গুগলের পেটে আঁকা ভূগোলের ম্যাপ । শাহাদাৎ শাহেদ | চিন্তাসূত্র
২ ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৭ আগস্ট, ২০১৮ | রাত ১১:৩০

গুগলের পেটে আঁকা ভূগোলের ম্যাপ । শাহাদাৎ শাহেদ

shahadat-Shahed

আমার কথা
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ধরে টান দিলে গোড়াতেই পাই ছড়ার অবস্থানও। মানুষের মুখে মুখে আওড়ানো এই ছড়া পরবর্তীকালে লিখিত ও চর্চিত হয়ে সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ শাখায় রূপলাভ করেছে।  ছড়া সাহিত্যের জরায়ুতেই জন্ম কিশোর কবিতার। তাই বলতে পারি—কিশোর কবিতা বিকাশের ইতিহাস অনেক পর থেকে শুরু হলেও এর পরম্পরা অতি পুরনো, প্রায় বাংলা সাহিত্যের সম-বয়সী।
শিশু-কিশোরদের এক ধমকে আপনি কাঁদাতে পারেন,কিন্তু ছড়া-কবিতা-গল্প শুনিয়ে তাকে হাসানো, তার মনোরঞ্জন অত্যন্ত দুরূহ। ছড়ার আদলে কিছু একটা লিখে সেটাতে কবিতার প্রয়াস চালিয়ে প্রায় দেখা যায় ছড়া বা কিশোর কবিতা দাবি করা হচ্ছে। এর অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি—গবেষণা ও নিরীক্ষা অভাব। যা সচেতন পাঠক-লেখককে ভাবিয়ে তোলে। শিশু সাহিত্যিকদের শিশুমন-মগজ, তাদের চাওয়া-পাওয়ায় ওপর নিজস্ব নিরীক্ষা যতদিন যথেষ্ট না হচ্ছে, ততদিন এই সমস্যার সমাধান কল্পনাবিলাস। আসলে লেখক নিজেও জানেন না এটি আদৌ ছড়া হয়েছে, না কি কবিতা বা কিশোর কবিতা? এই কথাগুলো সরদার ফজলুর করিম তাঁর ‘ছড়া প্রসঙ্গ’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘…একজন লেখক ঠিক বড়দের দরবারে যা চালাতে পারেননি তার সবই যেন দ্বিবর্ণ, ত্রিবর্ণ, বহুবর্ণের ছাপায় ছাপিয়ে শিশুমহলে চালাতে চেষ্টা করেছেন।’
এবার আসা যাক ‘গুগলের পেটে আঁকা ভূগোলে ম্যাপ’ কথনে। আমি মূলত তের থেকে একুশ বছর বয়সীদের কথা মাথায় রেখেই পাণ্ডুলিপিটি তৈরি করেছি। এগুলো কতটা কিশোর কবিতা হয়ে উঠেছে, সে বিচার বিজ্ঞজন এবং অবশ্যই পাঠককূলের কাছে। শিশু ও বড়দের জন্য কাজের প্রাচুর্য রয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। তবে ঠিক টিনেজারদের নিয়ে কবিতায় কাজের উদাহরণ আমার সামনে প্রচুর ছিল না। তাই আমার প্রথম বইটি, মোড়কে বাঁধা স্বপ্নগুলো, কিশোরদের হাতে যথাযতভাবে পৌঁছে দিতে পারলেই তৃপ্তি অনুভূত হবে। বইটিতে ঠিক কতগুলো কবিতা কোন আঙ্গিকে থাকছে বা প্রচলিত ছন্দ নিয়ে আমার চিন্তা আমি নিজে বলার চেয়ে অন্যকারও চোখে পড়ুক, মনে ধরুক—সেটাই বরং ভালো মনে করছি। তবে এটুকু বলতে পারি, আমি যে স্বপ্নের বীজ বুনেছি, তা আমার নিরীক্ষায় উদ্দিষ্ট পাঠক ও বয়সী পাঠকদেরও আচ্ছন্ন করতে পারবে—এটাই ধারণা।

কিশোর কবিতা— ১
বাঁশবাগানের মাথার ওপর আর ওঠে না চাঁদ
মাইক্রোস্কোপে চেয়ে দেখি চাঁদের গায়ে খাদ,
রঙিন ঘুড়ির ওড়াউড়ি দেখছি না তো আর
মঙ্গলে আজ যায় নভোযান—ঘুড়ির কি দরকার!

মেঘের কণা রংধনু হয় প্রিজম হয়ে ফের
কম্পিউটার গ্রাফিক্সে-ই রংধনু হয় ঢের।
লালপরি আর নীলপরিরা এখন অনেক দূরে
আকাশজুড়ে রকেটগুলো গ্রহান্তরে ঘুরে।

খেঁকশেয়ালের হাঁক শোনাটা এখন শুধু গল্প। না?
এলিয়েনের ছা-র সাথে কি চ্যাট করা যায়? কল্পনা।

রংয়ের খেলা
সকাল যখন লম্বা হয়ে ঠিক দুপুরে মিলে—
ইলিক-ঝিলিক রোদের ছিটা খায় ছায়াকে গিলে।
রোদের ছিটায় ধ্যান ভেঙে হায়! খোকার চোখে আলো
ধ্যানের ভেতর কী দেখে সে? বন্ধ চোখে কালো?

কালো দেখুক, আলো দেখুক, লাল গোলাপি নীল-ই
খোকন রে তুই মায়ের পেটে, জানিস কেমন ছিলি?
চোখ ধাঁধানো  হলুদ সবুজ আর আকশি সাদা—
রংয়ের দুয়োর খুললে কী আর রং রাখা যায় বাঁধা!

রংয়ের ছিটায় এই পৃথিবী অন্যরকম সাজে
সেই সাজানোর মওকা কোথায়? নিজের মনের মাঝে।
মনের গায়ে রং মাখাতে গেলাম সঙ্গোপনে
মনটি তখন হরিণ হয়ে ছুটছে গভীর বনে।

চটপটে ওই হরিণ শাবক এদিক-ওদিক ছোটে
তার মায়াবী বদন দেখে পাখি ডেকে ওঠে।
হুক্কাহুয়া শেয়াল ডাকে ঝোপের আড়াল থেকে
ভয়ের চোটে দৌড়ে হরিণ ছোটে এঁকেবেঁকে।

ক্লান্ত যখন হরিণ শাবক বন পেরিয়ে গাঁয়—
হাত বাড়িয়ে অপেক্ষাতে খোকন সোনার মা’য়।

স্বপ্নগুলো গাছ হয়ে যায়
একশোটা বই, একশো পড়ার পাহাড় জমা
পড়া তোরা প্লিজ আমাকে কর না ক্ষমা।
ভাবনা এসে মাথা ঘোরায়, তাই টেবিলেই মাথা রেখে
ঘুরতে গেছি ভিন্ন দেশে অন্য কথার বুনন এঁকে।

সেখানটাতে আমি আছি আমার মতো দস্যি খোকা
কেমন আছি? প্রশ্ন কেন করছ বোকা!
সাত সাগরের উল্টা পিঠে জিন-পরিদের আস্তানাতে
গোল্লাছুট ও দাবা খেলি ভোর থেকে রোজ সন্ধ্যারাতে।

কিংবা আমি জোনাকপোকার নীলচে আলোয় সাঁতার কাটি
চাঁদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দু’জন হাঁটি।
নিয়ন আলোয় কল্পলোকের জগৎ বুনি
তারার কাছে হুতুম প্যাঁচার গল্প শুনি।
লেজহারা এক নীল ফড়িংয়ের লাফালাফির অন্তরালে
হাজার হাজার স্বপ্ন জমা মন গহীনের পাতা-জালে।
স্বপ্ন দেখি এলিয়েনের ছা-পোনাদের চোখের মাঝে
ঝিঁঝিঁপোকার একটানা সুর স্বপ্ন হয়ে নিত্য বাজে।

বইয়ের পাতা খোলা রেখেই হাঁটছি আমি কল্পলোকে,
বন্ধ দু’চোখ। দেখছি মনের খোলা চোখে।
ঝাপসা তো নয়, পষ্ট সব-ই, গল্পও নয় সত্যি বলি—
স্বপ্নগুলো গাছ হয়ে যায়, মাছ হয়ে যায়, আবার তারা ফুলের কলি।
ফুলের কলি, ফুলের কলি ফটাস ফটাস ফুটছে ওরা
ফুলগুলোকে ঝাঁপি ভরে আমার জন্য আন তো তোরা।

ফুল না ওরা। স্বপ্ন সব-ই, সময় মতো ফুটতে থাকে
পরিস্ফুট স্বপ্ন-ই তো রঙে সাজায় আকাশটাকে।
স্বপ্ন দেখে কী হবে কী? প্রশ্নটাকে দূরে রেখে
টাট্টুঘোড়ার পিঠে চেপে স্বপ্ন আসে এঁকেবেঁকে।

পাথরকুঁচি পাতার গায়ে লুকিয়ে থাকা স্বপ্ন জানে
আকাশ ফুঁড়ে রঙিন ঘুড়ি উড়তে থাকে হাওয়ার টানে
ডাকাতিয়ার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে গল্প শোনা—
স্বপ্ন মানে আস্তে-ধীরে মাকড়সাদের জালকে বোনা।

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন