মাংসফুল ॥ ফারাহ্ সাঈদ | চিন্তাসূত্র
৮ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২১ এপ্রিল, ২০১৯ | সকাল ৭:৪৯

মাংসফুল ॥ ফারাহ্ সাঈদ

আজ একটা বিড়াল কোথা থেকে যেন এলো! চুপচাপ আমার পায়ের কাছে বসে আছে। নিতুকে বলব ভাবছি। বারান্দায় শীতশীত লাগছে। ওর সঙ্গে আসলে আমার দুটো কথা ছিল। আমার পশমি চাদর আর এই বিড়াল। আসলে নিতুর সঙ্গে আমার অনেকদিন কথা হয়না।

সকাল হলেই বলি, রোদের দৌড়ঝাঁপ এবার বিদায় হও! আর দুপুর! দুপুর তো এতটাই গড়াগড়ি খায় যেন পোয়াতি বিড়াল! আমি শুধু বিকেলটার জন্যেই অপেক্ষা করি। নিতু ফিরবে। টেবিলে ওর চাবি রাখার শব্দ হবে। তারপর ব্যাগ ফেলে চুলের ক্লিপটা টেবিলে রেখে স্নানে যাবে। ওই সাওয়ারের পানি ঝিরঝির আমি বারান্দা থেকেই শুনতে পাই। ফিরে এসে রাইসকুকারে বাসমতি চাল বসিয়ে রান্নাঘরের রেডিওটা অন করে দেয় নিতু। হালকা ভলিউমে। রেডিওর তেমন কিছু শুনতে না পেলেও ওর গুনগুন আমি ঠিকি শুনতে পাই। মাঝে মাঝে হাসে নিতু। তবে আজকাল তেমন একটা নয়। ডিনারের সময় ডাইনিং টেবিলে প্লেটের সঙ্গে একটু আধটু খুনসুটি। ফোনে মৃদু আলাপ আমার মেয়েটার সঙ্গে। তারপর লম্বা সোফায় পা এলিয়ে টিভি দেখতে দেখতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে নিতু। মাঝে মাঝে মনে হয় রিমোটটা হাতের কাছে থাকলে ভালো হলো। ওর ঘুমটা ভালো হতো। এভাবে নিতু পৃষ্ঠা উল্টায় প্রতিদিন। আবার নতুন এক সকাল, ওর অফিসে চলে যাওয়া। সারাদুপুর আমার একা-একা থাকা। বিকেল মানেই অপেক্ষা। নিতুকে দেখার।

আজকাল আমার মধ্যে কোনো তোলপাড় নেই। চাকরি, গল্ফ, আমার একমাত্র মেয়ে, এমনকি নিতুর জন্যেও সময় ভাগাভাগি করার কোনো তাড়া নেই। সব ব্যস্ততা কাগজের প্লেন বানিয়ে এক ফুঁতেই দিয়েছি উড়িয়ে সেই কবে!

গ্রীষ্ম এলো এইতো সেদিন। আমি তাপমাত্রার খেয়ালিপনা দেখি। এই ঋতু হেসেখেলে আমাদের প্রতিবেশীর আঙিনা ভরে রাখে। ফুলেফলে, কোলাহলে,সংগীতে। হলিডে প্যাকেজে মেইল বক্স উপচেপড়ে। স্যান্ড্রা,ফিলিপরা ভ্রমন বিলাসী হয়। উষ্ণতা আসে আর যায়, ওরা নিয়ম ভাঙে। গ্রীষ্মকালীন ভাঙন দেখি। প্রতিবেশী দম্পতির হাসিগান আর তার খানিক পরেই অভিমানী মুখ, যেন করমচাফুল। কিন্তু নিতুর কোনো ছুটি নেই। কোনো ফুল নেই, রংয়ের বাহার নেই। কোথাও যায় না সে। মেয়েটার কাছেও না। আমাদের একমাত্র মেয়ে। কতদিন দেখিনি ওকে। কত্তদিন! এবাড়িতেও আসে না আমার মেয়ে। কি জানি কেন! ওর স্কুলের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। সকালে আমারই দেরি হতো প্রায়, মেয়েটা আমার তৈরি হয়ে বারান্দার বসে থাকতো! এখন আর আমার সঙ্গে কথা বলে না মেয়েটা। শুধু ওর মার সঙ্গে ফোনে টুকটাক। আমি আড়ি পেতে শুনি।

____________________________________________

প্রতিবেশীর বেয়ারা গাছটাকে এভাবেই কি প্রশ্রয় দিয়েছে নিতু! আমার অগোচরে! ছুরি কিংবা করাতের মতো একটা কিছু চাইছে আমার হাত। আমার জিভ দাঁতগুলোকে শেষ সম্বল ভেবে কিছুটা আস্বস্ত হচ্ছে। আরও খুঁজছি বিড়ালটাকে। নিতু ফেরার আগেই উপড়ে ফেলতে হবে সব। যৌবনবতী অ্যাভোকাডো, আর পা মাড়িও না এ বেলায়, এ উঠোনে! স্পাইকের মতো একটা কিছু খুঁজছি আমি। আমার চোখ।

____________________________________________

বিড়ালটা নড়েচড়ে বসলো আবার। নাহ! নিতুকে আমার বলতেই হবে! ফিলিপের বিড়াল হয়তো, কিংবা স্যান্ড্রার। ওদের কাছে দিয়ে আসলেই ভালো। বিড়ালটা উঠোন আর বারান্দায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ওকে খেতে দেওয়ার মতো কিছুই দেখছি না। আজকাল আমার হুইল চেয়ারটা তার চাকা ঘুরাতে চায় না তেমন একটা, একটু বাতাস পেলে ভালো হতো।

উঠোনটা দেখছি আমি। আমাদের উঠোনটা পাশের বাড়ির মতোই। তবে ওদের মতো এবড়ো-খেবড়ো নয়। নিতুর অনেক যত্নে করা লতাপাতা, সবজি আর ফুল দিয়ে সাজানো। দুধারে মসৃণ রাস্তা।বেশকিছুটা জায়গা পাকা, তারপর ক্যাকটাসের বেড়া ওবাড়ির সঙ্গে।

আজ হঠাৎ করেই আমাদের উঠোনের একটা ফাটলে চোখ বিঁধে গেল! একটা নয়, তিনটা ফাটল! আমি বারান্দায় রেলিং থেকে স্পষ্ট দেখতে পেলাম তিন দাগ। নিতুর বেইক করা এঞ্জেল কেক-এ মাঝে-মাঝে এমন গাঢ় ফাটল দেখা যায়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। শীত লাগছে বেশ। উঠোনটাকে আর ভালমতো দেখতে পাচ্ছি না। নিতুকে বলতে হবে। ওর সঙ্গে আমার দুটো কথা, নাহ! আসলে আমার তিনটা কথা আছে। বিড়াল, আমার পশমি চাদর আর এই ফাটল।

এটা নিতুর সকাল। এক হাতে কফি আর অন্য হাতে ব্যাগটা নিয়ে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে গ্যারেজের দিকে। ভেজাচুলে চিরুনি পরলেও ২/১ মিনিটের বেশি সময় হয়তো নয়। সে এখন চাবির খোঁজে হাতড়ে বেড়াচ্ছে ঝোলাব্যাগ ও ছোটবড়মাঝারি পকেট। কে আসবে এ বাড়িতে? তালাচাবি ডাবল লকের আর কী প্রয়োজন আছে নিতু? পাশের বাড়িতে কেউ একজন বেরুচ্ছে বোধহয়, ওরা কি তবে ফিরেছে কাল রাতে ভ্রমণ শেষে? ওহ ফিলিপ! পোলো শার্টে দারুন দেখাচ্ছে। নিতুর অল্প হাসি আর ফর্সা হাতটা শূন্যে ছুড়ে দেওয়া দেখছি আমি। ফিলিপ কিছু বলতে চাইছে, নিতু—আমার ঝড়ো হাওয়া শুনলো না কিছুই! ফিলিপকে দেখার জন্যে আমি মুখটা উঁচু করতেই গাছটা দেখতে পেলাম। ও বাড়ির বিশাল একটা গাছ, আমার উঠোনের কিনারা ঘেঁষে বড় হচ্ছে। আমি কি অনেকদিন পরে এলাম বারান্দায়! হয়তো এরই মাঝে একটা শিশুগাছ এ গ্রীষ্মের আদরে আহ্লাদে যৌবনবতী হলো আমারই অগোচরে! ভালোমতো দেখতে পাচ্ছি না। আমার চশমাটা কোথাও নেই। ঝুলে আছে অ্যাভোকাডো, থোকায় থোকায়। নিতু এটাকে ফল কিংবা সবজি যাই বলুক, আমি স্বাদ নেইনি কখনো। বাতাসে ওড়ায় ঝরাপাতা ও আমার চোখ। আমাদের মসৃণ উঠোনে গাছটির শেকড়! অ্যাভোকাডোর যৌবন ফেটে উঠোনে দাগ। তিনদাগ। নিতুর এঞ্জেল কেক এ ফাটল! কষ্ট হচ্ছে খুব মসৃণ উঠোনের জন্যে। আমাকে মনে করিয়ে দেয় সেই সব দিনের কথা। যখন নিতু অভিমানী হতো। ডাইনিং টেবিলে খরা। কথা না বলা অগণিত নৈশভোজ। তারপর ঘরে ফেরা। অমসৃণ বিছানা, আমাদের বিরহকাল।

কী করে হলো এসব! নিতু কি কিছুই দেখেনি! অ্যাভোকাডো গাছের একটা ডাল সরু অথচ লম্বা হাত প্রায় ছুঁয়েই রেখেছে একমাত্র জানালা আর আমাদের শোবার ঘরের গোপন পর্দা। প্রতিবেশীর বেয়ারা গাছটাকে এভাবেই কি প্রশ্রয় দিয়েছে নিতু! আমার অগোচরে! ছুরি কিংবা করাতের মতো একটা কিছু চাইছে আমার হাত। আমার জিভ দাঁতগুলোকে শেষ সম্বল ভেবে কিছুটা আস্বস্ত হচ্ছে। আরও খুঁজছি বিড়ালটাকে। নিতু ফেরার আগেই উপড়ে ফেলতে হবে সব। যৌবনবতী অ্যাভোকাডো, আর পা মাড়িও না এ বেলায়, এ উঠোনে! স্পাইকের মতো একটা কিছু খুঁজছি আমি। আমার চোখ।

আজ কি করে যেন দুপুরটা টুপ করেই ফুরিয়ে গেলো। গাড়ির আওয়াজ পেলাম। গ্যারেজে হালকা অথচ চেনা জুতার শব্দ। সে কি তাড়াতাড়ি ফিরেছে? ’হ্যাভেন বুচার’ এর ব্রাউন ব্যাগটা বুকে চেপে দরজা খুলছে নিতু। ওই দোকানটায় আমরা দুজন বেশ যেতাম। শেষবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দিনও গিয়েছিলাম। ওটা একটা মাংসের দোকান। থরে থরে সাজানো লাল, গোলাপি, সাদা মাংস। কেনা হতো লালচে অথচ নরম কয়েকটা চাকা। বিফ স্টেক বানাতো নিতু। আমার প্রিয় খাবার। ও কিচেন কাউন্টারে রেখেছে প্যাকেটটা। হালকা গোলাপি কাগজে মোড়ানো। আবার সেই লালচে অথচ নরম চাকা। মাংসগুলো উঁকি দিচ্ছে বারবার। নিতু রাইস কুকারে বাসমতি চাল দিয়েছে। আমি বিড়ালটাকে খুঁজছি।

____________________________________________

শোনো, আমার দুটো কথা ছিল তোমার সঙ্গে। আসলে আমার তিনটা কথা ছিল নিতু। তুমি কি সত্যি ভয় পাচ্ছো? কাকে নিতু? হুইলচেয়ার, বিড়ালটাকে নাকি রক্তাক্ত শেকড়! তুমি রান্নাঘরে যাও, আমার পছন্দের স্টেক বানাচ্ছো তুমি। আজ রাতে ফিলিপকে কি খেতে বলেছো এখানে? এ বাড়িতে? ওহ, আমিতো ভুলে গিয়েছিলাম, আজ তো আমার মৃত্যুবার্ষিকী!

____________________________________________

চুপচাপ বসে আছে সে। আমার পায়ের কাছেই। একবার তাকালাম বিড়ালটার দিকে। দুবার তাকালাম। নিতুকে আড়াল করে। বিড়ালটার সঙ্গে কথা হলো আমার। ও বুঝতে পারে সব। নিতু সাওয়ারে গেছে। এটাই সময়, আমি বিড়ালটার সঙ্গে আবার কথা বললাম। কোনো শব্দ না করেই সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো কাউন্টারে রাখা প্যাকেটটার কাছে। একটুকরো লালচে অথচ নরম চাকা মাংস মুখে নিয়ে ফিরে এলো। আমার পায়ের কাছে রাখতে চাইলো। আমি ইশারা দিতেই সোজা চলে গেলো উঠোনে, আমাদের উঠোনে। ঠিক যেমনটা চাইছিলাম আমি। অ্যাভোকাডো গাছের শেকড়ের ওপর খুব যত্ন করে রেখে এলো টুকরোটা। বিকেলের রোদে আমি স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলাম লালচে অথচ নরম চাকা। ফাটলগুলো এখন রক্তে ভেজা। যদিও একটু পরেই রক্তের রং কালচে হতে শুরু করবে কিন্তু আমি তা চাই না! আমি চাই সলমোনেলা ব্যাকটেরিয়া এক মহামারী নিয়ে আসুক এ উঠোনে। শেকড় থেকে ডালে তারপর গাছের শিরায় উপশিয়ায়। পাতায় পাতায়। আহা মিষ্টি একটা গন্ধ! সাওয়ার থেকে ফিরেছে ও। নিতু তুমি কি জানো আমি কী ভাবছি? প্রতিবেশীর যৌবনবতী গাছের মৃত্যু আমার উঠোনে। ফিলিপের অ্যাভোকাডো গাছ। নিতু তুমি কি কষ্ট পাবে নিতু! আমার পছন্দের স্টেক বানাচ্ছো তুমি, আমি তো একটুকরো চেয়েও নিতে পারতাম।

সলমোনেলা মানবকোষে ঠাঁই নেয় তুমি তো জানো, গাছেও নিতে পারে ঠাঁই! নিতু তুমি ভয় পেও না। তোমার কিচ্ছু হবে না না। শুধু তিলে তিলে শেষ হয়ে যাবে অ্যাভোকাডো গাছ, আমার মতো! জানালায় উঁকি দেবে না কোনো উড়ন্ত ডাল, আমাদের উঠোন আবারও মসৃণ হবে। একটা গাছই তো নিতু। তুমি কি কাঁদবে নিতু? শোনো, আমার দুটো কথা ছিল তোমার সঙ্গে। আসলে আমার তিনটা কথা ছিল নিতু। তুমি কি সত্যি ভয় পাচ্ছো? কাকে নিতু? হুইলচেয়ার, বিড়ালটাকে নাকি রক্তাক্ত শেকড়! তুমি রান্নাঘরে যাও, আমার পছন্দের স্টেক বানাচ্ছো তুমি। আজ রাতে ফিলিপকে কি খেতে বলেছো এখানে? এ বাড়িতে? ওহ, আমিতো ভুলে গিয়েছিলাম, আজ তো আমার মৃত্যুবার্ষিকী! কততম?

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


One Response to “মাংসফুল ॥ ফারাহ্ সাঈদ”

  1. Md. Ariful Hasan
    জানুয়ারি ১২, ২০১৬ at ৯:৫৯ অপরাহ্ণ #

    হৃদয়কাড়া, অসাধারণ! অফুরন্ত শুভকামনা রইল চিন্তাসূত্র ও লেখকের জন্য

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন


webcams Etudiantes Live Jasmin Forester Theme