের মুহূর্তগুলো। সময়টা ছিল পরস্পরবিরোধী, একটা কিছু দানা বাঁধছিল, সম্ভবত বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসের জন্য কোনো কিছু গুটিয়ে ফেলা হচ্ছিল।
ইমরে কার্তেজ: তুমি ঠিক ধরেছ। এটা একদম সেরকম ছিল।  আমরা এমন একটা পুরুষ পেয়েছিলাম যার জন্ম অসউইচে এবং জুদিত নামের নারী যে অসউইচের অভিজ্ঞতা তার কাছ থেকে নিয়েছে।  সে তার জীবনের ইতিহাস সমাপ্ত করতে চায়। তারপর সে তার আগের জীবন ত্যাগ করল।  সে বিয়ে করল এমন কাউকে, যে সমগ্রতাবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার স্পর্শ পায়নি। সে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল, যেটা তাকে নতুন জীবন দিল। এখানেই গোপনীয় একটি ইঙ্গিত রয়েছে, সন্তান প্রসব করাটাই সেই ইঙ্গিত, যেটা জীবন চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।  জীবন ও মরণের ভেতর সে জীবনকে বেছে নেয়।
আচ্ছা ঠিক আছে, যথেষ্ট হয়েছে। এটাই ছিল আমার শেষ সাক্ষাৎকার।

লুইজা জেলিনস্কি: আজকের জন্য?
ইমরে কার্তেজ: চিরদিনের জন্য।  এখন এই অধ্যায়ের সমাপ্তির সময়।  আর নয়।

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন