চাঁদের মাটির টেরাকোটা: অলৌকিক অশ্বারোহীর জলঘুঙুর | চিন্তাসূত্র
৯ চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২৩ মার্চ, ২০১৯ | সকাল ৬:৩৯
নকিব মুকশি

চাঁদের মাটির টেরাকোটা: অলৌকিক অশ্বারোহীর জলঘুঙুর

কালবৃtera kotaত্তের সঙ্গে তাল রেখেই কবিসত্তা পাক খায়, খেতে হয়।  প্রকৃত কবির কবিতা প্রিজমের মতো রঙ ছড়িয়ে আলঙ্কারিক পথ ধরে অনন্ত পাতালে নেমে যায়, আর ছড়িয়ে দেয় বহু রৈখিকতার এক মোহনসুর। এই সুরের টানেই পাঠকও হারিয়ে যায় কবিতার অনন্তলোকে, অনাস্বাদিত এক ‘চাঁদের মাটির টেরাকোটা’য়।

চাণক্য বাড়ৈ’র ‘চাঁদের মাটির টেরাকোটা’ এমনই এক সৃষ্টি। বইটিতে ৫২টি কবিতা রয়েছে। এর অধিকাংশ কবিতাই হ্যামিলনের বাঁশির সুরের মতো পাঠককে মোহিত করে বাস্তবতার উঠোন পেরিয়ে নিয়ে যায় এক অলৌকিক পাঠশালায়, আর পাঠক কবির সঙ্গে-সঙ্গে অনায়াসে হয়ে ওঠেন এক ‘ অলৌকিক অশ্বারোহী’।

মানুষ মাত্রই প্রকৃতির মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন, সমর্পিত। তাই এই ‘অলৌকিক অশ্বারোহী’ কবিও ‘ নক্ষত্রের মালিকানা’ নয়, তার ‘ আভাটুকু’ নিতেই যেন ছুটে চলেন। ‘ কম্পাস’ নয়, ‘ধ্রুবতারার আলোক দেখে ‘, ‘নেপচুন ফকল্যান্ড জাঞ্জিবার; ভানুয়াতু অথবা শাকিরার গোপন বেডরুমে’। নারী আর প্রকৃতি উভয়েই কবির চেতনাকে সমান তালে অনুরণিত করে। তাই আমরা দেখি এই কাব্যের চতুর্থ কবিতা ‘অলৌকিক অশ্বারোহী ‘তে কবি বলে ওঠেন, — ‘আলো ফেলো ধ্রুবতারা, পুনরায় উল্কাপতনের আগে পবিত্র পাহাড়ের দিকে যাই— ‘। আসলে এই ‘পবিত্র পাহাড়’ নারীর বক্ষসৌন্দর্যের দিকে ইঙ্গিত দিতে পারে কিংবা পৃথিবীর ভারসাম্যরক্ষাকারী পর্বতও অনবদ্য স্তন হিসেবেও পাঠকের মানসলোকে আবির্ভূত হতে পারে। কবিতা তো এমনই এক প্রপঞ্চ, যেখানে লুকিয়ে থাকে বিন্দুর মাঝে সিন্ধুর গভীরতা। যাকে টেনেহেঁচড়ে যে কোনো দিকে নেওয়া যায়, এর স্বভাবের কারণে, এর স্থিতিস্থাপকতার কারণে।

প্রাণের অবয়ব জীবন ও যৌনতার যৌথ প্রণোদনায় বিকাশ লাভ করে। কবি চিত্রকল্পের মাধ্যমে এই যৌনতাকে এক অসাধারণ অবয়বে দাঁড় করান।   ‘তন্ত্রশাস্ত্র ঘেঁটে’ কবিতার ‘পৃথিবীর প্রত্ন-প্রান্তরে নামে উষ্ণ শীতরাত’ চরণাংশের ‘উষ্ণ শীতরাত’ দিয়ে যৌনতার প্রগাঢ় অনুভূতিকে চমৎকার ভাবে চিত্রায়িত করেছেন। এভাবেই চাণক্য পরম সৌন্দর্যকে চিত্রকল্প দিয়ে আড়াল করে আমাদের এক নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখে দাঁড় করিয়ে দেন। চাণক্য’র, ‘গুপ্ত ঝরনার দিকে অভিযাত্রা ‘ কবিতাটির পাঠশেষে এটাই মনে হয় যে, মানুষের আসল গন্তব্যই হলো গুপ্ত রহস্যের দিকে, আড়াল সৌন্দর্যের দিকে।

তাই মানুষের মন একের পর এক রহস্য-সৌন্দর্যের গম্ভুজ ভেদ করে চলে যেতে চায় অনন্ত সৌন্দর্যের অসীম প্রান্তরে। কবিদের কাজই যে নিত্যই মননমাঠ থেকে মানবিক ফসল তোলা, সমস্ত অশুভ শক্তির সঙ্গে লড়াই করে জয়ী হওয়া এবং কবিরা যে বিষচোষা প্রাণী— তারই ইঙ্গিত পাই যখন কবি বলে ওঠেন, ‘তারপর চলো, গুহার ভেতরে সেঁদিয়ে দিয়ে আসি উত্থিত ফণাগুলো, কে না জানে আমরা তুখোড় বেদিনি’। আসলে কবির পক্ষেই সম্ভব ‘সিংহ-চূড়ায় চুমু’ খাওয়া। কারণ, কবির মুঠোয় যে আছে ‘কাঙ্ক্ষিত আপেল’। কালো মেঘ, তারা, গোলাপ, আপেল বাগান, মাথিনের কূপ, তারপর গুল্ম-বিরুৎ মাড়িয়ে যে গুপ্ত ঝরনার খোঁজ পাওয়া যাবে অর্থাৎ গোপন সৌন্দর্যের পিঠে যে নিশ্চিত হাত রাখা যাবে— কবিতাটির শেষের দিকে কবি এ কথাই নির্দ্বিধায় বলে দেন।

চাণক্য কবিতা-ভাবনা বর্তমানের দোলায় দুলতে-দুলতে যৌক্তিকভাবেই সহসা ফিরে যান সুদূর অতীতে, আর ইতিহাসের খেরোখাতা ঘেঁটে তুলে আনেন বহুবিচিত্র প্রত্ন-ফসল, সময়চিহ্নিত দাগ, সভ্যতার আলো-অন্ধকার, যা বর্তমান আর ভবিষ্যতের সঙ্গে সেতু নির্মাণ করেন। যেমন, কবি ‘তন্ত্রশাস্ত্র ঘেঁটে’ বুঝতে পারেন— ‘অন্ধের উপাধী পেয়ে ডুমুরের ডালে নাচে তান্ত্রিক পেঁচা। ‘ একটি অন্ধাবদ্ধ সময়ের চিহ্নদাগ কাটার পক্ষে এ চিত্রকল্প অবিকল্প এবং মোক্ষমও বটে। কবি পাঠককে সহসাই ঘুরিয়ে আনেন পাথরযুগ, শিকারযুগ।,এমনকি ‘পরিত্যক্ত হেরেম’-এ নিয়ে যান এবং বলে ওঠেন, ‘ জাদুর আয়নার পাশে দিন-দিন বেড়ে উঠছে প্রশ্নের স্তূপ—সেসব মাড়িয়ে, স্বর্ণসিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়া মূর্ছিত ঘুঙুরগুলো কুড়িয়ে নাও একটি একটি করে, ঝরা আঙুলের মতো। ‘ অর্থাৎ কবি সমস্ত প্রশ্নের স্তূপ পেরিয়ে সোনালি অতীত ঘেঁটে আমাদের ঐতিহ্যিক অনুষঙ্গগুলো তুলে এনে সংরক্ষণ করার কথা বলেছেন মূলত।

নদ-নদী, সাগর-মহাসাগর তথা পানিই হলো আমাদের এই সবুজ নক্ষত্রের প্রাণ। অন্য কোনো গ্রহের সঙ্গে আমাদের গ্রহের পার্থক্য এখানেই অর্থাৎ পানি তথা জীবনের পার্থক্য। এই সমুদ্র, নদী, মানুষের কাছে এক চরম বিস্ময়ের উৎস। জন্মলগ্ন থেকেই এই বহমানরা পৃথিবী, পৃথিবীর প্রাণী ও উদ্ভিদকে প্রাণিত করে আসছে। আর চিরচঞ্চল এই সমুদ্র-নদী ধরাজীবকে প্রাণিত, বিস্মিত করে আসছে বলেই সমুদ্রের এত মাহাত্ম্য, এত গৌরব। তাই তো ‘সমুদ্রসঙ্গম’ কবিতায় কবি বলে ওঠেন, ‘ … এত নাচমুদ্রা ধরে আছ পৃথুল শরীরে… সমুদ্র, সাঁতার জানি বলে তোমার মাহাত্ম্য এতটা বিশদ—’। সমুদ্র মানুষকে জন্মকাল থেকেই মুগ্ধ করে আসছে। কবিই বরং এই মুগ্ধতায় বড় বেশি আক্রান্ত হন। এবং অন্যকেও সমুদ্রসঙ্গমে মগ্ন হতে প্রণোদিত করেন। এই ‘জলমগ্ন’ কবি সমুদ্রকেই আবার মুগ্ধ করার মতো দুঃসাহসিক স্বাপ্নিক কথা বলেন। অর্থাৎ কবি বোঝাতে চেয়েছেন, সমস্ত মুগ্ধতায় যেন কবির সংশ্লিষ্টতা অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়। ‘সমুদ্রসঙ্গম ‘ কবিতায় কবি দৃঢ়ভাবেই বলে ওঠেন, ‘একদিন তোমাকেও মুগ্ধ করে দেব। আর জানি, সেদিন ঢেউয়ের গর্জন ছাপিয়ে তুমিও বলে উঠবে— সহসা শরীরে বর্শা গেঁথে দিল এ কোন মাছকুমার।’

প্রতিটি দরজার একটি করে তালা, প্রতিটি তালার একটি করে স্বতন্ত্র চাবির যেমন প্রয়োজন হয়, ঠিক তেমনি প্রতিটি অর্জনের দরজা খুলতেও চাবি তথা ‘শিকার-সংহিতা’র প্রয়োজন হয়। শিকার-কৌশল বা শিকারবিদ্যা জানা-শিকারিরাই শিকারে চিরকাল সফল— এ ভাষ্যই চাণক্য ‘ শিকার-সংহিতা’য় প্রতিকায়িত করেছেন। তিনি জানেন, সমস্ত অর্জন আত্মনিবেদকের হাতেই কেবল সহজে ফুটে ওঠে। তাই  কবির সিদ্ধ কণ্ঠস্বর থেকে বেরিয়ে আসে, ‘জানো তো, জাঁদরেল শিকারি পেলে শিকার নিজেই ধরা দিতে আসে-।’

চাণক্য বাড়ৈর মাঝে যে এক ক্রমশ পরিপুষ্টমান কবিসত্তা বিরাজ করছে, তার কবিতা পাঠ করলে তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়। এই তরুণ কবির কবিতা পড়লে মনে হয়, প্রকৃত কবিতা হলো প্রোজ্জ্বল চাঁদ, কবিতাপাঠক হলো চাঁদ-দর্শক। প্রত্যেক চাঁদ-দর্শকই মায়াবী মাতাল চাঁদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ভাবে, চাঁদ শুধু তার পানেই তাকিয়ে আছে, তাকেই শুধু জ্যোৎস্নামগ্ন করছে; ঠিক এমনই প্রকৃত কবিতার স্বরূপ— প্রত্যেক পাঠকই ভাবে, এ কবিতার ভাবনা তারই ভাবনা, তারই মানসকল্পনার স্বরূপ প্রকাশ। চাণক্য’র কবিতা ঠিক এমনই চাঁদমায়া ছড়ায়।

চিত্রকল্প,উপমা, প্রতীকের সমন্বয়ে তার কবিতা হয়ে ওঠে এক অনাস্বাদিত পিযুষ। ‘ সূর্যক্রসিং’ কবিতার প্রথম স্তবক পাঠকালে আমরা বিস্ময়াভিভূত হয়ে দেখি কিভাবে একটি গোধূলিকে, একটি ঘনায়মান সন্ধ্যাকে চিত্রকল্প ও উপমার আশ্রয়ে রেলের জংশন আর সূর্যের জংশনকে একীভূত করে পার্থিব চেতনাকে অনবদ্য করে তুলেছেন! সূর্যক্রসিং—’ সন্ধ্যা একটা জংশন, এই ইস্টিশানে কেবল দিন ও রাতের ক্রসিং— দক্ষিণ পাড়ার নিষিদ্ধপল্লি থেকে হাওয়া এসে মেশে এ পাড়ার ধূপের ধোঁয়ায়, আমি হাঁটফেরত কেউ, ক্রমেই বাড়াতে থাকি পায়ের চাঞ্চল্য — ‘ মানুষমাত্রই সুখ দুঃখের গোলকে ঘূর্ণায়মান। কবিও এ গোলকে ঘূর্ণিত। তাই তার কণ্ঠ বেয়ে নামে, ‘ —আর আমি হারানো পাখিদের খবর নেব বলে সারাক্ষণ উৎকর্ণ থাকি। ‘ কবির সংবেদনশীল মনমুকুরে সহজেই ফুটে ওঠে যে, এই মরলোকে দুঃখের জোয়ারে সহজেই সুখের গায়ে ভাঁটা নামে। ‘পাখি হারানো মানুষ’ কবিতাটি প্রসঙ্গে  ‘চাঁদের মাটির টেরাকোটা সময়-অসময়ের চিত্র’ শীর্ষক এক আলোচনায় কবি ও প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ নূরুল হকের বক্তব্য উদ্ধৃতিযোগ্য — “শিল্পী-ভাবুকের হূদয় ভরা থাকে মানুষের আঘাতে-ভালোবাসায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আঘাত। তবু হূদয়বানরা ভালোবাসে। স্বপ্ন দেখায় অন্যকে। কিন্তু স্বপ্ন প্রায় অপূর্ণই থেকে যায়। আর সুখ মানুষের জীবনে স্থায়িত্ব পায় মুহূর্ত মাত্র। তারপরই ‘পাখি হারানো মানুষ’ বুঝতে পারে, দেখতে পায়, ‘গ্রীষ্ম এলে শীতের পাখিরা উড়ে যায় দূরে।’ চিরায়ত সত্য। এখানে ‘পাখি’ সুখের প্রতীক, গ্রীষ্ম দুঃসময়ের, শীত সুখমুহূর্তের প্রতীক।‘’

সর্বোপরি বলা যায়, ‘চাঁদের মাটির টেরাকোটা’ পাঠে নতুন সব অভিজ্ঞানে ঋদ্ধ হবে পাঠকমানস। আমরা দেখি, কাব্যবনে নতুনপথ সৃজনে চাণক্য’র আকাঙ্ক্ষা লক্ষণীয়। স্বতন্ত্র বিষয় নির্বাচন, স্বতন্ত্র চিত্রকল্প-উপমা-শব্দশৈলী নির্মাণে তার সচেতন প্রয়ার স্ফূটিত। যখন পাঠক পড়বে, ‘ওই যে উঁচু উঁচু টাওয়ার, তার সঙ্গে কী কথা হয় আকাশের! মেঘেদের সঙ্গে কীসের এত খুনসুটি তার?’ তখন অনায়েসে জীবনান্দ দাশের ছায়া দেখতে পাবে। তবে চাণক্য’র কবিতা পাঠককে পরিপূর্ণ মগ্নতায় ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হতো, যদি ছন্দের আশ্রয়ে শব্দচয়ন, বাক্যবিন্যাসে আরও একটু সচেতন হওয়া যেত।

চাঁদের মাটির টেরাকোটা

চাণক্য বাড়ৈ

 প্রকাশক : বিভাস

 প্রকাশকাল : বইমেলা ২০১৫

 মূল্য : ১২০ টাকা

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন